সুস্মিতা বলল, ”ওই ম্যাচে কালুদের বংশের তিন পুরুষ—দাদু, কাকা আর নাতনি এক ইনিংসে ব্যাট করে নাকি ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করেছে। কালু ছেলের ছদ্মবেশে ব্যাট করে শেষ মুহূর্তে আটঘরাকে জিতিয়েছিল। তখন আটঘরার একজন ওর ছবি তুলে রেখেছিলেন আর সেটা কালুদের বাড়িতে পাঠিয়ে তিনি জানিয়ে দেন সিংহীরা নিয়ম ভেঙে একটা মেয়েকে খেলিয়ে অন্যায়ভাবে জিতেছে। সুতরাং ম্যাচের রেজাল্ট খারিজ। সেই সঙ্গে ওয়ার্ল্ড রেকর্ডটাও খারিজ।”
বড়দি মুখ টিপে, বড়—বড় চোখ করে সুস্মিতার কথা শুনে যাচ্ছিলেন। সে থামতেই তিনি বললেন, ”সেই ছবি যে তুলেছে তার নামটাও কালুর দাদু নিশ্চয় বলেছেন।”
সুস্মিতার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে কলাবতী চাপাগলায় বলল, ”সুসি খবরদার!”
”সুসি নামটা বল।” একজন সুস্মিতার পিঠে কলমের খোঁচা দিল।
”হ্যাঁ, হ্যাঁ, নামটা বলে দে।” আর—একজন উসকে দিল।
”থাক—থাক, নাম নিয়ে তোমাদের অত ব্যস্ত হতে হবে না। আমি বলে দিচ্ছি, সেই লোকটা আমিই, যে ছবিটা তুলেছিল। তাতে হয়েছে কী? পুরুষদের ম্যাচে একটা মেয়েকে না বলেকয়ে খেলালে সেটা তো বেআইনি, ক্রিকেট তো ভদ্রলোকের খেলা।” মলয়া মুখার্জির গলা থেকে শেষবাক্যটি একটু ঝাঁঝ নিয়ে বেরিয়ে এল।
”কিন্তু কালুর দাদু বলেছেন,—” সুস্মিতা নিজেকে সামলে নিয়ে থেমে পড়ল।
”কী বলেছেন?”
”বলেছেন যে—” সুস্মিতা ঢোক গিলল।
”সুসি মেরে ফেলব।” কলাবতী চাপা হুমকি দিল।
”কালু, তুমি চুপ করবে কি?” বড়দি ধমক শেষ করে বললেন, ”হ্যাঁ, বলো সুস্মিতা।”
”বলেছেন যে বকদিঘির মুখুজ্জেরা হিংসুটে। ওয়ার্ল্ড রেকর্ডটা সহ্য করতে না পেরে, একটা সাজানো ছবি দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছে কালু এই ম্যাচে খেলেছিল।”
”সাজানো ছবি! আমি সাজানো ছবি তুলেছি?” বড়দি প্রায় কেঁদে ফেলেন আর কি! ”এমন মিথ্যে কথা আমার নামে? সুস্মিতা তুমি লেখাটা ঠিকমতো পড়েছ তো? কথাটা কালুর কাকা বলেননি তো?”
”বড়দি।” এতক্ষণে কলাবতী কথা বলল, ”বড়দি, দাদু কিন্তু ওই ফিচার—লেখকের কাছে স্বীকার করেছিলেন তাঁর নাতনি ছেলে সেজে খেলেছিল আর সেইজন্যই তিন পুরুষের রেকর্ডটা হতে পেরেছে। দাদুর আপত্তি ছিল, ছবির প্রমাণ দিয়ে রেকর্ডটা খারিজ করার চেষ্টার বিরুদ্ধে। বলেছিলেন, স্পোর্টিং হয়নি। কিন্তু এসব কথা ফিচার—লেখক লেখেননি। তিনি ঝগড়াঝাটির কথাই বেশি করে লিখেছেন। ‘সাজানো ছবি’ এই কথাটা তিনি নিজেই বানিয়ে লিখেছেন। দাদু প্রতিবাদ করে চিঠি দিয়েছিলেন, ছাপেনি।”
”কাগজে তো এখন খেলার বদলে দলাদলি, পলিটিক্স আর মামলার খবরেই ভরা থাকে বলে শুনি। তা কালু, তুমি তো খেলার রিপোর্টার হতে চাও, নিশ্চয় যথার্থ যা দেখবে, শুনবে, বুঝবে সেইসবই লিখবে তো?”
”হ্যাঁ বড়দি।”
সেদিন ক্লাসে এই নিয়ে আর কথা হয়নি। রাত্রে খাবার টেবিলে কলাবতী তার দাদু আর কাকার উপস্থিতিতে ঘোষণার মতোই বলল, ”আমি স্পোর্টস রিপোর্টার হতে চাই।”
.
এবার পূর্বকথা কিছু জানিয়ে রাখা দরকার। যদিও অনেকেই পুরনো অনেক ঘটনাই জানেন, তা হলেও, স্মৃতি ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য অল্প কথায় আবার বলে নিচ্ছি :
হুগলি জেলায় আটঘরা আর বকদিঘি নামে পাশাপাশি দুটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম আছে। দুই গ্রামের দুই জমিদার বংশ, আটঘরার সিংহ আর বকদিঘির মুখুজ্জেদের মধ্যে লর্ড কর্নওয়ালিসের আমল থেকেই শত্রুতার পত্তন। সেটা দুই পুরুষ ধরে খুবই উচ্চচস্তরে বজায় ছিল। লাঠালাঠি, ঘর জ্বালানো, খুন করা, মামলা—মোকদ্দমা ইত্যাদির পর তাদের ছেলেরা শহর কলকাতায় বিশাল বাড়ি বানিয়ে বসবাস এবং ইংরেজি শিক্ষা, এই দুইয়ের কল্যাণে প্রকাশ্য শত্রুতা ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে বন্ধ করে দেয়।
কিন্তু বন্ধ বললেই কি আর বন্ধ হয়! আকচা—আকচি, পায়ে পা লাগিয়ে কলহ, রেষারেষি এসব ব্যাপার অব্যাহত ছিল। অথচ দুই বাড়ির মধ্যে কী যেন একটা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালবাসা, বন্ধুত্বের অদৃশ্য বন্ধনও ছিল যেটা তারা কিছুতেই প্রকাশ্যে মানত না। ছেলেমানুষের মতো ঝগড়া শুরু করে দেয় সুযোগ পেলেই। সিংহবাড়ির ছেলে ব্রাহ্মসমাজে যাতায়াত করছে খবর পেয়েই মুখজ্জেবাড়ির ছেলে রবিবার গির্জায় ছুটল। মুখুজ্জেদের কেউ ওস্তাদ রেখে ধ্রুপদ শিখছে জানামাত্রই সিংহবাড়ির ছেলে ময়দানের ক্রিকেট ক্লাবের মেম্বার হয়ে গেল। জ্ঞানশঙ্কর মুখুজ্জে দুর্গোৎসবে সাতজন সাহেব এনেছিলেন বেনারসের জামিলা বাঈ—এর ঠুমরি শোনাতে। দু’মাস পরেই বলেন্দ্রশেখর সিংহ ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করলেন টাউন ক্লাব মাঠে। বিপক্ষে খেলেছিল এগারোটা সাহেব। তবে একই বছরে উমাশঙ্কর ও সোমেন্দ্রশেখর রায়বাহাদুর খেতাব পাওয়ায়, দুই বাড়ির শঙ্কর ও শেখররা খুবই মুষড়ে পড়ে কেউ কাউকে টেক্কা দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারায়। ছোটলাটের ওপর এজন্য ওরা খুবই চটে যায়।
বোধহয় সেইজন্যই ১৯২১—এ গান্ধীজির ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ল মুখুজ্জেরা। দেশের নানা দিকে হরতাল, ধর্মঘট, পুলিশের গুলিচালনা, খাজনা বন্ধ আর বিদেশি বস্ত্র পোড়ানো শুরু হল। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু গান্ধীজির এই আন্দোলনের অনেক কিছুই পছন্দ করলেন না। এই দু’জনের সাক্ষাৎ হল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। গান্ধীজি এসেছেন শুনে লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল বাড়ির চারধার। গান্ধীভক্তরা ওই সময় ঠাকুরবাড়ির প্রাঙ্গণে বিলিতি কাপড় পোড়াতে লাগলেন রবীন্দ্রনাথকে উপযুক্তভাবে সমঝিয়ে দেওয়ার জন্য। তার মধ্যে উমাশঙ্করের ছোট ভাই দয়াশঙ্করও ছিল।
