কলাবতী মাথা নেড়ে বলল, ”শুনেছি।”
চারদিকে সে চোখ বোলাল। সম্পাদকের ঘরটা এতক্ষণ এই বাড়িতে যা কিছু সে দেখেছে, তার সঙ্গে একেবারেই বেমানান। এই ঘরে কার্পেট, এয়ারকুলার, সোফা, মেহগনির টেবিল, পরদা, ঘুরনি চেয়ার ইত্যাদি দেখতে পাবে একদমই সে আশা করেনি।
”তোমার ঠাকুর্দা আমার বাবার কাছ থেকে যে বাংলা লেখার তালিম পেয়েছিলেন, তা তো জানতাম না! এই দ্যাখো চিঠিতে সে—কথা লিখেছেন,” চিঠিটা অবশ্য কলাবতীর হাতে তিনি দিলেন না, শুধু পতাকার মতো নাড়লেন। ”কিন্তু রাজশেখরদা তো আমায় মুশকিলে ফেলে দিলেন। তোমাকে বাংলা লেখা শেখাবার দায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন, কিন্তু আমার সময় কোথা?” সদানন্দ জিজ্ঞাসাটা কলাবতীর জিম্মায় দিয়ে এমনভাবে তাকিয়ে রইলেন যে, সে অস্বস্তিতে পড়ে গেল। আমতা—আমতা করে সে বলল, ”দাদু খুব আশা করেই আপনার কাছে আমায় পাঠিয়েছেন।”
”তার ওপর আবার স্পোর্টস বিভাগে! খেলাধুলোর খ—ও আমি জানি না।”
”ও—কথা বলবেন না সদাবাবু।” পি এ মশাই অভিমানী গলায় আপত্তি জানালেন। ”এই তো সেদিন, ভারতীয় ফুটবলের মান কী করে তোলা যায়, তাই নিয়ে সেমিনারে বলে এলেন।”
”আহহা ওসব কি আমার কথা?” সদানন্দ সস্নেহে তাঁর পি এ—র দিকে তাকালেন। ”ভবনাথই তো পয়েন্টগুলো লিখে দিয়েছিল। আর জানোই তো বক্তৃতাটা আমি ভালই করি। ভবনাথের তৈরি কাঠামোয় আমি খড়—মাটি চাপিয়েছি। আরে বাবা, শিল্ড ফাইনালে শিবদাস বিজয়দাস ভাদুড়ির খেলা তো ছোটবেলায় দেখেছি, সুতরাং বলতে অসুবিধে হবে কেন?”
”আপনি ভাদুড়ি ব্রাদার্সের খেলা দেখেছেন!” কলাবতী অবাক হয়ে গেল। সে তো আশি বছরেরও আগের কথা! দাদু ছেলেবেলায় তাঁর বাবা সোমেন্দ্রশেখরের কাছে মোহনবাগানের আই এফ এ শিল্ড জয়ের গল্প শুনেছেন। তখন সদানন্দের তো জন্মাবার কথাই নয়!
”দেখেছি মানে? সেদিন খেলার পর গড়ের মাঠে যে কী কাণ্ড হয়েছিল কী আর বলব! আমরা কয়েকজন মিলে তো ঠিকই করে ফেলেছিলুম কেল্লার ওপর থেকে ইউনিয়ন জ্যাকটা নামিয়ে তেরঙ্গা পতাকা তখনই তুলে দেব।” সদানন্দ চিঠি ধরা হাতটা মাথার ওপর তুলে জ্বলজ্বল চোখে তাকিয়ে বললেন, ”তখন স্বদেশি যুগ, দেশপ্রেম জিনিসটা ছিল। আর এখন?” হাতটা নামিয়ে আনলেন সদানন্দ।
কলাবতী হুঁশিয়ার হয়ে গেল। সদানন্দ স্বদেশি যুগে থাকতে ভালবাসেন, বর্তমান যুগকে পছন্দ করেন না। বিষণ্ণ গলায় কলাবতী বলল, ”এখন তো করাপশনের যুগ।”
”ঠিক। ঠিক বলেছ।” সদানন্দ উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন। ”রাজশেখরদার নাতনির মতোই বলেছ। এই দ্যাখো তোমার দাদু লিখেছেন, ‘এই বংশের সকলেই, আমি, আমার পুত্র ও একমাত্র পৌত্রী, সকলেই বঙ্গজননীর বাণী শিক্ষা করিয়াছি বঙ্গবাণী হইতেই’… বাংলাটা লক্ষ করো, দারুণ! হবেই তো, বাবার কাছে স্কুলে তালিম পেয়েছেন যে! কিন্তু মা, তুমি এখানে কী কাজ শিখবে, তাও আবার স্পোর্টস! ওখানে তো পুরুষদের রাজত্ব।”
”ডেস্কে বসেও তো কাজ করা যায়।” কলাবতী সতর্কভাবে বলল। সে জানে প্রথমে এই কথা উঠবেই।
”হ্যাঁ, তা অবশ্য যায়। কিন্তু পড়াশোনা শেষ না করেই—”
কলাবতী জানে, এই কথাটাও উঠবে। সে ব্যস্ত হয়ে সদানন্দকে থামিয়ে বলল, ”না, না, পড়াশোনা অবশ্যই শেষ করব। পরীক্ষার পর এই দু—তিনমাস কেন শুধু—শুধু বসে থাকা, তাই দাদু বললেন, স্পোর্টস ভালবাসিস, ক্রিকেটও খেলিস, ময়দানটাও তোর অপরিচিত জায়গা নয়। এই সময়টায় তুই বরং সাংবাদিকতায় তালিম নে। বঙ্গবাণীকে তো আর মাইনে দিতে হবে না—”
”বললেন? মাইনে দিতে হবে না?” সদানন্দ হাঁফ ছেড়ে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলেন। ”এই হচ্ছে রাজশেখরদা। টাকাকড়ির ব্যাপারে অত্যন্ত উদার। বাবার কাছে পড়েছেন তো!”
সদানন্দ টেবিলের গায়ে সাঁটা কলিং—বেলের বোতাম টিপলেন। হাফশার্ট—ধুতিপরা বেয়ারা এল।
”ভবনাথবাবুকে ডাকো। জরুরি কাজ।”
বেয়ারা বেরিয়ে যেতেই পি এ মশাই বললেন, ”তা হলে শুরু করি?”
অনুমতি পেয়ে তিনি সম্পাদকীয়, যা কালকের কাগজে প্রকাশিত হবে, পড়তে শুরু করলেন। তার প্রথম বাক্য : কলকাতার রাস্তায় পাগলা কুকুরের দৌরাত্ম্য এমনই প্রকট হয়ে উঠেছে যে, গৃহস্থরা নির্ভয়ে রাস্তায় চলাফেরা করতে পারছেন না।
সদানন্দ হাত তুলে পি এ—কে থামিয়ে কলাবতীকে বললেন, ”কাল আমাদের চাকরকে একটা কুকুর তাড়া করেছিল। কর্পোরেশনকে কড়কানি দেওয়া দরকার। হ্যাঁ, আপনি পড়ুন।”
পি এ মশাই আবার পড়া শুরু করতে যাবেন তখন একটি লোক প্রায় হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলেন। ”আমায় ডাকছেন?”
”বোসো।”
ভদ্রলোকটি বসলেন কলাবতীর পাশের খালি চেয়ারে। সে আড়চোখে তাকিয়ে দেখল থলথলে ভুঁড়ি, ধুতি—পাঞ্জাবি, চশমা, ঠোঁটের কোণে পানের রস, বয়স পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে। মাথায় সুগন্ধি তেলের গন্ধ।
”ভব, এই মেয়েটি আমার খুবই পরিচিত, আটঘরার জমিদার, এখন অবশ্য জমিদারি নেই, না থাকলেও বনেদিয়ানা, বংশগৌরব সেসব তো আর চলে যায় না। রাজশেখর সিংহর নাতনি কলাবতী। উনি আমার বাবার ছাত্র ছিলেন, এটাও ওঁর একটা বড় পরিচয়। বাংলা ব্যাকরণ, রচনা সবই বাবা ওঁকে হাতে ধরে শিখিয়েছেন, আমাকেও। ওর ঠাকুর্দা আমার কাছে পাঠিয়েছেন ওকে বাংলা লেখা আর খেলার ব্যাপারে লেখা শেখার জন্য।”
