”তার ওপর স্পোর্টস রিপোর্টিংটা একেবারেই পুরুষদের জগৎ।” সত্যশেখর কথাটা মনে করিয়ে দিলেন।
”বড়দিও তাই বললেন। পুরুষ প্লেয়ার, পুরুষ অফিসিয়াল, পুরুষ দর্শক, পুরুষ রিপোর্টার, আমি সেখানে কি কাজ করতে পারব?”
”মলয়া একটা সবজান্তা। তুই পারবি কি পারবি না সেটা ও জেনে বসে আছে! আলবাৎ পারবি।” সত্যশেখরকে একটু বেশিই ক্রোধান্বিত দেখাল। ”তুই একাই চিঠি নিয়ে বঙ্গবাণীতে সদানন্দ কাব্যতীর্থের কাছে যাবি।”
”কাকা, সদানন্দ নয়, ওঁর বাবা ছিলেন কাব্যতীর্থ। ইনি ঘোষ।”
.
ফাইনাল পরীক্ষার পর এক সন্ধ্যায় কলাবতী তার কাকার মোটর থেকে নামল বঙ্গবাণীর ফটকের সামনে।
”কালু, আমি ওই রেল—এর গাড়িটার ধারে পার্ক করে অপেক্ষা করছি, কতক্ষণ আর লাগবে, মিনিট পনেরো?” সত্যশেখর ধীরে তাঁর ফিয়াটটা চালিয়ে এগিয়ে গেলেন।
ফটক থেকে সোজা পথ। ডান দিকে ফাঁকা জায়গায় কিছু মোটর আর মোটরবাইক। বাড়িটা বাঁ দিকে। মাঝারি আকারের কাঠের পাল্লার দরজা দিয়ে সিমেন্টের একটা গলিতে ঢুকে কলাবতী বিভ্রান্ত হল। বড়—বড় কাগজের রিল, গলিটা প্রায় বন্ধ। দুটো মানুষ যাওয়ার মতো ফাঁকা। একটা লোক ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসতে সে বলল, ”বঙ্গবাণীর সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করব, কোন দিক দিয়ে যাব বলুন তো?”
”এই তো সোজা গেলেই সিঁড়ি, তিনতলায় ওঁর ঘর।” লোকটি হাত তুলে কাগজের রিলের ফাঁকটা দেখিয়ে চলে গেল।
একটু দমে গেল কলাবতীর উদ্দীপনা ও উৎসাহ। বঙ্গবাণীর বাড়িতে প্রথম পা দিয়েই, ঘিঞ্জি, সরু, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ খবরের কাগজের অফিস সম্পর্কে তার কল্পনাকে ধাক্কা দিল। তার ধারণা ছিল, বাড়িটা ঝকঝকে, তকতকে হবে। রিসেপশনিস্ট সুন্দরী মেয়ে দু—তিনটে টেলিফোন নিয়ে তার জিজ্ঞাসার জবাবে বলবে, ‘লিফটে চারতলায়।’
কিন্তু তার মনে হচ্ছে এখানে বাসা বেঁধে আছে প্রাচীনত্ব। হয়তো এখনকার লোকগুলোও প্রাচীন মনের। তা হলে তো কোনও মেয়েকেই এখানে কাজ দিতে রাজি হবে না। কিছুটা হতাশ হলেও সে ঠিক করল শেষপর্যন্ত চেষ্টা করে যাবে। জিনস আর ব্যাগি শার্টের বদলে সে শাড়ি পরে এসেছে। শেষবার শাড়ি পড়েছিল আটঘরার এম. এল. এ. গোপীনাথ ঘোষের বড় মেয়ের বিয়েতে। সালোয়ার—কামিজ, জিনস বা স্কার্টে সে অনেক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, হাঁটাচলার ধরনই তখন বদলে যায়। কিন্তু আজ সে কাকার পরামর্শে পুরোদস্তুর মেয়ে সেজেই, বলা যায়, জেদ নিয়েই বঙ্গবাণীতে এসেছে। তার মনোভাব হল, আমি একটা মেয়ে। তোমাদের কাগজে কাজ করতে বা শিখতে চাই। দিতে হয় দাও, নয়তো চলে যাব।
সিঁড়ির দোতলা অতিক্রম করার সময় সে দেখল একটা ঘরে চারজন লোক একটা টেবিলে মুখোমুখি। দু’জনের হাতে কলম আর লম্বা ফর্দের মতো ছাপা কাগজ। অন্য দু’জনে ধরে রয়েছে হাতে লেখা কাগজ, যা দেখে তারা পড়ে চলেছে। ঘরের দরজায় কাঠের বোর্ডে লেখা ‘রিডিং বিভাগ’।
তিনতলায় পৌঁছে সে দেখল দু’দিকে দুটি ঘর। তাদের মাঝে একটা চওড়া দরজা, যেটা দিয়ে ভেতরের একটা হলঘর দেখা যাচ্ছে। ডান দিকের ঘরের দরজায় কাঠের বোর্ডে লেখা, ‘সম্পাদকীয় বিভাগ’। হলঘরের দরজায় লেখা, ‘রিপোর্টিং ও বার্তা বিভাগ’। আর বাঁ দিকের ঘরের দরজায় লেখা ‘সম্পাদক’। দুই ঘরেরই দরজা খোলা এবং তাতে হ্যান্ডলুমের শস্তার বেডকভারের মতো নীল পরদা ঝুলছে। কলাবতীর মনে হল, পরদাগুলো অন্তত ছ’মাস কাচা হয়নি। সে আর—একটু দমে গেল। এইরকম দৈন্যভরা জায়গায় সে কাজ করবে ও শিখবে বলে এসেছে? বঙ্গবাণীর তো যথেষ্টই টাকা আছে, তবে দৃষ্টিভঙ্গিটা আধুনিক নয় কেন?
তার দরকার সম্পাদকের হাতে একটা চিঠি দেওয়া। সম্পাদকের ঘরের সামনে কোনও বেয়ারা বা পিওনকে দেখতে না পেয়ে সে পরদা সরিয়ে ঢুকে দেখল ঘরের মধ্যেই কাঠের পার্টিশান দিয়ে তৈরি আর—একটা কামরা, যার দেওয়াল ঘষা কাচের। তার বাইরে বসে বিরাট টাক, খদ্দরের সাদা পাঞ্জাবি, মধ্য পঞ্চাশের এক ভদ্রলোক মন দিয়ে কিছু পড়ছেন। ইনিই কি সম্পাদক? বোধহয়, না। ইতস্তত করে কলাবতী গলাখাঁকারি দিল।
”কী চাই?” মাথা না তুলে তিনি জানতে চাইলেন।
”সদানন্দ ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে চাই।”
”কেন, কী জন্য?” মাথা না তুলেই আবার প্রশ্ন।
”একটা চিঠি, রাজশেখর সিংহ দিয়েছেন ওঁকে দেওয়ার জন্য।”
”কই, দেখি চিঠিটা।” মাথা না তুলেই হাত বাড়ালেন। চিঠিটা হাতে পেয়ে মুখ তুলে দেখেই সোজা হয়ে বসলেন। এতক্ষণ গলা শুনেও খেয়াল করেননি, এখন তিনি দেখলেন শাড়িপরা একটা মেয়ে।
”আমি পি এ টু দ্য এডিটর। আপনাকে একটু বসতে হবে। দুটো এডিটোরিয়াল এখন ওঁকে পড়ে শোনাব, অ্যাপ্রুভড হলে কম্পোজে পাঠাব।” তাঁর হাতে ধরা কাগজটা দেখিয়ে পি এ মশাই বললেন, ”তারপর দরকার বুঝলে উনি আপনাকে ডাকবেন।”
বাধ্য মেয়ের মতো কলাবতী মাথা নেড়ে বলল, ”বেশ।” পি এ মশাই দুটো এডিটোরিয়াল ও চিঠিটা হাতে নিয়ে ঘষা কাচের কামরার সুইংডোর ঠেলে ঢুকলেন এবং বেরিয়ে এলেন তিন মিনিট পর।
”আসুন।” একটু সম্ভ্রম মাখানো ভারী গলায় তিনি কলাবতীকে আমন্ত্রণ জানালেন।
”তুমি রাজশেখরদার নাতনি। বোসো, বোসো।” শ্যামবর্ণ, সিঁথিকাটা কালো চুল, মোটা ফ্রেমের চশমা, চার্লি চ্যাপলিনের ‘ভবঘুরে’—মার্কা গোঁফ। সাদা খদ্দরের পাঞ্জাবি। কলাবতীর মনে হল, দাদুরই বয়সী, তবে চুলে কলপ না দিলেই ভাল হত। বঙ্গবাণীর মালিক হাতের চিঠিটা পতাকার মতো নেড়ে সামনের চেয়ারটা দেখালেন। ”তুমি কি জানো আমরা একই স্কুলে পড়েছি? উনি আমার থেকে পাঁচ ক্লাস সিনিয়ার ছিলেন?”
