”আরে আরে, এ কী কাণ্ড।” বইটা হাতে নিয়ে তিনি নাতনিকে বললেন, ”তুই শিখিয়েছিস নাকি?”
”তবে না তো কে শেখাবে? আস্তে আস্তে ওকে আরও শেখাব।”
জলখাবার উধাও
সত্যশেখর হাইকোর্ট থেকে বেরিয়ে, সেখানেই কয়েকশো উকিল অ্যাটর্নি বসেন এমন একটা বাড়িতে তার ছোট্ট চেম্বারে মক্কেলদের সঙ্গে কথাটথা বলে বাড়িতে ফিরল সন্ধ্যের পর। স্নান করে জলযোগ সেরে এবার সে মক্কেলদের নিয়ে বসবে বাড়ির চেম্বারে, যাকে সে পুরনো ঢঙে বলে সেরেস্তা।
ক্ষুদিরামবাবু পড়াতে এসেছেন। পড়ার ঘরে আসবার আগে কলাবতী পঞ্চুকে তিনতলার সিঁড়িঘরে রেখে দোতলায় সিঁড়ির কোলাপসিবল গেট বন্ধ করে দিয়েছে, যাতে একতলা—দোতলা ঘুরে বেড়াতে না পারে। সত্যশেখর সেরেস্তায় বসেই মুরারির এনে দেওয়া জলখাবার খায়। তখন মক্কেল কেউ এলে বাইরে রাখা চেয়ারে অপেক্ষা করে।
চারখানা গরম পরোটা, আলু ছেঁচকি ও দুটি ল্যাংচা মুরারি রেখে দিল টেবলে। সত্যশেখর তখন মামলার একটা ব্রিফ পড়ছিল। মুখ তুলে প্লেটের দিকে একনজর তাকিয়ে বলল, ”একটা কাঁচালঙ্কা দিয়ে যাও, বাইরে কি কেউ এসেছে?”
”আসেনি।” বলে মুরারি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। একটু পরেই লঙ্কা নিয়ে এসে বলল, ”ওপরে ফোন এসেছে।”
টেবলে রাখা ফোনটা দিকে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে সত্যশেখর বলল, ”সাতদিন হয়ে গেল এখনও লাইন ঠিক হল না। কোথা থেকে ফোন এসেছে?”
”কত্তাবাবু বললেন শিলিগুড়ি থেকে।”
”ওহহ,” সত্যশেখর ব্যস্ত হয়ে দোতলায় ফোন ধরতে গেল। মুরারিও ঘর থেকে বেরোল।
মিনিট পাঁচেক পর সত্যশেখর ফিরে এসে খাবারের প্লেটটা টেনে এনে তাকাতেই চক্ষুস্থির, তারপরই চিৎকার, ‘মুরারি, মুরারি। দুটোমাত্র পরটা আর ল্যাংচাগুলো গেল কোথায়?”
ত্রস্ত মুরারি ছুটে এসে প্লেট দেখে বলল, ”আমি তো চারটেই দিয়েছি আর দুটো ল্যাংচাও।”
হুংকার দিয়ে সত্যশেখর বলল, ”তা হলে গেল কোথায়। কেউ একজন নিশ্চয় নিয়ে গেছে। কে সে? ভূত নিশ্চয় নয়!”
অঙ্ক কষতে কষতে কলাবতীর কানে গেছে কাকার কণ্ঠস্বর, সে ক্ষুদিরামবাবুকে ”আমি আসছি সার, এক মিনিট” বলেই ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে দোতলায় সিঁড়ির কোলাপসিবল গেট খুলে তিনতলায় সিঁড়িঘরে পৌঁছে দেখল পঞ্চু নেই এবং ছাদের দরজা খোলা। মনে মনে সে বলল, ”যা ভেবেছিলুম, নিশ্চয় পঞ্চুর কাজ।”
আলো জ্বেলে সে ছাদের এধার—ওধার দেখতে শুরু করল। হঠাৎ দেবদারু গাছে সরসর শব্দ হতেই সে পাঁচিলের ধারে এসে নিচু গলায় ডাকল, ”পঞ্চু, পঞ্চু, অ্যাই পঞ্চু।” গাছ থেকে চিঁ চিঁ মতো একটা আওয়াজ হল।
দেবদারু গাছটা বাড়ির গা ঘেঁষে। তার ডালপালা ছাত থেকে হাতদশেক দূরে। কলাবতী আবার ডাকল, ”আয়, আয়।” গাছ থেকে লাফ দিয়ে ঝপাত করে ছাদের পাঁচিলে নামল পঞ্চু। কলাবতী ওর হাতের চেটোয় হাত দিয়ে পেল চটচটে রস। বুঝে গেল কাকার প্লেটের ল্যাংচার ও পরোটার অন্তর্ধান রহস্যটা। এখন কাকা যদি জানতে পারে বাড়িতে একটা বানর পোষা হয়েছে, আর সেই বানর তার খাবার চুরি করেছে, তা হলে যা কাণ্ড ঘটবে, সেটা ভেবে সে মনে মনে শিউরে উঠল।
ছাদের দরজায় শিকল তুলে দিয়ে আবার সিঁড়িঘরে পঞ্চুকে রেখে কলাবতী দোতলার কোলাপসিবল গেট টেনে দিয়ে নীচে নেমে এল পড়ার ঘরে। শুনতে পেল কাকা গজগজ করে চলেছে, ”দু—দুটো পরোটা আর ল্যাংচা আমার টেবল থেকে…মুরারি ব্যাপার কী? তোমার তো চুরি করে খাওয়ার অভ্যেস নেই, তা হলে কি কালু? কিন্তু কালু তো খুব একটা মিষ্টির ভক্ত নয়, তা হলে? বাইরের লোক তো কেউ আসেনি, তা হলে? এখন কি আমায় ভূতপ্রেতে বিশ্বাস করতে হবে?”
সারা বাড়িতে ফিসফাস, ছমছমে ভাব। অপুর মা জোড়হাত কপালে ঠেকিয়ে বার বার বলল, ”বাবা তারকনাথ, তুমি তো ভূতনাথও, আমাদের দেখো!” মুরারি বলল, ”ছি ছি, ছোটকত্তা শেষে আমাকেও বললেন ‘তোমার তো চুরি করে খাওয়ার ওব্যেস নেই’, তার মানে ওনার মনে একটা সন্দেহ জেগেছিল, নইলে কথাটা বলবেন কেন?” রাজশেখর বললেন, ”হয়তো অপুর মা দুটো পরোটাই দিয়েছিল আর ল্যাংচা দিতে ভুলে গেছল। মুরারি তো দেওয়ার সময় অতটা নজর করেনি।” প্রতিবাদ করে সত্যশেখর বলল, ”না বাবা, আমি ঠিক নজর করেছি, চারটে আর দুটো ছিল।” তিনি আর কথা বাড়াননি, কেননা খাবারদাবারের দিকে ছেলের নজরে যে ভুল হবে না সেটা ভাল করেই জানেন।
রাত্রে খাওয়ার পর দোতলার ছাদে রাজশেখর পায়চারি করছিলেন, তখন কলাবতী তাঁকে বলল, ”দাদু, আমি কিন্তু জানি কে খেয়েছে।”
রাজশেখর থমকে দাঁড়ালেন, ”কে?”
”কাউকে বলবে না, বলো।”
”বলব না।”
”ওটা পঞ্চুর কীর্তি।”
”কী করে খেল। ও তো সিঁড়িঘরে ছিল!”
”ছিল, সেখান থেকে ছাদ তারপর লাফিয়ে দেবদারু গাছ, তারপর মাটিতে নেমে সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই কাকার ফাঁকা সেরেস্তায় পরোটা—ল্যাংচা দেখে আর লোভ সামলাতে পারেনি। ভেবেছিলুম ওকে পেটাব কিন্তু তা হলে তো বাড়ির সবাই জেনে যাবে, পঞ্চুকে বাড়ি থেকে দূর করে দেবে কাকা।”
চিন্তিত স্বরে রাজশেখর বললেন, ”এখন থেকে ওকে সামলে রাখতে হবে।”
সামলে রাখার জন্য পরদিন থেকে সত্যশেখর কোর্টে বেরোনোর আগে পর্যন্ত সে পঞ্চুকে নিজের ঘরে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে আটকে রেখে নীচে পড়তে যেত। তার স্কুলের নমিতাদি সকালে একঘণ্টা সপ্তাহে তিনদিন ইংরেজি আর বাংলা, বাকি তিনদিন অন্য এক স্কুলের শিক্ষক তাকে বিজ্ঞান পড়ান। সত্যশেখরের গাড়ি ফটক থেকে বেরোলেই কলাবতী পঞ্চুকে বাগানে রেখে সদর দরজা বন্ধ করে দেয়। বাড়িতে ঢোকার এই একটিই দরজা। ঢুকতে হলে এবার পঞ্চুকে গাছ বেয়ে উঠে লাফিয়ে ছাদে নেমে সিঁড়ি দিয়ে ঢুকতে হবে। ছাদের দরজাটাও এখন সারাক্ষণ বন্ধ রাখা হচ্ছে। কেউ বাড়ির বাইরে গেলে সদর দরজায় সঙ্গে সঙ্গে খিল পড়ে যায়। পঞ্চু সারা দুপুর বাধ্য হয়েই বাগানে কাটায়। একবার সে পাইপ বেয়ে দোতলার ছাদে উঠেছিল। অপুর মা দেখতে পেয়ে ছড়ি নিয়ে তেড়ে যেতেই দ্রুত নেমে যায়।
