বছর ত্রিশ বয়স, পরিষ্কার শিক্ষিত উচ্চচারণ। কথা বলার ভঙ্গি মার্জিত। চেহারাটা একদমই ডাকাতের মতো নয়। চওড়া কাঁধ, গায়ে সেঁটে থাকা লাল গেঞ্জির মধ্যে থেকে বুকের ও বাহুর পেশিগুলো ফুলে রয়েছে, পায়ে স্নিকার। চোখদুটি টানা এবং শান্ত।
সত্যশেখর এবার ভরসা করে প্রশ্ন করল, ”আপনার নাম কী?”
”রঞ্জন সিংহ।” বলেই হেসে ফেলল রঞ্জন, ”আমরা দু’জনেই সিংহ। আশা করি সিংহের গুহায় আমরা অশান্তি ঘটাব না। তবে আমার শাগরেদ দু’জন সম্পর্কে কোনও গ্যারান্টি দিতে পারছি না। ওই যে ভেবো ছেলেটা, ওর মানসিক ভারসাম্যটা সামান্য কম, অত্যন্ত অপরিণত, বেড়ালের মতো চলাফেরা আর ছোরাটা খুব ভাল ব্যবহার করে এবং সামান্য কারণেই সেটা করে থাকে। অন্তত আটজনের শরীরে ও ছোরা ঢুকিয়েছে এই বয়সেই। আর যাকে রাধু বলে ডাকলুম—কোথাও একটু বসা যাক এবার।”
ভেবোর কথা শুনতে শুনতে সত্যশেখরের ভেতরটা হিম হয়ে যাচ্ছিল। রঞ্জনের প্রস্তাব শুনে তাড়াতাড়ি বলল, ”নিশ্চয় নিশ্চয়, আমার চেম্বারে আসুন। বসে কথাবার্তা বলবেন।”
তখনই দেখা গেল শকুন্তলা আর কান্তির মা রক্তশূন্য ফ্যাকাশে মুখে সদর দরজার দিকে পায়ে পায়ে চলেছে, তাদের পেছনে ছোরা হাতে একগাল হাসি নিয়ে ভেবো। দরজার একটা পাল্লা খুলে ছোরাটা নেড়ে ভেবো ওদের বেরিয়ে যাওয়ার ইশারা করামাত্র সৌরভ গাঙ্গুলির একস্ট্রা কভার ড্রাইভ মারা বলের মতো শকুন্তলা ও কান্তির মা বেরিয়ে গেল। দরজার ভারী খিল আর তিনটে ছিটকিনি আটকে দিয়ে ভেবো তাকাল রঞ্জনের দিকে।
রঞ্জন বলল, ”একতলা দোতলা ছাদ ভাল করে দেখে নে, বাইরে থেকে বাড়িতে ঢোকার কোনও রাস্তা আছে কিনা, আর দেখে নে কেউ লুকিয়ে আছে কিনা। কোনও জিনিসে হাত দিবি না, রাধুকে বলে দিস।”
সত্যশেখর চেম্বারে ঢুকেই রঞ্জনের চোখ পড়ল সার দেওয়া মোটা মোটা আইনের বইয়ের দিকে। বইয়ের তাকগুলো প্রায় দু’ মানুষ উঁচু। স্টিলের একটা ঘড়াঞ্চিতে উঠে বই পাড়তে হয়।
”মনে হচ্ছে আপনি একজন উকিল।”
সত্যশেখর ছোট্ট জবাব দিল, ”হ্যাঁ।”
”আমিও হতে পারতুম, এক বছর ল কলেজে পড়েছি।”
রঞ্জন এইটুকু বলেই কথা ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, ”হ্যাঁ, রাধুর কথা বলছিলুম, ওর নামে এগারোটা ডাকাতির, চারটে খুনের মামলা রয়েছে, জেল ভেঙে পালিয়ে আমার কাছে আসে তিন মাস আগে। ওর বাড়ি ক্যানিংয়ে। টাকার আর সোনার দিকে অসম্ভব লোভ।”
সদরে কলিং—বেল বাজল। রঞ্জন লাফ দিয়ে জানলায় গিয়ে হিপ পকেটে হাত রেখে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সদর দরজার দিকে তাকাল। বাজারের দুটি থলি দু’হাতে ঝুলিয়ে এক বুড়োমানুষকে দেখে তার চোখে স্বস্তি ফুটে উঠল।
”বোধ হয় মুরারি, ভেবেছিলুম পুলিশ।”
রঞ্জন গিয়ে দরজা খুলল। অপরিচিত লোক দরজা খুলে দিল দেখে মুরারি অবাক! চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসেছে সত্যশেখর। তাকে দেখে মুরারি বলল, ” ছোটবাবু, বাড়িতে নাকি ডাকাত পড়েছে! গেটের বাইরে বিস্তর লোক জড়ো হয়েছে, শকুন্তলা চেঁচাচ্ছে, পুলিশের গাড়ি থেকে দেখলুম পাঁচ—ছ’জন নামল বন্দুক নিয়ে।” কথাগুলো বলার সময় মুরারির চোখে ভয়ের থেকেও বেশি ছিল অবাক হওয়া।
”সত্যবাবু, আপনাকে এখন একটা কাজ করতে হবে।” রঞ্জনের স্বর প্রখর হয়ে উঠল। তার শরীরের ভঙ্গিতে এসেছে কাঠিন্য। ”বাইরে গিয়ে পুলিশকে বলুন, তারা যেন এই বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা একদমই না করে। করলে যা ঘটবে সেটা খুব দুঃখের হবে এই বাড়ির লোকদের কাছে। ছোরা আর রিভলভার তা হলে কাজ করবে আপনাদের ওপর। পুলিশকে বলুন হঠকারী না হতে। আপনার বাবা বা ভাইঝি কিংবা আপনি মারা গেলে সেজন্য দায়ী হবে পুলিশ। আর বলবেন দায়িত্ববান হাই র্যাঙ্কিং কোনও অফিসার ফোনে আমার সঙ্গে যেন কথা বলেন। আপনার চেম্বারের ফোনের নম্বরটা দিয়ে দেবেন। আপনি ল ইয়ার, গুছিয়ে অল্প কথায় বুঝিয়ে দেবেন আপনারা এখন হোস্টেজ হয়ে পড়েছেন, পুলিশ অ্যাকশান নিলেই আপনারা হবেন মৃত।”
রঞ্জন সদর দরজার একটা পাল্লা খুলে বলল, ”স্বাভাবিকভাবে যাবেন, সেইভাবেই ফিরে আসবেন। ”সত্যশেখর ঢোক গিলে মাথা নেড়ে বেরোল। রঞ্জন পাল্লাটা অল্প ফাঁক করে তাকিয়ে রইল তীক্ষ্ন চোখে। দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে সত্যশেখরের তুঁতে রঙের মারুতি হাজার।
রাধু দোতলায় উঠেই লম্বা দালানটার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত চোখ ফেলল। সেখানেই রাজশেখরের শোয়ার ঘর। ঘরটা খোলা। রাজশেখর তখন বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে চোখের সামনে খবরের কাগজ মেলে ছিলেন। রাধু প্রথমে দালানের ডানদিকের ঘরগুলোর পরদা সরিয়ে সরিয়ে দেখল কেউ আছে কিনা। প্রথম ঘরটি সত্যশেখরের, তার পরেরটি কলাবতীর। সেই ঘরের মধ্য দিয়ে পাশের ঘরে যাওয়া যায়, সেটা অপুর মার, তারপর লাইব্রেরি ঘর, এখানেও রাধু কাউকে পেল না। রাজশেখরের ঘরে না ঢুকে দালানের বাঁ দিকে দুটো বাথরুম এবং খাওয়ার ঘরে ঢুকে দেখল। বসার বিরাট ঘরটার একদিকে দুটো বড় দরজা, খুললেই রেলিং—ঘেরা ছাদ। ছাদের দিকে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। বাড়ির গেটের কাছে ভিড় এবং রাইফেল হাতে পুলিশ দেখে পিছিয়ে এল।
এবার রাধু নিঃসাড়ে ঢুকল রাজশেখরের ঘরে। চোখের সামনে তুলে ধরা খবরের কাগজের জন্য তিনি দেখতে পাননি রাধুকে।
