”দাদু, পেপার পড়ছেন? পড়ুন, পড়ুন।”
ঘরে অপরিচিত স্বর হঠাৎ কাছের থেকে শুনে রাজশেখর চমকে কাগজ নামিয়ে বললেন, ”কে? কী চাই তোমার?”
ততক্ষণে অপুর মা ও কলাবতী হাজির হয়ে গেছে।
অপুর মা বলল, ”কত্তাবাবু ও হল একজন ডাকাত, নীচে আরও দু’জন আছে ছোরা আর ছোট বন্দুক নিয়ে। ছোটকত্তাকে নীচে ধরে রেখেছে।”
রাজশেখর ব্যস্ত হয়ে উঠে বললেন, ”এ তো অবিশ্বাস্য ব্যাপার। দিনেদুপুরে বাড়িতে এভাবে ঢুকে ডাকাতি করে যাবে, তাও কখনও হয়!”
তিনি তাড়াতাড়ি খাট থেকে নেমে দেওয়ালে কাঠের ব্র্যাকেটে আড়াআড়ি রাখা দোনলা বন্দুকটার দিকে এগিয়ে যেতেই রাধু পেছন থেকে রাজশেখরের ঘাড়ে জোরে ধাক্কা দিল। তিনি ছিটকে পড়লেন, খাটের বাজুতে ঠুকে কপাল লাল হয়ে উঠল।
”দাদু!” কলাবতী আর্তনাদ করে রাজশেখরকে জড়িয়ে ধরল।
”কত্তাবাবুর গায়ে এভাবে হাত তুললে!” স্তম্ভিত অপুর মা। ”অ্যাতোবড় আস্পদ্দা।” রাগে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল সে।
রাধু ততক্ষণে বন্দুকটা হাতে তুলে নিয়ে প্রথমেই দেখে নিল নলের মধ্যে কার্তুজ ভরা আছে কিনা। নেই দেখে হাত বাড়াল রাজশেখরের দিকে, রুক্ষ গলায় হুকুমের স্বরে বলল, ”টোটাগুলো কোথায়? এখনই আমায় দিন।”
”নআআআ।” রাজশেখরের চিৎকারে রাধু মুখ বিকৃত করল। কড়া গলায় সে বলল, ”সোজা আঙুলে দেখছি ঘি উঠবে না।”
বন্দুকটা তুলে কুঁদো দিয়ে সে রাজশেখরের পিঠে আঘাত করল।
”দাদুকে মারবে না, মারবে না” বলে কলাবতী দু’হাত ছড়িয়ে রাজশেখরকে আড়াল করে দাঁড়াল।
এক হাতে বন্দুক ধরে অন্য হাতে রাধু ”সর সামনে থেকে” বলে কলাবতীকে ঝটকা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপুর মা বন্দুকটা রাধুর হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েই কুঁদোটা তার ডান কাঁধে কোপ মারার মতো বসিয়ে দিল।
”আহহ” বলে রাধু কাঁধে হাত দিয়ে ঝুঁকে পড়ল। সেইসময় ঘরে ঢুকল রঞ্জন আর সত্যশেখর।
”কাকা এই দ্যাখো দাদুর কপাল, ওই লোকটা মেরেছে।” কলাবতী ছুটে গেল কাকার কাছে। ”বন্দুকটা দিয়েপিঠেও মেরেছে।”
রঞ্জনের দিকে তাকিয়ে সত্যশেখর বলল, ”একজন নিরীহ বৃদ্ধ মানুষকে এভাবে যে আপনার লোক মারবে, আমি ভাবতেও পারি না। এখন থেকে আপনাদের শত্রু বলে গণ্য করব।”
থমথমে হয়ে গেল রঞ্জনের মুখ। গম্ভীর গলায় সে রাধুকে বলল, ”নীচে যাও, একদম ওপরে উঠবে না।”
এখন থেকে শত্রুতা
বাঁ হাত দিয়ে কাঁধটা চেপে ধরে রাধু অনিচ্ছুকের মতো ঘর থেকে বেরোবার আগে তীব্র দৃষ্টিতে অপুর মাকে দেখে নিল। অপুর মা—ও দৃষ্টিটা ফিরিয়ে দিল কড়া চোখে তাকিয়ে। রঞ্জন সেটা লক্ষ করল। বন্দুক তখনও অপুর মা’র হাতে ধরা। রঞ্জন হাত বাড়িয়ে বলল, ”ওটা দাও।”
”না।” অপুর মা বন্দুকটা বুকের কাছে আঁকড়ে ধরল।
ঘরের সবাইকে স্তম্ভিত করে রঞ্জন প্রচণ্ড জোরে অপুর মাকে চড় মারল। অপুর মা’র বিশাল শরীর সেই বিরাশি সিক্কা চড়ের ধাক্কায় ঘুরে খাটের ওপরে পড়ে গেল। রঞ্জন বন্দুকটা হাতে তুলে নিয়ে সত্যশেখরকে বলল, ”শত্রুতাটা তা হলে এখন থেকেই শুরু হল।” তার দু’ চোখ দেখে সত্যশেখর অবাক! কোথায় সেই চাহনির শান্ততা, হিংস্র জানোয়ারের মতো জ্বলছে চোখদুটো! লোকটা মুহূর্তে বদলে গেছে।
বন্দুক হাতে রঞ্জন ঘর থেকে বেরোবার আগে রিভলভারটা হিপপকেট থেকে বার করে কলাবতীর রগে ঠেকিয়ে বলল, ”নীচে চলো। তুমিই হবে হোস্টেজ।” এই বলে সে কলাবতীর কপালে নলের ঠোক্কর দিল।
”ওকে নয়, আমাকে হোস্টেজ করুন।” সত্যশেখর হাতজোড় করে কাতর স্বরে বলল।
”না, না, এই মেয়েটিই হবে। পুলিশ যদি কোনও চালাকি খেলতে যায় তা হলে সঙ্গে সঙ্গে একে গুলি করব, তারপর একে একে—।” ইস্পাতের মতো ঠান্ডা কঠিন গলা রঞ্জনের।
মাথা ঘুরছে কলাবতীর, চোখে ঝাপসা দেখছে, কানে শব্দ ঢুকছে না। মাথার মধ্যে তখন পিসির একটা কথা ভিমরুলের মতো বোঁ বোঁ করে চলেছে—”ভয় পেয়ো না, মাথা ঠান্ডা রাখো’। দালান দিয়ে হেঁটে নীচের সিঁড়ির দিকে যাওয়ার সময়ে সে দেখল ছাদের সিঁড়ির খোলা কোলাপসিবল গেট দিয়ে পঞ্চু দ্রুত উঠে গেল।
কলাবতী, রঞ্জন এবং তাদের পেছনে সত্যশেখর একতলায় এল। চেয়ারে বসে সত্যশেখরের টেবলে পা তুলে ভেবো ছোরা দিয়ে শসার খোসা ছাড়াচ্ছিল, চারটে টোম্যাটো, দুটো পেয়ারা, আধডজন মর্তমান কলা, টেবলে সাজিয়ে রাখা। ঘরের এককোণে সন্ত্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে মুরারি, পায়ের কাছে বাজারের থলি, ফলগুলো স্যালাডের জন্য সে বাজার থেকে এনেছে। অন্য একটা চেয়ারে বসে রাধু। বাঁ হাত ডান কাঁধে, মুখ যন্ত্রণায় বিকৃত। ডান হাতের কনুইটা সে রেখেছে চেয়ারের হাতলে, রঞ্জন ইশারায় কলাবতীতে একটা খালি চেয়ার দেখাল।
”এই বুড়ো খানিকটা নুন আন তো! নুন ছাড়া শশা, পেয়ারা খাওয়া যায় না। জলদি।” ভেবোর হুকুম শুনেই মুরারি ঘর থেকে প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেল।
”বড্ড যন্তন্না হচ্ছে গুরু।” রাধু বলল রঞ্জনকে। ”একটা ব্যান্ডেজ—ফ্যান্ডেজ করলে ভাল হত। হাড়টা ভাঙল কি না বুঝতে পারছি না। মেয়েমানুষ দেখে এতটা আর সাবধান হইনি। জব্বর হাঁকিয়েছে, গায়ে যে অত জোর আছে বুঝতে পারিনি।” আক্ষেপে কাতরে উঠল রাধু।
রঞ্জনের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। জানলার কাছে গিয়ে বাইরে ফটক পর্যন্ত দেখে সে সত্যশেখরকে বলল, ”আপনি ও সি—কে ঠিকভাবে বলেছেন তো? ফোন নম্বরটা দিয়েছেন?”
