”আমার কার্ড ওর হাতে দিয়ে বলেছি ফোনে তাড়াতাড়ি যেন কমিশনার কথা বলেন।”
রাধু আবার কাতরে উঠল। রঞ্জন ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে ঝাঁজালো গলায় বলল, ”কী হয়েছে কী? বাচচা ছেলের মতো প্যানপ্যান করছিস কেন? ভেবো ওপরে গিয়ে দ্যাখ তো ব্যান্ডেজ করার মতো ফালি কাপড়টাপড় পাওয়া যায় কিনা।”
.
একমুঠো নুন প্লেটে করে নিয়ে এল মুরারি। শসায় নুন মাখিয়ে কামড় দিয়ে ভেবো বলল, ”এটা খেয়ে নিয়ে যাচ্ছি, ভীষণ খিদে পেয়েছে, রাধুদা খাবে নাকি?”
”রাখ তোর খাওয়া!” বিরক্ত হয়ে বলল রাধু তারপর কলাবতীকে জিজ্ঞেস করল, ”খুকি, বাড়িতে ব্যান্ডেজ আছে?”
”আছে।” কলাবতী শান্তস্বরে বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
রাধু উৎসুক চোখে তাকাল রঞ্জনের মুখের দিকে। রঞ্জন বলল, ”ভেবো, ওর সঙ্গে যা।”
ছোরাটা টেবলে রেখে ভেবো উঠল। কলাবতীর পেছন পেছন কয়েক পা যেতেই রঞ্জন তাকে ডেকে ছোরাটা দেখাল, ভেবো ফিরে এসে সেটা তুলে নিল। দোতলায় উঠেই দালানের দেওয়াল ঘেঁষে জুতো রাখার র্যাক। ভেবো সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, ”তুমি ব্যান্ডেজ নিয়ে এসো, আমি বরং জুতো দেখি। বাব্বা, এত জুতো কার?”
”সবার জুতো আছে, তবে বেশিরভাগই কাকার।”
ভেবো জুতোগুলো তুলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলল, ”চামড়ার কী চেকনাই! কী জেল্লা! খুব দামি, তাই না?”
”ওটার দাম বারোশো টাকা।” বলেই কলাবতী দেখল ভেবোর চোখে লোভ জ্বলজ্বল করে উঠল।
”আর এটা?” ভেবো একজোড়া জগিং শু তুলে ধরল।
”আড়াই হাজার টাকা।”
কলাবতী লাইব্রেরি ঘরের দেওয়াল আলমারি খুলে ফার্স্ট এইড বক্স বার করে দালানে এসে দেখল মেঝেয় বসে ভেবো কাকার জগিং শুটা পরছে, পাশে পড়ে রয়েছে তার ময়লা পুরনো জুতো আর ছোরাটা। কলাবতীকে দেখে সে লাজুক হেসে বলল, ”এটা আমি নিলুম। একটু ঢলঢল করছে, ন্যাকড়া গুঁজে নোবখন।”
কৌতূহল মেশানো স্বরে কলাবতী এবার জিজ্ঞেস করল, ”তোমরা ঢুকলে কী করে আমাদের বাগানে?”
ভেবো তাজ্জব বনে গিয়ে বলল, ”এ আর এমন কী, রাধুদা তুলে ধরল আমাকে, পাঁচিল ডিঙিয়ে নেমে খিড়কি দরজাটা খুলে দিলুম।”
সেই সময় ছাদের সিঁড়িতে উঁকি দিল পঞ্চু। তাকে দেখেই কলাবতী দ্রুত হাত নেড়ে ইশারা করল সরে যাওয়ার জন্য। সেটা দেখতে পেয়েই ভেবো চট করে মুখ ফিরিয়ে ছোরাটা হাতে নিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকাল কিন্তু কাউকে দেখতে না পেয়ে সন্দেহাকুল স্বরে বলল, ”কাকে দেখে হাত নাড়লে?”
”একটা বাঁদর।”
”বাঁদর! বাড়িতে বাঁদর কেন? খুব খারাপ জানোয়ার, ছেলেবেলায় একটা হনুমান আমাকে কামড়ে দিয়েছিল, পেটে চোদ্দোবার ছুঁচ ফুটিয়েছিল সদর হাসপাতালের ডাক্তার, সে যে কী ব্যথা, বলে বোঝাতে পারব না। পাগলা কুকুরে কামড়ালেও চোদ্দোটা।”
”বাঁদর আর হনুমান এক জানোয়ার নয়।” কলাবতী সংশোধন করে দিল।
পঞ্চু আবার উঁকি দিল এবং ভেবো তাকে দেখে ফেলল। ছোরাটা তুলে ধরে সে পঞ্চুর দিকে ছুড়ে মারার ভঙ্গি করে বলল, ”এইসব জানোয়ার দেখলে আমার ভয় করে। চলো, চলো, নীচে চলো।”
নীচে এসে কলাবতী দেখল রঞ্জন কার সঙ্গে টেলিফোনে রুক্ষভাবে কথা বলছে। ব্যান্ডেজটা রাধুকে দেখিয়ে কলাবতী বলল, ”স্কুলে সেন্ট জন অ্যাম্বুলেন্সের ট্রেনিং নেওয়া আছে আমার। ব্যান্ডেজ করে দোব?”
”হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমিই করে দাও খুকি।” রাধুর স্বর নরম, চোখে কৃতজ্ঞ দৃষ্টি। কলাবতীর মাথার মধ্যে তখন ‘ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, মাথা ঠান্ডা রাখো, মাথা ঠান্ডা রাখো’ গুনগুন করে যাচ্ছে।
”জামা না খুললে ব্যান্ডেজ করব কী করে?”
রাধু জামা খোলার জন্য হাত তুলতে গিয়ে ”উহহ’ বলে কাতরে উঠল।
”দাঁড়াও, দাঁড়াও, আমি ব্যবস্থা করছি।” ভেবো এগিয়ে এল। রাধুর বুকের কাছ থেকে ছোরা দিয়ে সে ফরফর করে জামাটার তলা পর্যন্ত টেনে ফাঁক করে দিল। এর পর জামাটা দেহ থেকে ছাড়িয়ে দিয়ে বলল, ”ওপরে অনেক হাওয়াই শার্ট দেখেছি, একটা পরে নিয়ো।”
রাধুর ডান হাতটা বুকের ওপর আড়াআড়ি রেখে কলাবতী কাঁধ বুক ও বাহু বেষ্টন করে শক্তভাবে জড়িয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধল। রাধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলল, ”ওরে ভেবো, আমি যে আষ্টেপিষ্টে বাঁধা পড়লুম। ডান হাত যে নাড়াতে পারছি না।”
ভেবো একটা টোম্যাটো তুলে কামড় দিয়ে চেয়ারে বসে চিবোতে চিবোতে বলল, ”এখন ওইভাবেই থাকো, পরে ডাক্তার দেখিয়ে যা করার করবে। কেন মিছিমিছি ওই মেয়েমানুষটাকে রাগাতে গেলে বলো তো? চেহারা দেখে বুঝতে পারনি গায়ে জোর কত?”
”চুপ মার ভেবো।” রাধু রাগে ধমকে উঠল, ”গায়ের জোর আমারও আছে। নেহাত হুঁশ করিনি ততটা, তাই মারটা খেলুম। একবার পাই হাতের মুঠোয়, ওই বন্দুক দিয়ে মাথা ফাঁক করে দোব।”
দাঁত কিড়মিড় করে রাধু বন্দুকটা বাঁ হাতে টেনে নিল। রঞ্জন ফোন রেখে রাধু আর ভেবোর দিকে তাকিয়ে বলল, ”পুলিশ রাজি হয়েছে।”
দু’জনে অবাক হয়ে তাকাল। ভেবো বলল, ”কীসের রাজি?”
”এখান থেকে আমাদের নির্বিঘ্নে যেতে দেবে।”
রাধু বলল, ”অমনি অমনি চলে যেতে দেবে?”
রঞ্জন চেয়ারে বসে বলল, ”এমনি কি আর যেতে দেয়, দাবার চাল চালতে হয়েছে। তুমি আমার গজ খেলে আমি তোমার ঘোড়া খাব। তুমি আমায় গুলি মারলে আমি এই মেয়েটার মাথায় গুলি মারব। তুমি পুলিশ, নাগরিকদের প্রাণরক্ষা করা তোমার কাজ, এবার তাই করো।” রঞ্জন মুচকি মুচকি হাসল।
