ফার্স্ট এইড বক্স থেকে খানিকটা তুলো বার করে কলাবতী ভেবোর দিকে বাড়িয়ে ধরল। তুলো হাতে নিয়ে ভেবো একচোখ বন্ধ করে কলাবতীর দিকে তাকিয়ে বলল, ”বলছ চারটেতেই হবে?”
”কালু, একদম কোনও হেলপ করবি না।” সত্যশেখর আর সহ্য করতে পারল না কলাবতীর এই দয়ার মনোভাবকে। ক্ষিপ্ত স্বরে বলল, ”ব্যান্ডেজ তুলো কিচ্ছু দিবি না আর। এদের যা প্রাপ্য ভগবান তাই দিয়েছেন।” এই বলে সে আগুনঝরা দৃষ্টি নিয়ে রঞ্জনের দিকে তাকাল।
রঞ্জন ঠোঁট মুচড়ে হেসে বলল, ”ভগবান ভীষণ কিপটে, আমার প্রাপ্যটা এখনও আমায় দিলেন না। অবশ্য দেওয়ার সুযোগও আর পাবেন না।”
এইসময় ফোন বেজে উঠল। অভ্যাসবশে সত্যশেখর ফোনের দিকে হাত বাড়াতেই ওয়েবলি স্কটের নল তার হাতে খোঁচা দিল। হাতঘড়ি দেখে নিয়ে রঞ্জন রিসিভার তুলল। ঘরের সবাই উৎকণ্ঠিত চোখে তাকিয়ে।
‘হ্যাঁ বলুন।” ভ্রূ কুঁচকে রঞ্জন শুনে গেল ওধারের কথা। তারপর বলল, ”দু’ ঘণ্টা নয়, তিনঘণ্টা পরই ওদের ছেড়ে দোব। সবথেকে জরুরি কথাটা নিশ্চয় মনে আছে, আমাদের ফলো করবেন না, বা মাঝপথে আটকাবার চেষ্টা করবেন না। তা হলে কয়েকটা ডেডবডি পাবেন শুধু। আমরা কিন্তু ওয়েল আর্মড, তিনটে রিভলভার আর বোমা সঙ্গে আছে, মিনিট পনেরোর মধ্যেই আমরা বেরোব, উৎসাহের বশে আপনার লোকেরা যাতে কিছু করে না বসে সেজন্য ওদের যা যা জানবার জানিয়ে দিন।”
রঞ্জন আবার কিছুক্ষণ শুনে বলল, ”না, না, এদের গাড়ি নিয়েই যাব। আমরা নেমে গেলে, সত্যবাবু গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরে আসবেন নিরাপদে, অবশ্য পুলিশ কথার খেলাপ যদি না করে। … দেখা যাক।” রিসিভার রেখে সে রাধুকে বলল, ”একটা জামা পরে নাও, ব্যান্ডেজ যেন পুলিশের চোখে না পড়ে।”
রাধু দাঁত বার করে হেসে বলল, ”গুরু দিলে ভাল, তিনটে রিভলভার! বোমা! আরে বোমার থলিটা তো গাড়িতেই পড়ে রয়ে গেছে, তাড়াহুড়োয় আর—ভেবো, কোন ঘরটায় জামা আছে রে?”
”সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডান দিকের প্রথম ঘর। দেখবে কাঠের আলমারিতে সারি সারি জামা ঝুলছে।”
রাধু উঠে দাঁড়াতেই ভেবো মনে করিয়ে দিল, ”বন্দুকটা সঙ্গে নাও। বাঁদরটাকে দেখলেই মোক্ষম এক ঘা কষিয়ে মাথা ভেঙে দিয়ো।”
রঞ্জন ঘড়ি দেখে বলল, ”তিন মিনিটের মধ্যে নেমে আসবে। আমাদের এখুনি রওনা হতে হবে।”
সত্যশেখর বলল, ”আমরা কোথায় যাব?”
”গাড়িতে আগে উঠুন তারপর যেদিকে চালাতে বলব চালাবেন, তেল কত আছে?” রঞ্জন গম্ভীর গলায় বলল।
”কাল রাতে বারো লিটার ভরেছি।”
মনে মনে হিসেব করে রঞ্জন বলল, ”হুমম, বর্ডার পর্যন্ত হয়ে যাবে।”
এরপর সে মোবাইল ফোনটা বার করে নম্বরের বোতাম টিপতে টিপতে ঘরের বাইরে গেল কারওর সঙ্গে কথা বলতে। ঘরের এককোণে মুরারি তখন থেকে ঠায় দাঁড়িয়ে একটা কথাও না বলে। এইবার সে মুখ খুলল, ”ছোটবাবু, তোমাকে আর কালুদিকে কি মেরে ফেলার জন্য নিয়ে যাবে?”
হালকা সুরে সত্যশেখর বলল, ”তাই মনে হচ্ছে।”
শুনেই ডুকরে উঠে মুরারি দোতলার সিঁড়ির দিকে ছুটল।
”ওরে অপুর মা রে, সব্বোনাশ হয়ে গেছে রে।” চিৎকার করতে করতে সে দোতলায় উঠল। রাজশেখরের ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসতে গিয়ে, ”উহহ” বলে কাতরে উঠে অপুর মা এক পা তুলে দাঁড়িয়ে গেল। ”হয়েছে কী মুরারিদা?”
”আর হয়েছে! কালুদি আর ছোটবাবুকে খুন করার জন্য গাড়িতে করে ওরা এবার নিয়ে যাবে।” মুরারির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ”আমি গাড়ির সামনে শুয়ে পড়ব, চালাক আমার বুকের ওপর দিয়ে। আমার আর বেঁচে থাকার দরকার নেই।” বলতে বলতে মুরারি সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল।
সত্যশেখরের ঘরে তখন রাধু বিস্ফারিত চোখে জামাগুলো দেখছে। একটা সিল্কের হাওয়াই শার্ট বেছে গায়ে পরার জন্য বন্দুকটা খাটের ওপর রেখে বাঁ হাতে জামার হাতা গলাল, তারপর আর গায়ে ওঠাতে পারল না। কিছুক্ষণ চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিল। নীচের থেকে ভেবোর চিৎকার শুনতে পেল, ”রাধুদা, হল তোমার? এখুনি বেরোতে হবে।”
”যাচ্ছি রে।” বলে রাধু আরও দুটো শার্ট বার করে বাঁ কাঁধে ফেলে বাঁ হাতে বন্দুকটা নিয়ে ঘর থেকে বেরোল। ডাইনে তাকিয়ে দেখতে পেল সিঁড়ির মাথায় বসে একটা বাঁদর, তাকে দেখেই অদৃশ্য হয়ে গেল। বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল ব্যাগাটেলির টেবলটায় হাতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে দশাসই চেহারার সেই মেয়েমানুষটা।
অপুর মাকে দেখেই রাধুর চোখ দপদপ করে উঠল। বন্দুকের মুঠো শক্ত হল। পায়ে পায়ে সে এগোল। অপুর মা’র কাছে এসে এক হাতে বন্দুকটা খাঁড়ার কোপ দেওয়ার মতো করে তুলল। চোখ বন্ধ করে অপুর মা কুঁদোটা মাথার ওপর পড়ার অপেক্ষায় রইল। কয়েক সেকেন্ড পর চোখ খুলে দেখল ডাকাতটা তার গলার দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে। বাবার দেওয়া, দু’ভরির বিয়ের সোনার হারটা সে আজ পর্যন্ত কখনও গলা থেকে খোলেনি। রাধু হারটাকেই দেখছে। অপুর মা গলায় হাত দিয়ে পিছিয়ে যেতে গিয়ে ভারসাম্য রাখতে না পেরে পড়ে গেল মেঝেয়। রাধুর চোখ পড়ল তার ব্যান্ডেজ বাঁধাপায়ে।
বীভৎস হাসিতে ভরে গেল রাধুর মুখ।
.
অপুর মা অন্য রূপে
”এইবার আমি বদলা নোব। আমার কাঁধ নিয়েছিস, এবার আমি তোর পা নোব?” বলেই রাধু বন্দুকটা বাঁ হাতে তুলে অপুর মা’র ডান পায়ের পাতার ওপর কুঁদো দিয়ে জোরে আঘাত করল। কাটা ছাগলের মতো অপুর মা ছটফটিয়ে আছড়ে পড়ল, একটা চাপা ”আহহ” ছাড়া মুখ দিয়ে আর কোনও শব্দ বেরোল না। রাধু বন্দুকটা মেঝেয় রেখে নিচু হয়ে বাঁ হাতের মুঠোয় হারটা ধরে সবেমাত্র টান দিয়েছে তখনই সাপের ছোবলের মতো অপুর মা’র দুটো হাত রাধুর চুল মুঠোয় ধরে মাথাটা টেনে নামিয়ে এনে কপাল দিয়ে রাধুর নাকে হাতুড়ির মতো আঘাত করল; মুহূর্তে রাধুকে চিত করে পেড়ে ফেলে তার বুকের ওপর হাঁটু রেখে উন্মাদের মতো মাথাটা মেঝেয় ঠুকতে ঠুকতে বলে যেতে লাগল, ”ছোটবাবুকে মারবি? কালুদিকে মারবি? ছোটবাবুকে মারবি? কালুদিকে মারবি?…।”
