”বেশ, বেশ, খুব ভাল কথা।” ভবনাথ সামনে—পেছনে দু’বার শরীরটা দোলালেন।
”কিন্তু আমার হাতে সময় কোথায়?”
”তা তো বটেই।” ভবনাথ অনিশ্চিত দৃষ্টিতে সম্পাদকের দিকে তাকালেন।
”তুমিই একে শেখাও।”
”বেশ, বেশ, শেখাব নিশ্চয়, খুকি, তুমি খেলা ভালবাসো? একটু—আধটু খেলেছ তো?”
”বলতে ভুলে গেছি ভব, কলাবতী মেয়েদের ক্রিকেটে বাংলার হয়ে খেলেছে। স্পোর্টস এডিটরের অন্তত ওকে চেনা উচিত।”
ভবনাথের মুখ পলকের জন্য ফ্যাকাসে দেখাল। পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে সে খুবই উৎসাহভরে বলে উঠল, ”চিনি, খুবই চিনি। গত বছরই তো মেয়েদের রঞ্জি ট্রফিতে সেঞ্চুরি করেছে।”
মেয়েদের রঞ্জি ট্রফি শুনে কলাবতীর যতটা হাসি পেল ততটাই ভয় পেল সেঞ্চুরি করার কথা শুনে। এখনও তার কোনও সেঞ্চুরি নেই। ক্লাব—ক্রিকেটে সর্বোচ্চচ ৮৯ নট আউট। কিন্তু প্রতিবাদ করতে গিয়েও করল না। দরকার কী লোকটিকে অপ্রতিভ করে। চটে থাকলে মুশকিল হতে পারে। ভবনাথ যদি তাকে একটা সেঞ্চুরি পাইয়ে দেনই তাতে কারও কোনও ক্ষতি হবে না।
”সেঞ্চুরিটা কাদের সঙ্গে খেলায় হয়েছিল?” পি এ মশাই অযথাই নাক গলিয়ে প্রশ্নটা করে বসলেন।
কলাবতী ফাঁপরে পড়ে গেল। একটা যে—কোনও রাজ্যের নাম বলে দেওয়া যায় এবং পাঁচ মিনিট পরই এরা সেটা ভুলে যাবে। তবু লজ্জা করল। নিজের মুখে একটা ডাহা মিথ্যা বলা তার দ্বারা সম্ভব নয়। বিব্রত মুখে সে ভবনাথের দিকে তাকাল।
”গুজরাতের সঙ্গে খেলায়।” ভবনাথের মুখে কোনও বিকার দেখা গেল না।
”ভব, তোমার ডিপার্টমেন্টে কলাবতীকে নিয়ে নাও।” সদানন্দ একটা জটিল সমস্যা মিটিয়ে দেওয়ার মতো গলায় কথাটা বললেন। ”আজকাল তো মেয়েরাও মাঠে যাচ্ছে। একে যদি তৈরি করে নিতে পারো, অবশ্য বয়সটা খুবই অল্প, ফুলটাইম কাজ করতে পারবে না। হালকা অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে দেখতে পারো, এজেন্সি কপির অনুবাদ করাটা শিখিয়ে দিয়ো। ক্রিকেট যখন খেলে তখন ক্রিকেট মাঠেও ওকে পাঠাতে পারো।”
”নিশ্চয়, নিশ্চয়। ক্রিকেটারকে ক্রিকেট মাঠেই তো পাঠানো দরকার। ক্রিকেটের টেকনিক্যাল সাইড নিয়ে এখন তো কেউ লেখেই না। শুধুই সাহিত্য আর কাব্য।”
”তা হলে ওকে এখন নিয়ে যাও। সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে একটা প্রাথমিক ধারণা ওকে পাইয়ে দাও।”
”অবশ্য, অবশ্য। এসো কলাবতী।”
ভবনাথের সঙ্গে কলাবতী সম্পাদকের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ‘রিপোর্টিং ও বার্তা বিভাগ’ লেখা দরজা দিয়ে হলঘরে ঢুকল। ঘরটায় দুটো ভাগ। বাঁ দিকে সাত—আটটা ছোট টেবলে বসে লিখে চলেছে কয়েকজন। ডান দিকেও তাই। একদিকে সাব এডিটররা, অন্যদিকে রিপোর্টাররা। মেঝেয় স্তূপ করে রাখা খবরের কাগজের ফাইল। দেওয়াল ঘেঁষে কাঠের লকার, স্টিলের আলমারি। দুটো টেলিপ্রিন্টার মেশিন অনর্গল ফটফট শব্দ করে চলেছে। মেশিন থেকে বেরিয়ে আসা টাইপ—করা কাগজ মেঝেয় লুটিয়ে পড়েছে। একজন বেয়ারা মেশিন থেকে সেটা ছিঁড়ে নিয়ে ছোট—ছোট খণ্ড করতে লাগল। একজন মাঝবয়সী সাব এডিটর চেঁচিয়ে উঠলেন, ”ভগীরথ, কপি নিয়ে যা।”
হলঘরের শেষ প্রান্তে একটা বড় টেবলে বার্তা সম্পাদক বসেন। তাঁর সামনে দু’জন লোক খুবই বিনীতভাবে কিছুর যেন ব্যাখ্যা করছে।
রিপোর্টারদের টেবলে দুটো ফোন এবং দুটোই কথা শোনা ও বলায় ব্যস্ত। ”শচীনদা, আপনার ফোন,” বলে একজন চেঁচিয়ে ডাকল।
চলতে—চলতে একঝলকে যতটুকু দেখা যায়, কলাবতী দেখে নিল।
খেলার বিভাগটা রিপোর্টিং বিভাগের পেছনে জানলার ধারে। একটা বড় গোলাকার কাঠের টেবল। তিনজন লোক বসে। ভবনাথের সঙ্গে একটি মেয়েকে দেখে জিজ্ঞাসু কৌতূহলী চোখে তারা তাকাল। টেবলে টেলিফোন, নিউজপ্রিন্টের প্যাড, পিন দিয়ে গুচ্ছ করা টেলিপ্রিন্টার কপি এবং প্রায় এক বিঘত লম্বা তলায় কাঠের চাকতি দেওয়া দুটো সরু লোহা, যাতে গাঁথা রয়েছে বাতিল বা অনুবাদ হওয়া কপি। দুটো ফাইল বক্স। তার ওপর একটা বাঁধানো হাজিরা খাতা। পেপার ওয়েট, পিন কুশন ইত্যাদি।
”পরেশ, সি এ বি—র প্রেস কনফারেন্স থেকে বলদেব এখনও ফেরেনি?” ভবনাথ উদ্বিগ্ন চোখে জিজ্ঞেস করল।
”না।” হাওয়াই শার্ট পরা, গোলগাল, বেঁটে, বাঁ হাতে পাথর লাগানো তিনটি আংটি পরা পরেশ প্যাড থেকে একটা কাগজ ছিঁড়ে নিয়ে তাতে নাক ঝাড়তে লাগল।
”বলদেব গেছে তো?”
”কাল বলেছিল বাড়ি থেকে সোজা সি এ বি—তে চলে যাবে। গেছে কিনা জানি না।” পরেশ কাগজটা দলা পাকিয়ে টেবলের নীচে ছুড়ে দিল।
”মুশকিলে ফেলল দেখছি। ওহহ কলাবতী, দাঁড়িয়ে কেন, বোসো।” ভবনাথ দুশ্চিন্তা ঝেড়ে তিনজনের কৌতূহল মেটাতে উদ্যোগী হল।
”এর নাম কলাবতী সিংহ, ক্রিকেটে বেঙ্গল প্লেয়ার। সেঞ্চুরি—টেঞ্চুরি আছে। সদাবাবুর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর নাতনি।”
ভবনাথ একটু জোর দিল শেষ বাক্যটিতে। ”সদাবাবুর বাবার কাছে এর ঠাকুর্দা বাংলা শিখেছেন। মানে এরা অবাঙালি সিংহ নয়, বাঙালিই। বাংলা শিখেছেন মানে বিশুদ্ধভাবে প্রাঞ্জল গদ্যে বাংলায় ভাবপ্রকাশ করাটা শিখেছেন। তিনি একে সদাবাবুর কাছে পাঠিয়েছেন স্পোর্টস জার্নালিস্ট করার জন্য।”
ভবনাথ তার কথার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য থামল। উদাসীন তিনজোড়া চোখ কলাবতীর মুখে নিবদ্ধ। কলাবতী অস্বস্তিতে।
গলা নামিয়ে ভবনাথ বলল, ”সদাবাবু এ—ব্যাপারে খুবই উৎসাহ দেখালেন। বললেন, খেলার বিভাগই সেরা জায়গা গদ্য শেখার জন্য।”
