এই খবর সিংহবাড়িতে যথাসময়ে পৌঁছল। এক সন্ধ্যায় ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত খদ্দর সম্পর্কে ব্যঙ্গাত্মক একটা কবিতা সোমেন্দ্রশেখর পড়ে শোনাচ্ছিলেন বৈঠকখানায়। চরকার সুতো কেটে, বিলিতি কাপড় পুড়িয়ে স্বরাজ আসবে না, শুধু বক্তৃতাতেও নয়, আসবে বোমা, পিস্তল, আর সন্ত্রাস মারফত, এটাই ছিল কবিতাটির বক্তব্য। শেষে বলা হয়েছে, ”বলিস মোদের স্বরাজ সাধনা।/অশনে বসনে বন্ধ নয়,/গোলাগুলি বোমা ইহারো উপরে/খাঁটি বেদান্ত ইহাতে রয়।” পড়া শেষ করে তিনি সতেরো বছরের বড়ছেলে গুণশেখরকে জিজ্ঞেস করেন, ”বুঝলে কিছু?” ছেলেটি মাথা হেলায় এবং অচিরেই জানা গেল সে অনুশীলন পার্টিতে যোগ দিয়েছে।
এর কয়েক মাস পর এক বিকেলে বারান্দায় বসে উমাশঙ্কর মানিকতলা ব্রিজের দিক থেকে বোমা পড়ার দুটো এবং রাইফেলের তিনটে আওয়াজ পেলেন। ভাই দয়াশঙ্করকে বললেন, ”খোঁজ নিয়ে দ্যাখ তো।” সন্ধের সময় দয়াশঙ্কর পাংশু মুখে দাদাকে জানাল, ”পুলিশের ডি সি ব্ল্যাক ওয়াটার্সের গাড়িতে বোমা মেরেছে গুণশেখর। পুলিশের গুলি ওর পেটে ঢুকেছে, সেই অবস্থায় দৌড়ে পাঁচিল ডিঙিয়ে আমাদের বাগানে নামে।”
উমাশঙ্কর প্রায় লাফিয়ে উঠে বললেন, ”সোমের ছেলেটা এখন কোথায়?”
”আমার শোবার ঘরে।”
”দরজাটা বন্ধ করে রাখ। কেউ দেখেছে?”
”অনুকূল আর ভোঁদার মা।” অর্থাৎ মালী এবং দিনরাতের কাজের বউ।
”ওদের বলে দে, কারও পেট থেকে পুলিশ যদি একটা কথাও বের করে,” দোনলা বন্দুকটা দেওয়াল থেকে পেড়ে উমাশঙ্কর জানিয়ে দেন, ”তা হলে দুটো গুলি দুটো পেটে ঢুকবে।”
পুলিশ খোঁজ করতে—করতে মুখুজ্জেবাড়িতেও আসে।
”কী বলছেন দারোগাবাবু, এই গান্ধীবাদী বাড়িতে লুকোবে টেররিস্ট! ধরতে পারলে আমি নিজে গিয়ে আপনাদের হাতে তুলে দিয়ে আসব। সরকার বাহাদুর কি অমনি—অমনি রায়বাহাদুর খেতাবটি দিয়েছেন? …. ডি সি সাহেব বেঁচে গেছেন তো!”
ডি সি সাহেব মারা যাননি। উমাশঙ্কর অতঃপর তাঁর বাল্যবন্ধু এক ডাক্তারকে ডাকিয়ে এনে বাড়িতেই গুণশেখরের পেট থেকে গুলি বের করান। তিন সপ্তাহ পর এক রাত্রে শাড়ি—পরা ঘোমটা দেওয়া গুণশেখরকে ব্রুহামে চড়িয়ে সিংহবাড়িতে গিয়ে সোমশেখরের হাতে তুলে দিয়ে বলে আসেন, ”শুধু হবস আর রোডসের রানের, উইকেটের খবর রাখলেই কি চলবে, গানবাজনার চর্চা একটু কর। ছেলেটা যে গোল্লায় যাচ্ছে সেদিকে একটু নজর দে।” মাসছয়েক পর গুণশেখর বোম্বাই থেকে জাহাজে ইংল্যান্ড পাড়ি দেয় ব্যারিস্টার হয়ে আসার জন্য। কিন্তু সে আর ফিরে আসেনি। বিয়ে করে ওখানেই বসবাস ও ব্যবসা শুরু করে দেয়।
রানিগঞ্জে কয়লাখনি নিলামে চড়বে বলে আচমকা একদিন উমাশঙ্করের কাছে নোটিস এল। মাথায় হাত দিয়ে তিনি বিছানায় শুয়ে পড়লেন। এই মুহূর্তে নগদ অত টাকা তাঁর হাতে নেই। খনির সবকিছু দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ম্যানেজারকে তিনি খুবই বিশ্বাস করতেন। উমাশঙ্কর রানিগঞ্জে গত পাঁচ বছরে দু’বার মাত্র গেছেন। তিনি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি, তলায়—তলায় ম্যানেজারটি টাকা সরিয়ে এবং ঋণের জালে খনিটিকে জড়িয়ে দিয়ে সটকান দিয়েছে। আগামীকালের মধ্যে চল্লিশ হাজার টাকা শোধ না করলে খনি হাতছাড়া হয়ে যাবে।
খবরটা সেইদিনই কিভাবে যেন পৌঁছে গেল সিংহীবাড়িতে। একটু বেশিরাতেই সোমশেখরের ফোর্ড গাড়িটা থামল মুখুজ্জেবাড়ির পোর্টিকোয়। শয্যা—নেওয়া উমাশঙ্কর খবর পেয়ে নীচের বৈঠকখানায় নেমে আসতেই কোনও ভূমিকা না করে সোমশেখর একটা গয়নার বাক্স টেবিলে রেখে বললেন, ”এটা তোর বউঠানের, পাঠিয়ে দিল। সোনা, জড়োয়া সব মিলিয়ে ষাট হাজার টাকার তো হবেই। কাল সক্কালেই জোড়াবাগানে গিয়ে হরি পালের গদিতে এগুলো বন্ধক রেখে টাকা নিবি, তারপর সোজা রানিগঞ্জ দৌড়বি। আমার গাড়িটা ড্রাইভার সমেত রেখে যাচ্ছি।” উমাশঙ্কর কুণ্ঠিতভাবে কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, দাবড়ানি দিয়ে থামিয়ে সোমশেখর বলে ওঠেন, ”শুধু আবদুল করিম আর হাফেজ আলির তানকারি লয়কারি নিয়েই কি চলবে? লেটকাট, গ্লান্স কী জিনিস সেটাও একটু বোঝার চেষ্টা কর।”
এঁদেরই দুই পুত্র রাজশেখর ও হরিশঙ্কর দুই বংশের রেষারেষির ঐতিহ্য আজও বহাল রেখেছেন এবং যথারীতি একজন তাঁর পুত্র সতু অর্থাৎ সত্যশেখর, অন্যজন তাঁর কন্যা মলু অর্থাৎ মলয়ার মধ্যে এই বিচিত্র শত্রুতার ধারাটি সফলভাবে প্রবাহিত করতে সক্ষম হয়েছেন। রেষারেষিটা বকদিঘি ও আটঘরা গ্রামের মধ্যেও ছড়িয়ে যায় যখন এই দুই পরিবারের উদ্যোগে ‘হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে’ নিয়মে একটা বাৎসরিক ক্রিকেট ম্যাচ চালু হয়। গত বছর আটঘরার ওপর দায়িত্ব পড়েছিল ম্যাচ অনুষ্ঠানের। সেই ম্যাচে নিয়ম লঙ্ঘন করে কলাবতী ব্যাট করেছিল ছেলের বেশ ধরে। এবং তার ব্যাটিংয়ের জন্যই আটঘরা ম্যাচটা জেতে। ব্যাট করার একটা সময়ে হুক করতে গিয়ে তার মাথা থেকে পানামা হ্যাটটা পড়ে যায় আর মলয়া ঠিক তখনই তার ছবিটা তুলে নেন। সেই ছবিতেই পরিষ্কার ধরা পড়ে ব্যাটসম্যানটি আসলে ব্যাটসউওম্যান কলাবতী।
.
এইসবই হল পেছনের কাহিনী। স্কুলের ক্লাসে ওই ম্যাচটার কথা সুস্মিতা খুঁচিয়ে তোলার পর থেকেই বড়দির বিব্রত মুখটা আর ওই কথাগুলো—”সাজানো ছবি! আমি সাজানো ছবি তুলেছি? এমন মিথ্যে কথা আমার নামে?” বারবার ঘুরে আসছিল কলাবতীর মনে। সে তামা—তুলসী ছুঁয়ে বলতে পারে দাদু ওই কথা বলেননি। বড়দিকে তিনি খুবই স্নেহ করেন। দুই বাড়ির মধ্যে যতই আকচা—আকচি থাকুক রাজশেখর সিংহ এমন অভিযোগ মুখুজ্জেবাড়ির মেয়ে সম্পর্কে কখনওই করবেন না। কথাগুলো সম্পূর্ণ বানিয়ে লিখেছে সেই ফিচার—লেখিকা, যার নাম দেবরিনা সেন। বস্তুত স্পোর্টস রিপোর্টার হওয়ার ইচ্ছাটা কলাবতীর মধ্যে উসকে দিয়েছিল দাদুর মুখে বসিয়ে দেওয়া ”একটা সাজানো ছবি দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছে” কথাটা। সে লেখাটা পড়েই ঠিক করে আসল সাংবাদিকতা কাকে বলে দেখিয়ে দেবে দেবরিনা সেনদের, অবশ্য যদি সুযোগ পায়। আর সেই রাতেই খাওয়ার টেবিলে সে ঘোষণা করল, ”আমি স্পোর্টস রিপোর্টার হতে চাই।”
