সেইসময় ভেবো ”রাধুদা, রাধুদা, আর এক মিনিটও দেরি করলে কিন্তু—” বলতে বলতে দোতলায় উঠে এল এবং নেতিয়ে পড়ে থাকা রাধুকে দেখে থমকে গিয়ে ”মেরে ফেলেছে, রাধুদাকে মেরে ফেলেছে” বলে চিৎকার করে নেমে গেল।
”মেরে ফেলেছে” শব্দদুটো অপুর মা’র অন্ধকার হয়ে যাওয়া চেতনায় বিদ্যুতের চমক দিল। সে বিড়বিড় করে বলে উঠল, ”মরবে না, মরবে না।” উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে সে পড়ে গেল। এবার ব্যাগাটেলি বোর্ডের টেবলের পায়া ধরে নিজেকে টেনে তুলেছে।
”চিঁ চিঁ চিঁ।”
অপুর মা মুখ তুলে দেখল পঞ্চু সিঁড়িতে। তার মনে পড়ল কলাবতী দুটো আঙুল তুলে ফাঁক করে দেখালেই পঞ্চু গুলতিটা এনে দিত। অপুর মা দুই আঙুল তুলে ‘ভি’ দেখাল। ”নিয়ে আয় বাবা।”
পঞ্চু তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে কলাবতীর ঘরে ঢুকল আর গুলতিটা নিয়ে বেরিয়ে এসে অপুর মা’র হাতে দিল। গুলি কোথায়, গুলির ব্যাগাটেলি বোর্ড থেকে একটা লোহার গুলি তুলে নিল অপুর মা।
পা ফেলে হাঁটার ক্ষমতা নেই। সে হামাগুড়ি দিয়ে দোতলার ছাদের দিকে নিজেকে হিঁচড়ে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে চলল। দু’চোখ বেয়ে জল ঝরছে, মনে মনে নিজেকে বলে যাচ্ছে, ”কোরু, আর একটু সহ্য কর, আর একটু, আর একটু।”
ঢালাই লোহার নকশাদার রেলিং ঘেরা ছাদ। অপুর মা রেলিং আঁকড়ে উঠে দাঁড়াল। ছাদের নীচেই ছোটবাবুর গাড়িটা দাঁড়িয়ে। গেটের বাইরে যেমন হেলমেট পরা বন্দুক হাতে পুলিশের, তেমনই কৌতূহলী লোকের ভিড়। সবার নজর গাড়িটার দিকে। কেউ লক্ষ করল না রেলিং ধরে দাঁড়ানো, থানকাপড় পরা ঘোমটাখসা আলুথালু চুল মধ্যবয়সি স্ত্রীলোকটিকে।
মুরারি গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। সে গাড়িকে এগোতে দেবে না। বুড়ো লোকটিকে হাত ধরে টেনে রঞ্জন সরিয়ে দিল। মুরারি আবার গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
”তুমি যদি যেতে না দাও তা হলে এখানেই ওদের গুলি করে মারব। তিন পর্যন্ত গুনব, তার মধ্যে যদি পথ ছাড় তো ভাল, নইলে—।” রঞ্জন রিভলভার হাতে গাড়ির পেছনের জানলার কাছে দাঁড়াল। পেছনের সিটে বসে আছে কলাবতী।
”এক—দুই—।” তিন বলার আগেই চোখ মুছতে মুছতে মুরারি সরে গেল।
ড্রাইভারের দরজার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে সত্যশেখর, গাড়িতে এবার সে উঠবে। ভেবো আগে উঠে বসেছে সামনের সিটে, হাতে ছোরা নিয়ে। সত্যশেখরকে সোজা করে রাখার দায়িত্বটা তার। পেছনের দরজা খুলে মাথা নামিয়ে রঞ্জন উঠতে যাচ্ছে, হাতে রিভলভার।
অপুর মা লোহার গুলিটা ছিলেয় লাগিয়ে গুলতি তুলে ধরল। শরীরে এখন সে যন্ত্রণা বোধ করছে না। হাত কাঁপছে না। তার কাছে একটাই গুলি। রবারের ছিলে নাক পর্যন্ত এক হাত টেনে একচোখ বন্ধ করল।
সত্যশেখরই প্রথম রিভলভারটা হাত থেকে পড়ে যেতে দেখল, তারপর দেখল রঞ্জনের কোমর থেকে উধ্বাংশ গাড়ির মধ্যে, নীচের দিক গাড়ির বাইরে পড়ে রয়েছে। একটুও শব্দ না করে ব্যাপারটা ঘটে গেল। জীবনে এই প্রথম সত্যশেখর একটা কাজ করল যাতে জানা গেল তার উপস্থিত বুদ্ধি যথেষ্টই ভাল। সে চট করে রিভলভারটা তুলে নিয়ে ভেবোর দিকে তাক করে বজ্রগম্ভীর স্বরে বলল, ”নেমে আয় শুয়োর।”
গেটের বাইরে থেকে পুলিশ লক্ষ করে যাচ্ছিল ওদের গতিবিধি। তারা চমকে গেল সত্যশেখরের হাতে রিভলভার দেখে এবং ছুটে এল সিংহিবাড়ির মধ্যে। সবাই ধাঁধায় পড়ে গেল রঞ্জনের খুলি ভেঙে রক্ত বেরোচ্ছে কেন? কলাবতী গাড়ির মধ্যেই গুলিটা কুড়িয়ে পেয়ে প্রথমেই তাকাল দোতলার ছাদের দিকে। যাকে দেখবে ভেবেছিল তাকেই দেখল। তারপর ঊর্ধ্বশ্বাসে বাড়িতে ঢুকে পঞ্চুর মতো লাফিয়ে লাফিয়ে দোতলায় উঠে ছাদে গিয়েই ”পিসিইই” বলে চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়ল অপুর মা’র বুকে।
”ছাড়ো কালুদি, ছাড়ো রান্নাবান্না হয়নি এখনও। কারুর খাওয়া হয়নি, মুরারিদাকে বলো শকুন্তলাকে ডেকে আনতে, ক’টাদিন আমি এখন তো রান্নাঘরে যেতে পারব না।”
”যেতে হবে না, আমি রান্না করব।”
”খবদ্দার, রান্নাঘরে ঢুকবে না, রং কালো হয়ে যাবে।”
অ্যাম্বুলেন্স এসে রাধু ও রঞ্জনকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। ওদের অবস্থা সংকটাপন্ন। ভেবোকে নিয়ে গেল পুলিশ। সিংহিবাড়ি কয়েক ঘণ্টার জন্য রাহুর গ্রাসে পড়েছিল, এখন তা থেকে মুক্তি পেল। বাড়ির সবার এজাহার নেওয়ার পর অপুর মাকে পুলিশ ইনস্পেক্টর জিজ্ঞাসাবাদ করে। সেটা এইরকম :
”আপনি একাই ডাকাত দু’জনকে মারলেন?”
ঘোমটা চোখ পর্যন্ত টেনে জবাব হল, ”ওম্মা, আমি একা পারব কেন, কালুদি, ছোটকত্তা, মুরারিদা, কত্তাবাবা আর পঞ্চু সবাই মিলে চেষ্টা করে তবেই না সাহস পেয়েছি।”
”পঞ্চু? সে কে?”
”আমার ছেলে।”
”কই, তাকে তো দেখছি না! ডাকুন তাকে।”
সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তাই তো, গেল কোথায় পঞ্চু? পুলিশ কী বস্তু, থানা থেকে পালানো পঞ্চু তা জানে এবং জানে বলেই এখন সে দেবদারু গাছের মগডালে।
রাতে কলাবতী ফোন করে মলয়াকে সবিস্তারে সারাদিনের ঘটনা বলার পর শেষে যোগ করল, ”বিশ্বাস করবেন না বড়দি, রিভলভারটা হাতে নিয়ে কাকার সে কী অগ্নিমূর্তি! আমি তো ভাবলুম এই বুঝি ভেবোর ইহলীলা খতম হবে।”
”তুমি ভাবতে পারো কিন্তু আমি ভাবছি না, যতদূর জানি সতু জীবনে কখনও রিভলভার হাতে ধরেনি। যদি গুলি ছুড়ত তা হলে ভেবো নয়, হয়তো তোমারই ইহলীলা সাঙ্গ হত। তবে ও যে একটা অস্ত্র হাতে ধরেছে, ওই অসমসাহসী কাজের জন্য ওকে আমি ফুলহাতা একটা সোয়েটার নিজে হাতে বুনে দেব। কথাটা তুমি ওকে বলে দেখো, শুনেই বলবে নিউ মার্কেট থেকে কিনে নিজের হাতে বোনা বলে চালাচ্ছে।” মলয়া হেসে উঠল কথার শেষে।
