দোতলায় লম্বা করিডরের মতো চওড়া দালানে ব্যাগাটেলি বোর্ডটা রাখা হয়। প্রথম প্রথম কলাবতী প্রবল উৎসাহে দু’বেলা খেলত। মাঝেমধ্যে যোগ দিতেন রাজশেখর এবং সত্যশেখর। মাস দুয়েকের মধ্যেই সবার উৎসাহই থিতিয়ে আসে, অবশেষে ব্যাগাটেলিটার ওপর ধুলো জমতে শুরু করে। মুরারি মাঝেমধ্যে ঝাড়ন দিয়ে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে গজ গজ করে, ”অহেতুক জিনিসটা কেনা হল। খেলবে না যদি তা হলে নীচের মালঘরে পাঠিয়ে দাও।”
পঞ্চু আসার পর কলাবতী ওকে শেখাবার জন্য আবার ব্যাগাটেলি নিয়ে কয়েকদিন খেলতে শুরু করে। একটা টুলে বসে পঞ্চু মন দিয়ে দেখতে দেখতে বোর্ড থেকে একটা গুলি খপ করে তুলে নিল। মাথায় চাঁটি মেরে কলাবতী বলল, ”রাখ, যেখানে ছিল রাখ।” পঞ্চু রেখে দিল। এক মিনিট পরেই আবার একটা গুলি তুলে নিল। এবার তার মাথায় চাঁটিটা একটু জোরেই পড়ল। কিছু না বলে কলাবতী কটমট করে তাকিয়ে শুধু আঙুল দিয়ে বোর্ডটা দেখাল। পঞ্চু বোর্ডের ওপর গুলিটা রেখে দিল।
এরপর কলাবতী ব্যাগাটেলি খেলা শেখাতে গেল পঞ্চুকে। ওর হাতটা স্প্রিংয়ের নব—এর ওপর রেখে বলল, ”টান, আঁকড়ে ধরে টান।”
কলাবতীর মুখের দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে নবটা জোরে টেনেই ছেড়ে দিল। গুলিটা ঊর্ধ্বশ্বাসে বেরিয়ে বোর্ডের কিনারে ধাক্বা দিয়ে লাফিয়ে উঠে ছিটকে মেঝেয় পড়ল। লাফাতে লাফাতে লোহার গুলি চলে যাচ্ছে, পঞ্চু তড়াক করে নেমে গুলিটা ধরে ফেলে কলাবতীর হাতে ফিরিয়ে দিল।
”আবার টান।” পঞ্চুকে টুলে বসিয়ে কলাবতী বলল।
আবার সেই একই ব্যাপার ঘটল। কলাবতী বুঝল মানুষের মতো হাতের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ওর নেই। গুলিটা মেঝে থেকে কুড়িয়ে এনে দিতেই সে বলল, ”তোর দ্বারা ব্যাগাটেলিটা হবে না।” তারপর দুটো আঙুল ‘ভি’ করে সে বলল, ”যা, এটা নিয়ে আয়।” সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চু কলাবতীর ঘরে ঢুকল এবং গুলতিটা দু’হাতে ধরে দুলে দুলে হেঁটে এনে দিল। এরপর বোর্ডে আবার ধুলো জমতে শুরু করে।
স্কুলে যাওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে কলাবতী। বইপত্তর গুছিয়ে নিয়েছে, এবার অপুর মা টিফিন বক্স আর ওয়াটারবটল দিয়ে গেলেই বেরিয়ে পড়বে। মোজা পরে জুতোয় পা গলাতে যাবে তখনই একটা বাচ্চচার ভয়ার্ত চিৎকার আর কুকুরের খেঁকানি এবং কিছু মানুষের হইচই শুনে সে ছুটে পেছনের জানলায় গেল, জানলার নীচে সরু পগার গলি। দেখল গলিতে পাঁচ—ছ’ বছরের গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট পরা একটা রুগণ ছেলে ভয়ে সিঁটিয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে, তার কিছু দূরে একটা কালো রঙের রাস্তার কুকুর ওপরের ঠোঁটটা টেনে মাড়ি আর সামনের দাঁতগুলো হিংস্রভাবে বার করে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ‘গরর গরর’ করছে। ওদিকে মালোপাড়া থেকে ছ’—সাতজন পুরুষ ও নারী ছুটে এসে চিৎকার করছে আর কুকুরটার দিকে ইট ছুড়ছে।
একটা ইট গায়ে লাগতেই কুকুরটা লোকগুলোর দিকে তেড়ে গেল। তারা ভয়ে পেছনদিকে ছুট লাগাল, ”পাগলা কুকুর, কামড়ে দেবে, কামড়ে দেবে,” বলতে বলতে। কুকুরটা ঘুরে আসছে, ছেলেটা ডুকরে কেঁদে উঠল।
‘কিছু একটা এখুনি করতে হবে’ কলাবতীর মাথায় দমকলের ঘণ্টার মতো কথাটা বেজে উঠল। সে ছুটে টেবলের ওপর থেকে গুলতিটা তুলে নিয়ে পোড়ামাটির গুলি রাখা পলিপ্যাকটার জন্য এধার—ওধার তাকাল। মনে পড়ল পরশু ওটা অপুর মা তার হাত থেকে কেড়ে নিয়েবলেছিল, ”রাতদিন শুধু গুলতি আর গুলতি, কী কুক্ষণেই যে জিনিসটা বাড়িতে নিয়ে এলুম। এটা এবার আমি ছুড়ে ফেলে দোব।” বলেই প্লাস্টিকের থলিটা নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে যায়। রান্নাঘরটা অপুর মার দুর্গ, সেখানে কলাবতী ইতিপূর্বে যতবার অভিযান চালিয়েছে ততবারই ব্যর্থ হয়েছে। কলাবতী জানে থলিটা সে একসময় ফিরে পাবে, তবে একটু সময় লাগবে।
কিন্তু এই মুহূর্তে এক সেকেন্ড সময়ও হাতে নেই। এখনই তার গুলি চাই। ছুটে সে ঘর থেকে বেরোতেই চোখে পড়ল ব্যাগাটেলি বোর্ড আর বোর্ডের ওপর পড়ে থাকা লোহার গুলির ওপর। দুটো গুলি সে মুঠোয় তুলে ঘরে ছুটে গেল। ওয়াটারবটল আর টিফিন বক্স নিয়ে তখন অপুর মা সবে দোতলায় উঠেছে। দেখল কলাবতী ব্যাগাটেলি বোর্ড থেকে গুলি তুলেই ঘরে ছুটে গেল। কৌতূহলে অপুর মা দ্রুত তার পিছু নিল।
জানলার গরাদের বাইরে গুলতিটা বার করে কলাবতী রবারের ছিলেতে লোহার গুলি লাগিয়ে এক চোখ বন্ধ করে টানল। তার হাত কাঁপছে। কুকুরটা খ্যাক খ্যাক করে ছেলেটার প্রায় গোড়ালির কাছে মাথা নামিয়ে এগিয়ে এসেছে কামড়াবার জন্য। কলাবতী ছিলেটা ছেড়ে দিল।
‘কেঁউ’ শব্দ করে কুকুরটা ঘুরে পেছনে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে আবার সামনে তাকাল। গুলিটা তার ঊরুতে লেগেছে। সেই সময় অপুর মা তার হাতের জিনিসদুটো মেঝেয় রেখে বলল, ”কাকে মারলে?”
”একটা পাগলা কুকুর, ছেলেটাকে কামড়াতে যাচ্ছে।”
চোখদুটো ছোট হয়ে গেল অপুর মা’র। কপালে ভাঁজ পড়ল। কলাবতীর হাত থেকে গুলতিটা ছিনিয়ে নিয়ে হাত বাড়িয়ে বলল, ”দাও।”
কলাবতী ঝটিতি তার হাতে দ্বিতীয় গুলিটা তুলে দিল। বিশাল চেহারার অপুর মা গুলতির ছিলেতে গুলি লাগিয়ে জানলার কাছে পৌঁছেই ছিলে টেনে দুই গরাদের মাঝ দিয়ে গুলি পাঠাল।
হতভম্ব কলাবতী ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইল অপুর মার দিকে। বাইরে পগার গলির থেকে কুকুরের খ্যাক খ্যাক, ছেলেটার কান্না আর শোনা যাচ্ছে না। অপুর মা ওয়াটারবটল আর টিফিন বক্স মেঝে থেকে তুলে বলল, ”দাঁড়িয়ে রইলে কেন, ইস্কুল যেতে হবে না?”
