পঞ্চুর আনন্দ উথলে ওঠে যখন কলাবতী স্কুল থেকে ফেরে। ও ঠিক জানে কখন কলাবতী ফটক দিয়ে ঢুকেই ”পনচুউ” বলে ডাকবে। ডাক শুনে ছুটে এলেই কলাবতী তকে কোলে তুলে নেবে। বইয়ের বস্তাটা ওর কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে বলবে, ”যা, রেখে আয়।” পঞ্চু দোতলায় রেখে আসবে কলাবতীর টেবলে, আর সঙ্গে আনবে গুলতিটা, গুলি রাখা থলিটাও। সবকিছু যেন ওর মুখস্থ। এরপর, সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের আর আলাদা দেখা যাবে না। বাগানে গুলতি নিয়ে টার্গেট প্র্যাকটিস করার সময় দেওয়ালে লাগা পোড়া মাটির গুলি ছিটকে যায়, পঞ্চু সেগুলো কুড়িয়ে এনে হাতে তুলে দেয়।
একদিন দুপুরে দমকা হাওয়ায় ছাদ থেকে রাজশেখরের গেঞ্জি উড়ে গিয়ে পড়ে নিমগাছের উঁচু ডালে। স্কুল থেকে ফিরে কলাবতী দেখে মুরারি একটা বাঁশ দিয়ে গেঞ্জিটা পাড়ার চেষ্টা করছে। বাঁশটা ছোট তাই পৌঁছোচ্ছে না। কলাবতী কিছুক্ষণ দেখে বলল, ”থাক মুরারিদা, আমি ব্যবস্থা করছি। পঞ্চু আয় তো।” এরপর সে আঙুল দিয়ে গাছের ডালে আটকে থাকা গেঞ্জিটা দেখিয়ে বলল, ”ওটা পেড়ে আন”, চটপট দু’মিনিটের মধ্যে গেঞ্জিটা কলাবতীর হাতে পৌঁছে গেল। হাততালির শব্দে সে ঘুরে তাকাল দোতলার ছাদের দিকে। দাদু হাততালি দিচ্ছেন, পাশে দাঁড়িয়ে পিসি।
রাজশেখর চেঁচিয়ে বললেন, ”কালু, ওকে তো পুরস্কার দেওয়া উচিত। চকোলেট কিনে দে, মুরারিকে বল।”
কলাবতীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে মুরারি প্রায় ছুটে গিয়ে ‘ক্যাডবেরি’ কিনে আনল, কলাবতী মোড়ক ছিঁড়ে পঞ্চুর মুখের সামনে ধরল। জীবনে সে এমন বস্তু মুখে দেয়নি। দু—তিনবার শুঁকেই চকোলেটটা ছিনিয়ে নিয়ে সে মুখে পুরে চিবিয়ে গিলে ফেলল। তারপরই সে ছেঁড়া মোড়কটা তুলে নিয়ে কলাবতীর দিকে তাকিয়ে ”চিঁ চিঁ” করে বায়না শুরু করল, তার আরও চাই। কলাবতী ধমক দিল, ”আর খায় না, অনেক দাম।”
আটঘরার বড়ি বকদিঘির আচার
খাওয়ার টেবলে রাজশেখর বললেন, ”হরি তো গত বছর বকদিঘির আচার পাঠিয়েছিল,আমরা তো এবার আটঘরার বড়ি পাঠাতে পারি, কী বলিস কালু?”
শুনেই কলাবতী লাফিয়ে উঠল, ”ঠিক বলেছ দাদু, অনেকদিন বড়দির বাড়ি যাওয়া হয়নি। আমি তা হলে বড়ি নিয়ে যাব।”
সত্যশেখর বিরক্ত মুখে বলল, ”আবার ওদের বড়ি দেওয়া কেন, ওই থার্ড ক্লাস আচার খেয়ে আমি এক হপ্তা অন্য কোনও খাবারের টেস্টই ফিল করিনি।”
”কী বলছ কাকা, আদা আর করমচা দিয়ে আচারটা? কী দারুণ খেতে, গোটা শিশি তো আমি আর দাদু সাতদিনে শেষ করলুম। বড়দি যা সুন্দর বানায়!”
”নিজে বানিয়েছে না ছাই, দেখগে মানিকতলায় পল্লি শিল্পাশ্রম থেকে কিনে এনে নিজের হাতে করা বলে চালিয়েছে।”
”ঠিক আছে, আমি বড়দিকে জিজ্ঞেস করব?”
সন্ত্রস্ত হয়ে সত্যশেখর বলল, ”কী জিজ্ঞেস করবি, নিজের হাতে বানিয়েছে কিনা? ও কি বলবে শিল্পাশ্রমের আচার?”
”বড়দি কখনও মিথ্যা কথা বলেন না।” কলাবতী তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল। সত্যশেখর বাবার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখল তিনি নাতনির কথা অনুমোদন করে মাথা নোয়ালেন।
১৭৯৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ নামে যে ব্যবস্থা বাংলায় ভূমিরাজস্বের ক্ষেত্রে চালু করেন তাতে জমিদাররা জমির মালিক ও স্বত্বাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি পান। সেই সময়ই আটঘরায় সিংহ এবং বকদিঘিতে মুখুজ্যে পরিবার জমিদার হয়ে বসেন আর তখন থেকেই এই দুই পরিবারের মধ্যে জমির দখল ও প্রজাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের অধিকার নিয়ে লাঠালাঠি থেকে বন্দুকের লড়াই পর্যন্ত হয়ে গেছে।
এদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রেষারেষি ও লড়াই ক্রমশ থিতিয়ে আসতে থাকে, যখন দুই পরিবারই কলকাতায় বাড়ি তৈরি করে গ্রাম থেকে এসে বাস করতে থাকে। সেই বছরই অর্থাৎ ১৮৫৫ সালে হিন্দু কলেজের নতুন নামকরণ হয় প্রেসিডেন্সি কলেজ। সিংহি আর মুখুজ্জে বাড়ির দুই ছেলে প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হয় এবং বলা যায় তখন থেকেই পরিবারদুটিতে অন্য ধরনের হাওয়া বইতে শুরু করে, পরস্পরের মধ্যে ধীরে ধীরে সখ্য তৈরি হয়। দুই বাড়িতে শুরু হয় যাতায়াত। সম্প্রীতি সত্ত্বেও দুশো বছরের ঝগড়ার রেশ মাঝেমধ্যে ফুটে বেরোয় হুল ফুটিয়ে কথা বলার মধ্যে।
চারটে ছোট ছোট পলিপ্যাক হাতে কলাবতীকে দেখে মলয়া অবাক হয়ে বলল, ”কী ব্যাপার কালু, হাতে ওগুলো কী?”
”বড়ি। দাদু পাঠিয়ে দিলেন, আটঘরার বড়ি।”
মলয়ার বাবা হরিশঙ্কর তখন বেরোচ্ছিলেন, কলাবতীর কথা কানে যেতেই বসার ঘরে ঢুকে বললেন, ”দেখি, কেমন বড়ি।”
চারটে পলিপ্যাক খুলে দেখলেন, গন্ধও শুঁকলেন, তারপর বললেন, ”আটঘরার বড়ি? কী আশ্চর্য, মলু ঠিক এইরকম বড়ি আমি পল্লি শিল্পাশ্রম দোকানে দেখেছি, ঠিক এই গন্ধ।”
কলাবতী একটুও না দমে বলল, ”জানেন বড়দি, কাকাও ঠিক একই কথা বলেছে আপনার পাঠানো আচার খেয়ে।”
মলয়া বিব্রত হয়ে বলল, ”সতুর কথায় আমি কিছু মনে করি না।”
হরিশঙ্করের মুখ থমথমে হয়ে উঠল। মেয়েকে বললেন, ”জ্যাম—জেলি বানাবি বলছিলিস। যখন বানাবি সতুকে সামনে বসিয়ে বানাবি, নয়তো বলবে শেয়ালদার বাজার থেকে কিনে পাঠিয়েছে।” বলেই গটগট করে হরিশঙ্কর বেরিয়ে গেলেন।
কলাবতী নম্র গলায় বলল, ”দাদু কিন্তু কাকার এসব কথায় বিন্দুমাত্র কান দেন না। বলে দিয়েছেন, মলুকে বলিস তেঁতুলের ঝাল আচারটা আর একবার যদি খাওয়ায়।”
