.
রাজশেখর ও সত্যশেখরকে হতভম্বের মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে কলাবতী মৃদুস্বরে বলল, ”আজ স্কুলে কী লজ্জায় যে পড়তে হল! সুস্মিতা বড়দিকে সব বলে দিয়েছে।”
”কী বলে দিয়েছে?” সত্যশেখর জানতে চাইলেন।
”সেই ‘ক্রিকেটের কলাবতী’ লেখাটার কথা।” অপরাধীর মতো গলায় কলাবতী বলল।
”বলেছে তো কী হয়েছে?”
”সাজানো ছবি শুনে বড়দি প্রায় কেঁদে ফেলেছিলেন।”
”আহহ, মনে আঘাত পাওয়ার মতোই তো কথাটা।” রাজশেখর সহানুভূতি আর মমতা মেশালেন কথাগুলোয়। ”তুই বলেছিস তো ওসব কথা আমি বলিনি।”
কলাবতী ঘাড় নাড়ল।
”ব্যস, তা হলে তো ব্যাপারটা চুকেই গেল।” সত্যশেখর উৎসুক চোখে খাবারের ট্রে হাতে প্রবেশ করা মুরারির দিকে তাকিয়ে বললেন।
”না চোকেনি।” রাজশেখর কঠিন স্বরে ছেলেকে ধমক দিলেন। ”মলয়া কেঁদে ফেলেছে যখন—”
”কেঁদেছে কোথায়! কালু বলল না, প্রায় কেঁদে ফেলেছিল। ‘প্রায়’ শব্দটা লক্ষ করো।” সত্যশেখর সাওয়াল করার ভঙ্গিতে আঙুল দিয়ে ‘প্রায়’—কে খোঁচা দিলেন।
রাজশেখর চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। ”এখনই একটা চিঠি লিখব মলয়াকে। কালু, তুমি কাল ফার্স্ট পিরিয়ডের আগেই ওকে চিঠিটা দেবে।”
”খেয়ে উঠেই বরং তুমি লিখো, অত তাড়া কিসের।” সত্যশেখর বললেন, ”কালু আর একটা যে কথা বলল সেটা কি শুনেছ? স্পোর্টস রিপোর্টার না কী যেন হবে বলল।”
রাজশেখর চেয়ারে আবার বসে পড়লেন। গলাখাঁকারি দিয়ে একটা রুটি প্লেট থেকে তুলে কেমন সেঁকা হয়েছে তাই পরীক্ষা করতে—করতে বললেন, ”এদেশে মেয়েরা স্পোর্টস রিপোর্টার হয় না। জলসার হয়, রাজনীতির হয়, সিনেমা, ফ্যাশন, ছবির এগজিবিশন, ধর্মসভা, সাহিত্যসভা সব কিছুরই মেয়ে রিপোর্টার হয়, কিন্তু খেলার হয় না।”
”ঠিক, হান্ড্রেড পারসেন্ট কারেক্ট।” সত্যশেখর রুটির টুকরো ডালের বাটিতে ডোবালেন। ”কোনও মেয়েকে ফুটবল ম্যাচ রিপোর্ট করতে দেখেছিস, কোনও মেয়ের লেখা ক্রিকেট ম্যাচের রিপোর্ট পড়েছিস? অ্যাথলেটিকস, সুইমিং, টেনিস, শুটিং কিতকিত, বক্সিং, ওয়েট লিফটিং—”
রাজশেখর হাত তুলে ছেলেকে থামালেন। ”সতু আর তোমাকে লিস্টি পড়তে হবে না। খেলা আর খেলোয়াড় সম্পর্কে আগের সেই ধ্যানধারণা এখন তো আর নেই। এখন কাগজ খুললেই ক্লাবের সঙ্গে প্লেয়ারদের টাকা—পয়সা নিয়ে ঝগড়া, বাকি টাকা না পেলে ওরা পায়ে বল ছোঁয় না। তার ওপর আছে প্লেয়ারের সঙ্গে কোচের মন কষাকষি, খেলার মধ্যেই রেফারির কানধরা, তাঁকে লাথি মারা এইসবই তো পড়তে হয়।”
”শুধু কি তাই? দাঙ্গাহাঙ্গামার কথাটাও বলো। ইট ছোড়া, গ্যালারি আর টেন্টে আগুন, ক্ষুর মারা, ব্লেড চালানো!”
”সতু, আর বলার দরকার নেই। কালু এতক্ষণ তো সব শুনলে। খেলাধুলোর হাল যেখানে অমন, তখন একটা মেয়েকে আমি রিপোর্টারি করতে পাঠাতে পারি কি?”
কলাবতী মুখ নামিয়ে খেয়ে যাচ্ছে আর কী যেন ভেবে চলেছে। হঠাৎ একচিলতে হাসি তার ঠোঁটে ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। চিন্তিত মুখে সে বলল, ”বড়দিও আজ ঠিক তোমাদের কথাগুলোই বললেন।”
ওঁরা দু’জনেই খাওয়া থামিয়ে সচকিতে তাকালেন। প্রথমে সত্যশেখর বললেন, ‘মলয়া তোকে মাঠে যেতে বারণ করেছে?” তারপর রাজশেখর বললেন, ”মুখুজ্জেদের মেয়ে খেলার মাঠের বোঝেটা কী?”
”জানি না বোঝে কি না—বোঝে, তবে বড়দি স্পোর্টস নিয়ে মেয়েদের লেখালেখি যে একদমই পছন্দ করেন না সেটা খুব ভালভাবে আজ জানিয়ে দিয়েছেন। বললেন, ”দেখো তোমার দাদু আর কাকাও আমার সঙ্গে একমত হবেন।’ এখন দেখছি বড়দির কথাই ঠিক।”
”ঠিক! ওর সঙ্গে আমরা একমত? মুখুজ্জেদের মেয়ে যা বলবে আমরাও তাই বলব?” রাজশেখর হাতের রুটিটা একটানে দু’টুকরো করে আবার সেটা চার টুকরো করলেন।
”মলয়া কি মনে করে মুখুজ্জেরা কাওয়ার্ড বলে সিংহীরাও কাওয়ার্ড? ইট মারে, ক্ষুর চালায় বলে সিংহীদের মেয়ে ভয়ে মাঠে যাবে না?” সত্যশেখর তাঁর বাবার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলেন।
”মুখুজ্জেবাড়ির মেয়ে পছন্দ করে না বলে সিংহীবাড়ির মেয়ে মাঠে গিয়ে রিপোর্টিং করবে না, তাই কখনও হয়? কালু তোমার ফাইনাল পরীক্ষাটা শেষ হোক, তারপর দেখি ‘বঙ্গবাণী’—তে কিছু একটা ব্যবস্থা করা যায় কিনা।” কথাটা বলেই রাজশেখর আলু—কপির ডালনায় মনোনিবেশ করলেন।
”বঙ্গবাণী? বাংলা কাগজ কেন? ‘স্টেটসম্যান’ বা ‘টেলিগ্রাফ’ নয় কেন? কালু তো ইংরিজি লিখতে পারে।” সত্যশেখর উত্তেজিত হয়ে আঙুলে লাগা ঝোল চাটতে শুরু করলেন।
”সতু আঙুল চাটা বন্ধ করো। … ইংরিজি কাগজে লেখাটা চাট্টিখানি কথা নয়। নেসফিল্ড গুলে না খেলে নির্ভুল ইংরিজি লেখা যায় না। কালুদের স্কুলে কার লেখা যেন গ্রামার পড়ায়, নেসফিল্ডের যে নয়, তা আমি জানি।”
”মুখুজ্জেদের মেয়ে যে—স্কুলের হেডমিস্ট্রেস সেখানে নেসফিল্ড আশা করা যায় না। মলয়া তো একলাইন ইংরিজিও লিখতে পারে না।” সত্যশেখর চাটার জন্য আঙুলটা মুখের কাছে এনেই নামিয়ে নিলেন।
”কাকা, তুমি একবার আমায় বলেছিলে—”
”কী বলেছিলুম?” সত্যশেখর সন্ত্রস্ত হয়ে ভাইঝির দিকে তাকালেন। কলাবতী মুখ টিপে হাসছে দেখে তিনি আরও ঘাবড়ে গেলেন।
”বলব দাদুকে?”
”বল না।” সত্যশেখর চেয়ারে খাড়া হয়ে বসে থুতনি তুলে চ্যালেঞ্জ জানাবার ভঙ্গিতে আবার বললেন, ”বল কী বলবি।”
