”জ্যাঠামশাইকে বোলো আমি অবশ্যই পাঠাব, ভাল তেঁতুল আগে পাই। এ বড়ি কে তৈরি করল?”
”পিসি করেছে আর পিসি যা তৈরি করে দাদু তাতেই আটঘরার স্টাম্প মেরে দেয়। আটঘরার শুক্তো, আটঘরার অম্বল, আটঘরার বড়ি। আর এই বড়ি তৈরি করতে গিয়ে পিসি দুটো কাক পর্যন্ত মারল গুলতি দিয়ে।”
”গুলতি।” মলয়ার ভ্রূ আধ ইঞ্চি উঠে গেল। ”অপুর মা পেল কোথায়? ওটাও কি আটঘরার?”
”না, না, ওটা এখানকার মালোপাড়ার শ্যামা কামারের তৈরি। বড়দি, শুনলুম আপনিও ছেলেবেলায় গুলতি ছুড়ে কাকার কপাল ফাটিয়েছিলেন, সত্যি?”
”ফাটাইনি, তবে এখন গুলতি পেলে সত্যি সত্যি ওর মাথাটা ফাটাব। বুড়ো হচ্ছে অথচ কাণ্ডজ্ঞান লোপ পাচ্ছে। কী করে যে ব্যারিস্টারি করে, ভেবে পাই না।”
”কাকাও ঠিক এই কথা বলে, ‘মলু যে কী করে হেডমিস্ট্রেসি করে, বুঝতে পারি না।’ বড়দি আপনি সত্যি সত্যি তা হলে কাকার কপাল ফাটাননি?”
”আমাদের বকদিঘির বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজোয় তোমাদের নিমন্তন্ন করা হয়েছিল। আটঘরা থেকে নেমন্তন্ন রাখতে এসেছিল সতু। তখন ও ক্লাস নাইনে, আমি সিক্সে। আমাদের পুকুরধারে আছে একটা বিলিতি আমড়ার গাছ, এই বড় বড় যেমন তেমনিই মিষ্টি। দেখেই সতুর খাওয়ার ইচ্ছে হল, আমাকে বলল, খাওয়াও। বললুম, কাজের বাড়িতে আমড়া পাড়ার লোক এখন পাব না, তুমি নিজে গাছে উঠে পেড়ে খাও। বাহাদুরি দেখাবার জন্য গাছে উঠল, তারপরই ‘ওরে বাবা রে, মরে গেলুম রে’ বলতে বলতে ঝপ করে লাফিয়ে নামল। লাল কাঠপিঁপড়ের কামড় খেয়েছে। কালু, এই পিঁপড়ের কামড়ে যে জ্বলুনি তা প্রায় বিছে কামড়াবার মতো। সতুর ধারণা পিঁপড়ের কামড় খাওয়াবার জন্য ইচ্ছে করে ওকে গাছে তুলিয়েছি। খেপে গিয়ে ও একটা মাটির ঢেলা তুলে আমার দিকে ছুড়ল, বলা বাহুল্য, লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। তখন আবার একটা ঢেলা তুলল, আমার হাতে ছিল গুলতি আমিও একটা মাটির ঢেলা গুলতি দিয়ে ছুড়লুম। ওর মাথায় লেগে সেটা ভেঙে যায়। এখন সেটাকেই বলছে ওর কপাল ফাটিয়েছি, অকল্পনীয়! কালু একটা জিনিস জেনে রেখো, গুলতি খুব নিরীহ অস্ত্র নয়। ছোট্ট ডেভিড গুলতি দিয়েই দৈত্য গোলিয়াথকে মেরেছিল।”
এরপর মলয়া খোঁজ নিল নমিতা কেমন পড়াচ্ছে? বলল, ”খুব ভাল টিচার, বাংলা আর সংস্কৃতে অসম্ভব ভাল। খুব মন নিয়ে ওর কাছ থেকে বাংলাটা শেখো। আমরা তো বাংলা ভাষাটা শেখার জিনিস বলেই মনে করি না। সেদিন নমিতা এগারো ক্লাসের দুটি মেয়ের খাতা দেখাল। একজন লিখেছে, শেয়ালটা আঙুরের কাঁদি দেখে লোভ সামলাতে পারল না। আর একজন লিখেছে ইংরেজরা বিপ্লবীদের ধরে হাড়িকাঠে ঝোলাত। দেখে কী যে লজ্জা করল কী বলব! কালু তুমি যেন ‘কাঁদি’ ‘হাড়িকাঠ’—এর মতো বাংলা শিখো না।”
আরও কিছুক্ষণ কথা বলে কলাবতী উঠল বাড়ি ফেরার জন্য। মলয়া তাকে আবার মনে করিয়ে দিল, ”গুলতি নিয়ে বেশি ছোড়াছুড়ি কোরো না। দেখতে নিরীহ কিন্তু মারাত্মক হতে পারে।”
রাতে খাবার টেবলে কলাবতী জানাল, হরিদাদু বড়ি দেখে কী বলেছেন। ”আমিও বললুম আচার দেখে কাকাও ওই কথা বলেছে।”
সত্যশেখর বাঁ হাতে টেবলে চাপড় মেরে বলল, ”এই তো সিংহিবাড়ির মেয়ের মতো কথা। কালু যখনই পাবি বকদিঘিকে ডাউন করে দিবি। তোর কথা শুনে বড়দি কী বলল?”
”কী আবার বলবেন, বললেন তোমার কথায় উনি কিছু মনে করেন না।”
”তার মানে আমাকে অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য করল।” বলেই সত্যশেখর ছোলার ডালের বাটিটা তুলে মুখে ঢেলে দিয়ে বলল, ”মনে করবে কী করে, আমার প্রত্যেকটা কথাই তো সত্যি।”
”তবে কাকা, বড়দি বললেন তোমায় গুলতি দিয়ে মেরেছিলেন সেটা একটা মাটির ঢেলা, মাথায় লেগে ভেঙে গেছল আর তাতে তোমার কপাল ফাটেনি।”
”এই কথা বলল!” সত্যশেখর বজ্রাহতের মতো নিজেকে দেখাবার চেষ্টা করল।
গম্ভীর মুখ করে কলাবতী বলল, ”আরও বললেন, এখন গুলতি পেলে সত্যি সত্যিই তোমার মাথা ফাটাবেন।”
”এই হল রিয়্যাল বকদিঘি। সামনে আচার, আড়ালে অনাচার। এমন একটা মিথ্যা কথা তোকে বলতে পারল?” সত্যশেখরের স্বর হতাশায় ভেঙে পড়ল।
এতক্ষণ রাজশেখর চুপ করে শুনে যাচ্ছিলেন, এবার বললেন, ”কালু বলেছিস মলুকে তেঁতুলের আচারটা আর একবার—।”
”বলেছি। ভাল তেঁতুল পেলেই করে পাঠিয়ে দেবেন।”
সত্যশেখর একটুও দেরি না করে বলল, ”তার মানে আবার পল্লি শিল্পশ্রীতে ওকে যেতে হবে।”
ছেলের কথায় কান না দিয়ে রাজশেখর বললেন, ”ঝালটা যেন আগের মতোই দেয়, এটা ওকে বলে দিতে হবে।” কথাটা তিনি বললেন এটাই বোঝাতে সত্যশেখরের ‘শিল্পশ্রী’ গল্পটার এতটুকুও তিনি বিশ্বাস করেননি এবং সত্যশেখর সেটা হৃদয়ঙ্গম করে চুপচাপ খাওয়া শেষ করল।
.
ব্যাগাটেলির গুলি অন্য কাজে
বছর দুয়েক আগে রাজশেখর নিলাম থেকে একটা ব্যাগাটেলি কিনেছিলেন। রাসেল স্ট্রিটের একটা রেস্টুরেন্টে ওটা ছিল, খদ্দেররা অবসরে খুশিমতো খেলত। রেস্টুরেন্ট উঠে যাওয়ায় অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে ব্যাগাটেলিটাও নিলামে আসে। একটা চারফুট উঁচু টেবলে স্ক্রু দিয়ে আটকানো, সাড়ে তিন ফুট লম্বা এতবড় ব্যাগাটেলি বোর্ড অর্ডার দিয়ে তৈরি করাতে হয়। নাতনির কথা ভেবে রাজশেখর সেটা কিনে নেন।
ছোট বোর্ডের ব্যাগাটেলিতে ঝকঝকে সাদা কাবলিমটরের মাপের লোহার গুলি কাঠের স্টিক দিয়ে ঠেলে দিতে হয়। এই বোর্ডে সেটা করা হয় একটা স্প্রিং টেনে ছেড়ে দিয়ে। গুলি আছে দশটা। স্প্রিং ধাক্কা দেয় আঙুরের সাইজের ভারী ওজনের লোহার গুলিতে। গুলি দু’পাশ চাপা একটা গলি দিয়ে জোরে বেরিয়ে এসে প্রথমে ধাক্কা দেয় একটা পিনে, তারপর এখানে—ওখানে ধাক্কা খেতে খেতে পিন দিয়ে বেড়ার মতো তৈরি গোল গোল ঘরগুলোর একটায় ঢুকে যায়, না ঢুকতে পারলে বোর্ডের নীচে পড়ে যায়। ঘরগুলোয় নম্বর দেওয়া আছে। যে ক’টা গুলি ঘরে ঢুকবে, যোগ করে তত নম্বর সে পাবে।
