”দেখছেন তো ওই লোকটাকে ফেলে পালিয়ে গেল।” যুবকটি আঙুল দিয়ে কাছেই দাঁড়ানো ধুতি—পাঞ্জাবি পরা কাঁচাপাকা চুলের এক প্রৌঢ়কে দেখাল। বিভ্রান্তি আর আতঙ্ক প্রৌঢ়ের চোখে—মুখে ছড়িয়ে।
”বাড়ি থেকে উনি বেরিয়েছেন গাড়িতে উঠবেন বলে। তার আগেই মারুতিটা ওঁর গাড়ির সামনে দাঁড় করানো ছিল। নিজের গাড়ির দিকে উনি যাচ্ছেন, আমি তখন ফুটপাতে দাঁড়িয়ে চা খাচিছলুম। দেখলুম দুটো লোক মারুতি থেকে বেরিয়ে এসে ওঁকে ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে গাড়িতে তুলে দিল। আধ মিনিটও লাগল না। দেখেই আমি মোটরবাইকে স্টার্ট দিলুম।”
একজন জিজ্ঞেস করল, ”লোকটাকে ধরে গাড়িতে তুলল কেন?”
বিরক্ত স্বরে যুবকটি বলল, ”কেন তুলল তা আমি কেমন করে জানব? হতে পারে কিডন্যাপ করার জন্য। ভদ্রলোক শেয়ার মার্কেটের একজন বড় দালাল, একই পাড়ায় আমরা থাকি, বিশাল বড়লোক, ওঁর কাছ থেকে পনেরো—কুড়ি লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করবে বলে হয়তো এটা করেছে কিংবা অন্য কোনও কারণও থাকতে পারে। মুক্তিপণ আদায় করাটাও তো এখন বেশ ভাল ব্যবসা।”
একটা পুলিশের জিপ এসে থামল। সাদা পোশাকের এক খুদে অফিসার আর এক খাকি কনস্টেবল নামলেন।
”কী করে হল অ্যাকসিডেন্ট? কারা কারা দেখেছেন? কেউ মারা গেছে কি? ডেডবডি তো দেখছি না, গাড়ির লোকেরা কোথায়?” ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পুলিশ অফিসার সবার উদ্দেশে প্রশ্নগুলো ছুড়ে দিলেন। কনস্টেবলকে বললেন, ”তাড়াতাড়ি রাস্তা ক্লিয়ার করো।”
”গাড়ি থেকে তিনটে ডাকাত নেমে এই গলিটা দিয়ে স্যার পালিয়েছে।”
”অ্যাঁ, ডাকাত!”
”হ্যাঁ স্যার, হাতে পিস্তল ছিল।”
অফিসার দ্রুত জিপে ফিরে গেলেন। কলাবতীও ফিরে এল মোটরে।
”কালু ব্যাপার কী?” সত্যশেখর মোটরে স্টার্ট দিল। রাস্তা পরিষ্কার হয়ে গেছে।
”একটা মারুতি ভ্যানে তিনটে ডাকাত পালাচ্ছিল একটা লোককে তুলে নিয়ে। মারুতিটা আমাদের পাঁচিলে ধাক্কা মেরেছে। ডাকাতগুলো তারপর নেমে পালিয়েছে পগার গলির দিকে।” কলাবতী উত্তেজিত গলায় ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিল দ্রুত।
ফটক দিয়ে গাড়ি ঢুকিয়ে সদর দরজার সামনে এসে সত্যশেখর নিরুদ্বিগ্ন স্বরে বলল, ”ডাকাত যে তার প্রমাণ কী?”
”একজনের হাতে পিস্তল ছিল।”
”অ। তাহলে ডাকাত নয়, তোলাবাজ।” সত্যশেখর সদর দিয়ে ভেতরে ঢুকে নিশ্চিন্ত কণ্ঠে বলল কলাবতী আর অপুর মাকে আগে যেতে দিয়ে। ”আস্তে আস্তে পা ফেলে উঠবে, কালুকে ভাল করে ধরো, নয়তো—।” ঠিক সেই সময় তার কানের কাছে চাপা স্বরে কে যেন বলল, ”একটি কথাও নয়, চুপ করে থাকুন।”
.
সিংহের গুহায় সিংহ
সত্যশেখর চমকে উঠেই কাঠ হয়ে গেল। পিঠে একটা শক্ত কিছুর খোঁচা। সে দু’পা এগিয়ে যেতেই আরও দুটো লোক চটপট ভেতরে ঢুকে এসে দরজা বন্ধ করে দিল। পেছনের লোকটিকে সত্যশেখর মুখ ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করতেই পিঠে একটু জোরে খোঁচা লাগল।
”বাড়িতে আর আছে কে কে? বাড়ি থেকে বেরোবার আর দরজা আছে?”
”ওই দু’জনের একজন আমার ভাইঝি, অন্যজন্য অপুর মা। আর আছেন বাবা, দু’জন কাজের বউ আর মুরারি। সে গেছে বাজারে, এখুনি আসবে। বাড়িতে ঢোকা—বেরোনোর একটাই দরজা।”
”ভেবো, দ্যাখ তো কাজের মেয়েমানুষদুটো আছে কোথায়, বাড়ি থেকে ওদের বার করে দে।”
ভেবো ছিপছিপে, লম্বা, বয়স কুড়ির বেশি নয়। মাথায় কদম ছাঁট চুল, পরনে কালো ট্রাউজার্স আর বুশশার্ট, গলায় সরু সোনার চেন। ডান হাতে ঘড়ি। ভেবোর চোখদুটো সামান্য ট্যারা, চোখের নীচে হনুর হাড়দুটি উঁচু। হাত দুটো সরু ও দীর্ঘ। হুকুম পেয়ে ভেবো পিঠের দিকে ট্রাউজার্সে গোঁজা একটা ছুরি বার করে স্প্রিং টিপল। লাফিয়ে বেরোল একটা ছয় ইঞ্চি ঝকঝকে ফলা। ছুরিটা হাতে নিয়ে যখন সে সিঁড়ির পাশ দিয়ে রকের দিকে এগোল তখন কলাবতী ও অপুর মা দোতলার সিঁড়ির পঞ্চম ধাপে দাঁড়িয়ে বিস্ফারিত চোখে ভেবোকে দেখছে।
”পিসি, এরা তো সত্যি ডাকাত, কী হবে এখন?” কলাবতীর গলা থেকে প্রায় চিঁ চিঁ করে শব্দ বেরোল।
অপুর মা তীক্ষ্ন চোখে ডাকাতদের লক্ষ করে যাচ্ছিল। এবার কলাবতীর হাতে একটা টিপুনি দিয়ে চাপা স্বরে বলল, ”ভয় পেয়ো না, মাথা ঠান্ডা রাখো।” তারপর সে সত্যশেখরকে উদ্দেশ করে চেঁচিয়ে বলল, ” ছোটকত্তা, আমি ওপরে যাচ্ছি, কত্তাবাবুকে মিছরির শরবত এখনও দেওয়া হয়নি।”
”রাধু।”
বেঁটে গাঁট্টাগোট্টা মিশকালো, বছর ত্রিশের তৃতীয় ডাকাতটি ডাক শুনেই বলল, ”বলো গুরু।”
গুরু চোখের ইশারায় রাধুকে ওপরে যেতে বলল, রাধু সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে কাঠবেড়ালির মতো লাফিয়ে লাফিয়ে অপুর মা’র পাশ দিয়ে দোতলায় উঠে গেল।
যাকে গুরু বলে সম্বোধন করল রাধু সেই যে দলনেতা, সেটা তিনজনেই বুঝে গেল। সত্যশেখর এবার ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। গুরুর হাতে ধরা অস্ত্রটি দেখেই সে চিনে ফেলল ওটি ওয়েবলি স্কট রিভলভার। তার মুখের ভীত ভাব এবং হৃষ্টপুষ্ট চেহারাটি দেখে গুরু জিনসের ডান হিপপকেটে রিভলভারটি ঢুকিয়ে রাখল। বাঁ দিকের পকেট থেকে উঁকি দিচ্ছে, মোবাইল ফোন।
”আপনার নাম কী?” গুরু জানতে চাইল।
”সত্যশেখর সিংহ।”
”সত্যবাবু, আমরা ডাকাতি করার জন্য এ—বাড়িতে ঢুকিনি। নেহাত বিপদে পড়েই আশ্রয় নিতে ঢুকে পড়েছি। নিরাপদে আমরা চলে যেতে চাই কিন্তু যাওয়ার আগে পর্যন্ত আপনাদের আমরা আটকে রাখব। আর আশা করব ততক্ষণ অন্য কিছু করার চেষ্টা আপনারা করবেন না।”
