যে টান টান ভাবটা তার মুখে ছিল, এখন সেটা আলগা দেখাচ্ছে। টেবল থেকে পেয়ারা তুলে ছোরা দিয়ে সেটা দু’টুকরো করে রঞ্জন নুন মাখাতে মাখাতে রাধুকে বলল, ”খালি গায়ে এইরকম ব্যান্ডেজ জড়িয়ে তুমি যাবে নাকি? একটা জামা চড়িয়ে নাও। ভেবো একটা জামা এনে দে তো।”
শোনামাত্র ভেবো উঠে দাঁড়াল। ছোরা দিয়ে রঞ্জন আধখানা পেয়ারাটা আবার টুকরো করছে মন দিয়ে। ভেবো ছোরাটা চাইতে গিয়েও আর চাইল না। তাকে চলে যেতে দেখে রঞ্জন ছোরাটা বাড়িয়ে ধরে কিছু একটা বলতে গিয়েও বলল না। বরং রাধু বলল, ”অস্তর সবসময় কাছে রাখা উচিত। এটা ভেবোর খেয়াল থাকে না। কখন দরকার পড়বে কে জানে।”
রঞ্জন বলল, ”সত্যবাবু, আপনাকে একটা কাজ করতে হবে। আপনার মোটরে আমাদের নিয়ে হাওয়া খেতে বেরোবেন। অবশ্য সঙ্গে থাকবে আপনার এই ভাইঝি। পুলিশের যে কাণ্ডজ্ঞান আছে সেটা এবার বুঝলুম, ওরা একঘণ্টার মধ্যে জানাবে নির্বিঘ্নে আমাদের এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে দেবে কি না; আর দেবে নাই—বা কেন?
”ডাকাতি করিনি, প্রাণহানিও করিনি, শুধুমাত্র শেলটার নিয়েছি। এতে অপরাধ কোথায়?”
সত্যশেখর বলল, ”কিডন্যাপিংয়ের উদ্দেশ্যে একজনকে গাড়িতে তুলেছিলেন সেটা গুরুতর অপরাধ। তা ছাড়া এই বাড়িতে দু’জনকে আপনারা আঘাত করেছেন, তারা মারাও যেতে পারত, এটাও গুরুতর অপরাধ। ভয় দেখিয়ে মানসিক আঘাত দিয়েছেন, সেটাও অপরাধ বলে গণ্য হবে।”
রঞ্জন পেয়ারা শেষ করার পর মর্তমানের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বলল, ‘হুমম।”
.
ভেবো ও পঞ্চু
ওদিকে ভেবো দোতলায় উঠে জুতোর র্যাকের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। লোভাতুর চোখে জুতোগুলো দেখছে, তখন রাজশেখরের ঘর থেকে আইস ব্যাগ হাতে এক পা টেনে টেনে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেরিয়ে এসে অপুর মা যাচ্ছিল ফ্রিজের দিকে। এতক্ষণ সে কর্তাবাবুর কপালে বরফ দিচ্ছিল। ভেবোকে দেখতে পেয়ে সে বলল, ”কী কচ্ছিস রে মুখপোড়া ওখানে?”
ভেবো একগাল হেসে বলল, ”খুব জব্বর কষিয়েছ মাসি। রাধুদার ডানাটা খসে গেছে, একেবারে নুলো। ওকে একটা পরার শার্ট দিতে হবে।” বলেই সে সত্যশেখরের ঘরে ঢুকে ওয়ার্ডরোবটা খুলল। হ্যাঙারে ঝোলানো জামাপ্যান্টগুলো সরিয়ে সরিয়ে পছন্দ করছ। তখন বাইরে শুনল অপুর মা’র গলা, ”পঞ্চু দ্যাখ তো ছোঁড়াটা ঘরে কী করছে?”
ভেবো চমকে গেল। সে তো সারা বাড়িই ঘুরে দেখেছে পাঁচটা লোক ছাড়া আর কেউ নেই, আর ওদের কারও নাম যতদূর সে জানে পঞ্চু নয়। তা হলে এই পঞ্চু লোকটা কোথা থেকে এল? ভেবো খুবই হুঁশিয়ার। সে চট করে খোলা পাল্লার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ছোরাটা সঙ্গে নেই বলে মনে মনে আপশোস করল।
দরজায় পঞ্চু। আড়চোখে তাকে দেখেই ভেবো ”ভাগ, ভাগ” বলে চেঁচিয়ে উঠল। মুহূর্তে পঞ্চু খাটে উঠেই লাফ দিয়ে ওয়ার্ডরোবের মাথায় চড়ে ঠোঁট তুলে মাড়ি বার করে ”চিঁ চিঁ কিচ কিচ কিচ” শব্দ করল। ভেবো দরজার দিকে পা বাড়াতেই পঞ্চু ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ঘাড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে কামড় বসাল বাঁ কানে। কান দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে ফিনকি দিয়ে।
ভেবো চিৎকারে বাড়ি মাথায় তুলে ছুটে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল।
”ওরে বাবা রে, মরে গেলুম, আমার কান গেল। বাঁচাও রাধুদা, বাঁচাও।”
চমকে উঠে রিভলভার হাতে রঞ্জন পড়িমরি ছুটে বেরোল ঘর থেকে। তার পেছনে পেছনে রাধু ছাড়া আর সবাই।
দোতলায় তখন অপুর মা’র কোলে পঞ্চু। ওর গালটা নিজের গালে চেপে অপুর মা বলে চলেছে, ”বাবা আমার, সোনা আমার।”
রঞ্জন হতভম্ব হয়ে গেল ভেবোকে দেখে। তারপর বলল, ”কী করে এমন হল?”
”বাঁদর কামড়ে দিল।”
রাগে কালো হয়ে উঠল রঞ্জনের চাহনি। দাঁতে দাঁতে চেপে বলল, ”এইসব মাথামোটা ইডিয়টদের নিয়ে আমাকে কাজ করতে হয়। একটার হাত গেল, অন্যটার কান।” কলাবতীর দিকে তাকিয়ে সে বলল ”বাঁদর এল কোথা থেকে?”
”আমাদের পোষা বাঁদর?”
রঞ্জন তাকে বলল, ”পারবে ওর কানে ব্যান্ডেজ করে দিতে?” কলাবতী বলল, ”পারব।”
ভেবো চিৎকার করে উঠল, ”না, না, না, ও ব্যান্ডেজ করবে না। দেখছ না রাধুদাকে কী করে দিয়েছে। আমায় বরং তুলো দাও, আমি কান চেপে ধরে থাকব। আমাকে আবার সেই চোদ্দোটা ইঞ্জেকশন নিতে হবে।”
কলাবতী অস্ফুটে বলল, ”চোদ্দোটা নয়, এখন চারটে নিলেই হয়।”
কথাটা ভেবো শুনতে পেল এবং তেলেবেগুনে জ্বলে খিঁচিয়ে উঠল, ”চোদ্দোটা নয় চারটে!” তারপর কলাবতীর চুল মুঠোয় ধরে মাথাটা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, ”এমন বাঁদর পোষো কেন, যে মানুষের কান কামড়ে দেয়?”
সত্যশেখর এতক্ষণ চুপ করে দেখছিল, এইবার আর সে নিজেকে সামলাতে পারল না। ”খবরদার” বলে গর্জে উঠেই ভেরোর জামার কলার পেছন থেকে ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়েই থাপ্পড় কষাল। ভেবো ছিটকে পড়ে গেল। রঞ্জন রিভলভারের বাঁট দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সত্যশেখরের মাথার পেছনে মারল। সে টলে পড়ে যাচ্ছিল, কলাবতী তাকে জড়িয়ে ধরে নিয়ে ঘরের ভেতরে এনে চেয়ারে বসিয়ে দিল।
”শত্রুতাটা তা হলে ভালভাবেই চালাতে চান।” সত্যশেখর বলল।
”আমার দুটো লোককে আপনারা জখম করে আপসেট করে দিয়েছেন। আর একবার যদি কারও গায়ে হাত দেন, ভেবোর ছোরা আপনাকে রেয়াত করবে না।”
রাধু বলল, ”গুরু, হাতে তো ঘোড়া রয়েছে, লোকটাকে একটা দানা খাইয়ে দাও। বড্ড বাড় বেড়েছে। যদি একটা টোটাও থাকত তা হলে—” বন্দুকটা বাঁ হাতে তুলে ধরে সে বুঝিয়ে দিল, তা হলে সে কী করত।
