”জানো দাদু বিলেতে থাকার সময় ‘লন্ডন টাইমস’—এ একটা চিঠি ছাপাবে বলে, চিঠিটা লিখে কাকা প্রথমে সেটা বড়দিকে পড়তে দিয়েছিল। কাকা নিজে আমায় এ—কথা বলেছে।”
”কেন?” রাজশেখরের স্বরে বজ্রনির্ঘোষ। সত্যশেখরের খাড়া শরীর তার ফলে নুয়ে পড়ল। চল্লিশের ওপর বয়স হলেও বাবার কাছে তিনি এখনও বালক।
”উত্তর দাও সতু।”
”মানে খুব তাড়াহুড়োয় লিখেছিলাম তো। হয়তো ইংরিজির ভুলটুল থেকে যেতে পারে, তাই আর—একজনকে দিয়ে—”
”হরির মেয়েকে দিয়ে তাই ইংরিজি কারেকশন করিয়েছ! আর কোনও লোক পেলে না? শেষে কিনা হরির মেয়ে, উফফ! তোমাকে বিলেত পাঠানোইটাই আমার বোকামি হয়েছে।”
বোধ হয় জীবনে এই প্রথম রাজশেখর স্বীকার করলেন তাঁর বোকামির কথা। কিন্তু পঁচিশ বছর আগে যখন তিনি খবর পান হরিশঙ্করের মেয়ে উচ্চচশিক্ষার্থে ইংল্যান্ড যাচ্ছে, তখন উত্তেজনায় তাঁর কেশর ফুলে ওঠে। ওদের মেয়ে বিলেতে যাবে আর সিংহীবাড়ির ছেলে শুধুই এম এ, এল এল বি হয়ে ওকালতি করবে? হতেই পারে না। মলয়ার এক মাস পরই সত্যশেখর হিথরো এয়ারপোর্টে নামেন ব্যারিস্টার হওয়ার জন্য। যে—কথাটা তিনি এখনও পর্যন্ত কাউকে বলেননি, এমনকী কলাবতীকেও নয়, তাঁর চিঠি পেয়ে হিথরোয় কিন্তু অপেক্ষা করছিলেন মুখুজ্জেবাড়ির মেয়েটিই।
”সতু, তোমাকে ব্যারিস্টার হতে বিলেত পাঠিয়েছিলুম, চিঠি লেখার জন্য নয়। হরির পয়সায় মলয়া গিয়েছিল ডক্টরেট করতে, চিঠি কারেকশন করে দেওয়ার জন্য নয়।”
”আজ্ঞে, আমরা দু’জনেই তো—”
”পাশ করেছ, থিসিস লিখেছ, ব্যস, তা হলেই ল্যাঠা চুকে গেল। তুমি হরির মেয়েকে দিয়ে ইংরিজি ঠিক করিয়েছ, নিশ্চয় এটা হরি জেনেছে, নির্ঘাৎ ও বলে বেড়িয়েছে সিংহীরা মুখ্যু। উফফ।”
”দাদু, ওসব তো কুড়ি—পঁচিশ বছর আগের কথা। এই নিয়ে এখন আবার প্রবলেমে পড়ছ কেন?” কলাবতী তার দাদুর আহত মর্যাদায় প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করল।
সারা ঘর অতঃপর চুপ। কলাবতী ভাবতে লাগল, বঙ্গবাণী—তে দাদু কীভাবে ব্যবস্থাটা করবেন? অনেক গণ্যমান্য বিশিষ্ট লোকেদের সঙ্গে দাদুর চেনাজানা আছে, হয়তো বঙ্গবাণীর সম্পাদকের সঙ্গেও আছে।
”সতু, তোমার চিঠির বিষয়টা কী ছিল?”
”বেড়ালের ডাক, মানে বেড়ালদের ঝগড়া।”
”কী বললে!” রাজশেখর চামচে দই তুলে মুখের দিকে আনছিলেন, সেটা প্লেটের ওপর পড়ে ছিটকে গেল।
”বেড়ালেরা এমন ঝগড়া শুরু করত যে, রাতে ঘুমোতে পারতুম না।” সত্যশেখরের কাঁচুমাচু মুখ আরও অবনত হল।
”তা মলয়া তোমার চিঠিটাকে কী করল?”
”ধুয়েমুছে এমন সাফ করে দিল যে, চিঠির বক্তব্যই বদলে গেল। আমি খুব বিনীতভাবেই বলেছিলাম রাত্তিরে বেড়ালদের ঘরে বেঁধে রাখলে ভাল হয়। টেনস, সিনট্যাক্স, প্রিপোজিশন, একটা ভুলও মলয়া বের করতে পারেনি। ও কিন্তু চিঠিটার বক্তব্যকে ঘুরিয়ে, সাহেবদের বেড়াল পোষার ওপর কষে গালাগাল দিয়ে চিঠিটাকে একেবারে উলটে দিল।”
”গালাগাল … হরিরই মেয়ে তো, এসবে পোক্ত তো হবেই।” রাজশেখরকে কিঞ্চিৎ নরম দেখাল। আয়েসি গলায় জানতে চাইলেন, ”কী লিখেছিল মেয়েটা?”
ইতস্তত করে সত্যশেখর বললেন, ”এত বছর আগের কথা তো ঠিকঠাক মনে নেই। তবে বেড়ালদের ওপর একটা থিসিসের মতো হয়েছিল। প্রমাণ করতে চেয়েছিল লন্ডনের বেড়ালরা কলকাতার বেড়ালদের থেকে বেশি অসভ্য, বেশি বোকা, বেশি ঝগড়ুটে। চিঠিটা বেশ বড় হয়েছিল, কিন্তু পুরোটাই ছেপেছিল, কুকুর—বেড়ালদের জন্য ওরা কাগজে জায়গা দেয়।”
”দেবেই তো, ইংরেজরা সভ্য জাত! চিঠির রিঅ্যাকশন কিছু হয়েছিল?”
”হবে না মানে! আমাকে ডবল গালাগাল দিয়ে চারদিন ধরে চিঠি বেরোল। তার কী ভাষা! পারলে আমাকে আঁচড়ে কামড়ে ছিঁড়ে খায় আর কি!” সত্যশেখর শিউরে উঠলেন পঁচিশ বছর পর।
”হরির মেয়ে তো সিংহীদের গালাগাল খাওয়াল। কালু আমি তোমায় একটা চিঠি লিখে দেব, সদানন্দকে গিয়ে দেবে।”
”কে সদানন্দ?” কলাবতী জিজ্ঞেস করল।
”বঙ্গবাণীর মালিক।” রাজশেখর চেয়ার থেকে উঠে ঘরের কোণে বেসিনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ”সদানন্দর বাবা শ্যামানন্দ কাব্যতীর্থ আটঘরা স্কুলে বাংলা পড়াতেন, আমি পড়েছি ওঁর কাছে। স্কুলে আমার থেকে পাঁচ ক্লাস নীচে পড়ত সদানন্দ, খবরের কাগজ বের করল। একদিন আমার কাছে ছুটে এল। ব্যাপার কী? এখনই দশ হাজার টাকা ধার না মেটালে কাগজওলা ওকে আর কাগজ দেবে না। আমায় টোপ দিয়ে বলল টু পারসেন্ট সুদও দেবে। আমি অবশ্য সুদটুদ নিয়ে কাউকে ধার দিই না। সে প্রায় হাতে—পায়ে ধরাধরি, টাকা না পেলে কাল তা হলে কাগজ বের করতে পারবে না। দিলাম টাকা।”
”টাকাটা শোধ দিয়েছে?” সত্যশেখর কৌতূহল দেখালেন।
”দিয়েছে এগারো বছরে তিন খেপে।”
”আর সুদ?” কলাবতী জানতে চাইল।
রাজশেখর সরল হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে বললেন, ”সেটাই তো এবার আদায় করব। একটা চিঠি লিখে দেব, তুমি সেটা নিয়ে সদানন্দর সঙ্গে দেখা করবে।”
”আমিও কালুর সঙ্গে যাব।” সত্যশেখর তাঁর কাঁচাপাকা চুলের মধ্যে বাঁ হাতটা বুলিয়ে দইমাখা একটা আঙুল চাটার জন্য মুখে ঢোকালেন।
”সতু!” একটা বজ্রনির্ঘোষ গড়িয়ে এল সত্যশেখরের দিকে। আঙুলটা মুখ থেকে পড়ে গেল। ”তুমি কেন ওর সঙ্গে যাবে? যে রিপোর্টার হতে চায় তাকে একাই সবকিছু সামাল দিতে হয়। সাংবাদিকতা হল ক্রিজে দাঁড়িয়ে ব্যাট করার মতো। এগারোজন লোক তোমাকে হারাতে চায়… এগারোটা কাগজের লোক শেয়ালের মতো ঘুরছে ছোঁ মেরে খবর তুলে নেওয়ার জন্য। কখন গুগলিটা তোমাকে ব্যাট—প্যাড ক্যাচ তোলাবে, শর্ট লেগ সেজন্য অপেক্ষা করে আছে। টাফ ওয়ার্ল্ড, ভেরি কম্পিটিটিভ এই নিউজপেপার ওয়ার্ল্ড।”
