শুনে কলাবতীর সংবিৎ ফিরল। জানলার কাছে গিয়ে উঁকি দিল। কুকুরটা মাটিতে শুয়ে, মাথা দিয়ে চুঁইয়ে রক্ত বেরোচ্ছে আর ছেলেটা প্রাণপণে ছুটে যাচ্ছে মালোপাড়ার দিকে, সেখানে কিছু লোক দাঁড়িয়ে, তাদের মধ্য থেকে হাত বাড়িয়ে ছুটে আসছে বোধ হয় ছেলেটির মা।
”দিব্যি করেছিলুম গুলতি আর ছোঁব না।” চাপাস্বরে গজগজ করে উঠল অপুর মা, ”নাও এখন রওনা দাও, ইস্কুলে লেট হয়ে যাবে।”
.
সত্যি সত্যিই ডাকাত পড়ল
সেদিন রাত্রে ঘটে গেল দুর্ঘটনাটা। দোতলায় নিজের ছোট্ট ঘরে দু’হাত তুলে অপুর মা উঁচু তাক থেকে নামাচ্ছিল একটা পুরনো তামার থালা। থালার ওপরে ছিল একটা ছোট ভারী কাঠের বাক্স। থালা ধরে টান দিতেই বাক্সটা পড়ে গেল আর পড়ল অপুর মা’র পায়ের পাতার ওপর। ‘উহহ’ বলে সে পা চেপে বসে পড়ে। রাজশেখর টিভি—তে তখন খবর শুনছিলেন, পাশে মেঝেয় বসা মুরারিকে বললেন, ”দ্যাখ তো মুরারি, কে যেন উহুহু করল!”
মুরারি লম্বা দালানের সিঁড়ি পর্যন্ত গিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে ভাবল পঞ্চু বোধহয় শব্দ করছে। সে দু’বার ”পঞ্চু পঞ্চু” বলে ডাকল। সাড়া পেল না। একতলায় পড়ার ঘরে ক্ষুদিরামবাবু চলে যাওয়ার পরও কলাবতী পড়ে। সত্যশেখর এখনও তার চেম্বারে।
মুরারি ফিরে আসছে তখন কানে এল মৃদু একটা কাতরানি। তাড়াতাড়ি অপুর মা’র ঘরে ঢুকে দেখল, এক হাত দিয়ে দেওয়াল ধরে ডান পা মেঝে থেকে সামান্য তুলে অপুর মা দাঁড়িয়ে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে, মেঝেয় কাঠের বাক্সটা।
”কী হল? অমনভাবে দাঁড়িয়ে কেন?”
অপুর মা বাক্সটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ”ওটা পায়ের ওপর পড়ল। যন্তাোন্না হচ্ছে মুরারিদা।”
মুরারি দেখল রক্তটক্ত বেরোয়নি শুধু একটু ছড়ে যাওয়ার দাগ আর পাতাটা লালচে। সে বলল, ”বোধহয় থেঁতলে গেছে, তুমি আমায় ধরে আস্তে আস্তে পা ফেলে কালুদির ঘরে এসে খাটে বোসো। আমি কত্তাবাবুকে খবর দিচ্ছি।”
কথাটা শুনেই রাজশেখর ব্যস্ত হয়ে বললেন, ”মুরারি, শিগগিরি ফ্রিজ থেকে বরফের ট্রে—টা নিয়ে আয়।” তারপর পায়ের অবস্থা দেখে বললেন, ”এখুনি ডাক্তারবাবুকে খবর দিতে হবে, হাড় ভেঙেছে কি না কে জানে।”
তখনই সত্যশেখর গাড়ি নিয়ে বেরোল পারিবারিক ডাক্তারকে নিয়ে আসতে। ডাক্তারবাবু পরীক্ষা করে ব্যান্ডেজ বেঁধে, দুটো ট্যাবলেট খাওয়ার জন্য ব্যাগ থেকে বার করে অপুর মা’র হাতে দিয়ে বললেন, ”ব্যথা বাড়লে খাবে আর কাল সকালেই এক্স—রে করিয়ে আনুন, বোধ হয় হাড় ভেঙেছে।”
সকাল আটটার আগে বাজারের কাছাকাছি ডায়াগোনিস্টিক সেন্টারের এক্স—রে ইউনিট চালু হয় না। কলাবতীর কাঁধ ধরে অপুর মা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দোতলা থেকে নেমে সদর দরজার সামনে এনে রাখা মোটরে কলাবতীকে নিয়ে পেছনে উঠল, সামনে সত্যশেখরের পাশে থলি হাতে মুরারি, সে যাবে বাজারে এবং বাজার করা সেরে হেঁটেই ফিরে আসবে।
আধঘণ্টা বসে থাকার পর অপুর মা’র পায়ের এক্স—রে হল, নেগেটিভ ও রিপোর্ট পাওয়া যাবে সন্ধ্যায়। সত্যশেখর বলল, ”কোর্ট থেকে ফেরার সময় আমি নিয়ে নোব।”
তিনজনে ফিরছে, বাড়ির কাছাকাছি এসে দেখল রাস্তায় গাড়ি জমে উঠেছে। জ্যাম শুরু হয়েছে। সত্যশেখর জানলা দিয়ে মুখ বার করে জ্যামের কারণটা বোঝার চেষ্টা করে কলাবতীকে বলল, ”কালু নেমে দ্যাখ তো ব্যাপারটা কী। বাড়ির এত কাছে এসে শেষে কিনা ফেঁসে গেলুম।”
গাড়ি থেকে নেমে কলাবতী দু’পা হেঁটেই পেল আশা ভ্যারাইটি স্টোর্স। এর মালিক বিশ্বনাথ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছোটখাটো একটা জটলাকে উত্তেজিত স্বরে বিবরণ দিচ্ছে। কলাবতী দাঁড়িয়ে শুনল, ”ঝড়ের মতো মারুতি ভ্যানটা যাচ্ছে আর তার পেছনে ‘ডাকাত ডাকাত’ বলে চেঁচাতে চেঁচাতে মোটরবাইকে তাড়া করে চলেছে একটা লোক। দোকান থেকে আমি সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এলুম। দেখলুম ভ্যানটা একটা অ্যাম্বাসাডারকে ওভারটেক করতে গিয়ে মুখোমুখি পড়ল সামনে থেকে আসা লরির। শিয়োর অ্যাক্সিডেন্ট বাঁচাতে ওই স্পিডের ওপরই ভ্যানটা ডানদিকের ফুটপাতে উঠে গিয়ে ধাক্কা মারল সিংহিদের বাউন্ডারি ওয়ালে। তারপর দেখলুম, চারদিকের লোকজন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আর গাড়িটা থেকে তিনটে লোক বেরিয়ে এল। একজনের হাতে পিস্তল। তিনজন এধার—ওধার তাকিয়ে পালাবার পথ খুঁজল। শেষকালে সিংহিদের উত্তরদিকের পাঁচিলের গা দিয়ে যে সরু মাটির রাস্তাটা পগার গলিতে গেছে সেটা দিয়ে ওরা ছুটে পালাল। মনে হচ্ছে ডাকাতি করতে বেরিয়েছে।”
শুনতে শুনতে কলাবতীর গা ছমছম করে উঠল। তাদেরই বাগানের দেওয়ালে ডাকাতদের মারুতির ধাক্কা আর পাঁচিলের পাশের রাস্তা দিয়েই তিনটে ডাকাত পালিয়েছে, কী ভয়ংকর ব্যাপার! তাদের একজনের হাতে আবার পিস্তল বা রিভলভার বা ভোজালি টোজালিও নিশ্চয় আছে। এ তো গল্পের বা সিনেমার নয়, সত্যিকারের ডাকাত! কলাবতীর গায়ে কাঁটা দিল।
ধাক্কা দেওয়া মারুতিটা ঘন নীল রঙের, দূর থেকেই কলাবতী দেখতে পেল তাদের পাঁচিলে লেগে রয়েছে মোটরটার মাথা, পেছনের স্লাইডিং দরজাটা হাট করে খোলা। হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনাটার প্রাথমিক বিমূঢ়তা কাটিয়ে লোকজন এগিয়ে এসেছে। জিনস আর টি—শার্ট পরা যে যুবকটি মোটরবাইকে তাড়া করেছিল সে তখন ভিড়ের নায়ক। কলাবতী এগিয়ে গেল তার কথা শুনতে।
