রাতে খাবার টেবলে কলাবতী বলল, ”কাকা, তোমাকে বড়দি একটা ফুলহাতা সোয়েটার দেবে নিজের হাতে বুনে।”
ভ্রূ কুঁচকে সত্যশেখর তাকিয়ে থেকে বলল, ”তুই বিশ্বাস করলি? ময়দানে ভুটিয়াদের কাছ থেকে কিনে নিজের হাতে বোনা বলে চালাবে সেটা কি জানিস? ও বকদিঘির মেয়ে, এটা মনে রাখিস। আর মনে রাখিস, আটঘরার মেয়ে হল অপুর মা।”
কলাবতীর দেখাশোনা (১৯৯৪)
কলাবতীর দেখাশোনা (১৯৯৪) – মতি নন্দী। প্রথম সংস্করণ: জানুয়ারি ১৯৯৪। আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: কৃষ্ণেন্দু চাকী। উৎসর্গ: সুপ্রিয় মুখোপাধ্যায়
কলাবতীর অনেক দিনেরই বাসনা সে খবরের কাগজের খেলার রিপোর্টার হবে।
সে ভাল ক্রিকেট খেলে। বাংলা দলের হয়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়ানশিপে খেলেছে। সাংবাদিকরা পৃথিবীর কত জায়গায় গিয়ে ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিস, এশিয়ন গেমস, ওলিম্পিকস রিপোর্ট করে। সেইসব বিবরণ পড়তে—পড়তে সে মনে—মনে সেইসব খেলার মাঠে চলে যেত। রিপোর্টাররা কত বড়—বড় খেলোয়াড়ের খেলা কত জায়গায় দেখেছে—টানব্রিজ ওয়েলসে কপিলদেবের ১৭৫ নট আউট কিংবা ওভালে গাওস্করের ২২১, ওলিম্পিকসে কার্ল লুইসের চারটে সোনা, উইম্বলডনে সেলেস আর গ্রাফ, ইংল্যান্ডের চার—পাঁজনকে কাটিয়ে মারাদোনার গোল, সোল এশিয়ান গেমসে পি টি উষা—ভাবলে তার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। মনে—মনে সে বলত, ”আহহ আমি যদি তখন ওখানে থাকতাম! টিভি—তে দেখা আর মাঠে বসে দেখায় অনেক তফাত।”
সে জানে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড বা আমেরিকায় গিয়ে খেলা দেখার খরচটা প্রচুর। দাদু বা কাকার কাছ থেকে তার শখ মেটাবার জন্য অত টাকা চাওয়া উচিত নয়। অবশ্য এটাও সে জানে, আটঘরার প্রাক্তন জমিদার তার ঠাকুর্দা রাজশেখর বা অবিবাহিত ব্যারিস্টার কাকা সত্যশেখর মাতৃহীন কলাবতীর কোনও সাধই অপূর্ণ রাখবেন না। কলাবতীর বাবা দিব্যশেখর স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সন্ন্যাস নিয়ে সংসার ত্যাগ করে চলে গেছেন, তখন দু’বছর মাত্র তাঁর মেয়ের বয়স। পুনেয় মাসির কাছে দশ বছর বয়স পর্যন্ত কাটিয়ে কলাবতী ফিরে আসে পৈতৃক বাড়িতে।
কাঁকুড়গাছি উচ্চচ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে পড়ে কলাবতী। একদিন তাদের ক্লাসে ইতিহাস পড়াতে—পড়াতে বড়দি, অর্থাৎ হেডমিস্ট্রেস মলয়া মুখার্জি ছাত্রীদের জিজ্ঞেস করেন, ”বড় হয়ে তোমরা কী হতে চাও? কী তোমাদের ইচ্ছে?”
কেউ বলল ডাক্তার হতে চাই, কেউ বলল গায়িকা হতে চাই। এরপর কলকল স্বরে সারা ক্লাস ইচ্ছায়—ইচ্ছায় ভরপুর হয়ে উঠল। পাইলট, হাইকোর্ট জাজ, পুলিশ, ব্যবসায়ী, বিজ্ঞানী, অভিনেত্রী, সমাজসেবিকা, ব্যারিস্টার, এঞ্জিনিয়ার, প্রোফেসারে ক্লাসঘরটা ভরে উঠল। বড়দি জানতে চাইলেন, ”কেউ মন্ত্রী হতে চাও না?” সমবেত স্বরে চিৎকার উঠল, ”না, না, না।”
কলাবতীই শুধু চুপচাপ বসে ছিল। বড়দি সেটা লক্ষ করে বললেন, ”কালু তুমি?”
”বড়দি আমি স্পোর্টস রিপোর্টার হতে চাই।”
এ—কথা শুনে সারা ক্লাস অবাক হয়ে গেছল। হওয়ার মতো এত বিষয় থাকতে শেষে কিনা খবরের কাগজের চাকরি!
”স্পোর্টস জার্নালিজম তো পুরুষদেরই একচেটিয়া, ফুটবল, ক্রিকেট, টেনিস, কলকাতায় যত পপুলার খেলা সেখানে তো পুরুষদেরই প্রাধান্য, মেয়েদের নামই তো কাগজে দেখি না। প্লেয়াররা পুরুষ তাই রিপোর্টাররাও সব পুরুষ, তুমি কি তাদের সঙ্গে সেখানে কাজ করতে পারবে?” বড়দি কথাটা বলে মুচকি হাসলেন।
”না পারার কী আছে!” কলাবতী মুচকি হাসিটাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই বলল, ”পাইলট কি পুলিশ অফিসার যদি মেয়েরা হতে পারে তা হলে স্পোর্টস রিপোর্টার কেন হতে পারবে না? তা ছাড়া হচ্ছেও তো। আমিই তো একবার এক মেয়ে রিপোর্টারের সঙ্গে কথা বলেছি।”
”কোন খবরের কাগজের রিপোর্টার?”
কলাবতী এবার একটু চুপসে গেল। ইতস্তত করে বলল, ”খবরের কাগজ নয়, একটা ম্যাগাজিন থেকে মেয়েটিকে পাঠিয়েছিল, সঙ্গে ছিল ফোটোগ্রাফার। বলল, আমাকে নিয়ে ফিচার লিখবে।”
”লিখেছিল?”
”হ্যাঁ।”
”কই, আমাকে দেখাওনি তো!” মধ্য চল্লিশ, অবিবাহিতা বড়দির স্বরে কিঞ্চিৎ অভিমান। কলাবতী তাঁর অত্যন্ত প্রিয়পাত্রী, নিজের মেয়ের মতোই ওকে শাসন ও ভালবাসা দিয়ে যতটা পারেন ঘিরে থাকেন। যদিও বকদিঘির মুখুজ্জেবাড়ি আটঘরার সিংহীদের কাছে ‘শত্রু’ বাড়ি, তা সত্ত্বেও মলয়া মুখুজ্জেদের বাগমারির বাড়িতে কলাবতীর অবাধ যাতায়াত তার দশবছর বয়স থেকেই। এই নিয়ে ক্লাসের কেউ—কেউ তাকে ঈর্ষা করে, হাসাহাসিও হয়।
”বড়দি লেখাটা কেন আপনাকে দেখায়নি কালু, আমি সেটা জানি।” কলাবতীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুস্মিতা পট করে বলে উঠল।
”না দেখাবার মতো কিছু তাতে আছে নাকি?”
কলাবতীর কটমট দৃষ্টি অগ্রাহ্য করে সুস্মিতা বলল, ”ওকে ইন্টারভিউ করেছিল ওদের বাড়িতে, সেখানে তখন ওর দাদু আর কাকাও ছিলেন। তাঁরা ওদের গ্রামের একটা বাৎসরিক ক্রিকেট ম্যাচের কথা তখন সেই রিপোর্টারকে বলেন।”
”হ্যাঁ, আমাদের গ্রাম বকদিঘির সঙ্গে কালুদের গ্রাম আটঘরার মধ্যে সেই ম্যাচ প্রতিবছর হয়। আমি তো সেই খেলা গত বছর দেখেছি।” মলয়া মুখুজ্জে সাধারণ স্বরে কথা বলতে—বলতে হেসে ফেললেন। ”তা সেই ম্যাচের কথা উঠল কেন, ওটা তো বয়স্কদের একটা ছেলেমানুষি রাইভালরি!”
