”তা নয় রইল, কিন্তু বাড়ির অন্যরা, তোর কাকা, পিসি, মুরারিদা, তারা পঞ্চুকে মেনে নেবে তো?”
তখনই বসার ঘরে ঢুকল অপুর মা, কলাবতী যে সোফায় বসে ছিল তার পেছন দিকের দরজা দিয়ে।
”দিয়ে এলে কালুদিদি?”
কলাবতী মাথা ঘুরিয়ে তাকাল, বলল, ”দিয়ে এসেছি, তবে ওরা খাবে রাত্তিরে। কাল স্কুলে ধুপু আমাকে জানাবে কেমন লাগল।”
”মনে করে কিন্তু জেনে আসবে।” অপুর মা তারপর রাজশেখরের দিকে তাকিয়ে বলল, ”সকালে বললেন গা গরম গরম লাগছে। থারমিটারটা এনেছি, দেখুন একবার জ্বরটর হল কিনা।”
অপুর মা সোফার পেছন থেকে এগিয়ে গেল থার্মোমিটার হাতে, আর তখনই সোফায় গুটিশুটি হয়ে বসা পঞ্চুকে দেখতে পেয়ে তার চোখদুটো গোল হয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসার উপক্রম হল। এক পা পিছিয়ে গিয়ে সে বলল, ”ওমমা, এ আবার কে?”
জবাব দিলেন রাজশেখর, ”পঞ্চু। আজ থেকে আমাদের বাড়িতে থাকবে। তোমার তাতে অসুবিধে হবে না তো?”
অপুর মা কিছু বলার আগেই কলাবতী তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ”না, না পিসির অসুবিধে হবে কেন, পিসি তো পশুপাখি খুব ভালবাসে, তাই না? তুমি তো দেশের বাড়িতে কুকুর পুষেছিলে, তোমাদের হাঁস ছিল, গোরু ছিল, ছাগলও ছিল।”
অপুর মা বুঝে গেল দাদু—নাতনি জোট এই বাঁদরটার দিকে, দু’জনের বিরুদ্ধে সে একা। তার আপত্তি টিকবে না। থমথমে মুখে সে বলল, ”অসুবিধে হবে কেন, একটা বাঁদরের বদলে নয় দুটোকে এবার থেকে দেখতে হবে।” বলেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাজশেখর বললেন, ”কালু, ভীষণ চটে গেছে পিসি, তোকে বাঁদর বলে গেল।”
”পিসিকে ঠিক করতে হয় কী করে, আমি জানি। কাল ওকে ধুপুর মায়ের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা এমন শুনিয়ে দেব আর বলব তোমার বড়ির ঝাল পঞ্চু চেটেপুটে খেয়েছে। কীরে পঞ্চু, দারুণ নয়?”
কলাবতী পঞ্চুর মাথা ধরে নাড়িয়ে দিল। পঞ্চু চিঁইই চিঁই শব্দ করে সম্ভবত বুঝিয়ে দিল কলাবতী ঠিকই বলেছে।
রাজশেখর বললেন, ”কালু রাতে ও থাকবে কোথায়? শুনলুম তো রাতে পার্কের গাছে থাকত। আমাদের বাগানে তো বড় গাছ বলতে দেবদারু, চাঁপা, নিমগাছ, তার একটাতেই ও থাকুক।”
”না, না দাদু, গাছেটাছে নয়, বাড়ির মধ্যে থাকবে।” কলাবতী আপত্তি জানাল, ”আমার ঘরেই থাকবে।”
”তোর ঘরে?” রাজশেখর সন্ত্রস্ত হলেন, ”অপুর মা তা হলে বাক্স বিছানা নিয়ে সোজা আটঘরায় ফিরে যাবে। পঞ্চুকে বরং তিনতলার সিঁড়িঘরে চট পেতে বিছানা করে দে। রাতে ওখানে থাকবে আর দিনের বেলা বাগানে।”
মুরারি এতক্ষণ বাড়ি ছিল না। রাজশেখর তাকে পাঠিয়েছেন তাঁর কলেজ সহপাঠী এক অধ্যাপক বন্ধুর বাড়িতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওপর লেখা একটি ইংরেজি বই আনার জন্য। মুরারি বই হাতে ফটক দিয়ে ঢুকে দেখল বাগানে কলাবতী চারতলা সমান চাঁপাগাছটার দিকে মুখ তুলে চেঁচাচ্ছে, ”ওঠ, ওঠ, আরও ওপরে ওঠ।” ওর হাতে গুলতি।
বিকেলে সে গুলতি নিয়ে প্র্যাকটিস শুরু করেছে বাগানে। অপুর মা কয়লার উনুনে মাটি পুড়িয়ে সুপুরির মাপের গুলি বানিয়ে দিয়েছে, বাগানের পাঁচিলে ইট ঘষে লাল টার্গেট করে সে গুলতি নিয়ে গুলি ছোড়ে বিকেলে। মুরারি গাছের দিকে তাকিয়ে বলল, ”কাকে বলছ কালুদি?”
”পঞ্চুকে।” মুরারির বিভ্রান্ত চোখ দেখে সে ব্যাপারটা খোলসা করে দিল, ”একটা বাঁদর, আমার সঙ্গে এসেছে, এ বাড়িতেই থাকবে।”
তখনই পঞ্চু লাফ দিয়ে মাটিতে পড়ল। মুরারি বাঁদর পছন্দ করে। সে হাত বাড়িয়ে ডাকল, ”আয়, আয়” ডাক শুনে পঞ্চু পিছিয়ে কলাবতীর পাশে দাঁড়িয়ে পিটপিট করে মুরারিকে দেখতে লাগল। ভাবখানা, এই লোকটার কাছে যাওয়া ঠিক হবে কি? কলাবতী পঞ্চুকে কোলে তুলে মুরারির কাছে এসে বলল, ”এ হচ্ছে মুরারিদা, ভয় করবি না, খুব ভাল লোক।” পঞ্চুকে সে মুরারির কোলে তুলে দিল। কোলে উঠেই সে মুরারির ঝোপের মতো সাদা চুল আঙুল দিয়ে সরিয়ে সরিয়ে উকুন খুঁজতে শুরু করল। বিব্রত কলাবতী বলল, ”আরে আরে করছে কী!”
”ও কিছু না কালুদি, এটা বাঁদরের স্বভাব। তবে উকুন একটাও পাবে না।”
”না পাক, কালই তুমি চুল ছোট ছোট করে কেটে আসবে।”
তারপর মুরারির হাতে বই দেখে কলাবতী বলল, ”ওটা তো দাদুকে দেবে? আমায় দাও।”
বইটা নিয়ে সে পঞ্চুকে মুরারির কোল থেকে নামিয়ে তার হাত দিয়ে বলল, ‘যা দাদুকে দিয়ে আয়।” পঞ্চু পিটপিট করে তাকিয়ে রইল। কলাবতীর মনে হল, ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না।
”ঠিক আছে চল, দাদুকে চিনিয়ে দিচ্ছি। মুরারিদা, পঞ্চু ট্রেনিং পাওয়া বাঁদর। ওর মালিক ওকে হুকুম বলো আর নির্দেশই বলো তামিল করার শিক্ষাটা দিয়েছে, নয়তো রাস্তায় অত লোকের সামনে খেলা দেখাতে পারত না।” এক হাতের বগলে বই, অন্য হাতে কলাবতীর আঙুল ধরে পঞ্চু হাঁটছে।
মুরারি বলল, ”পঞ্চু কি তা হলে বাঁদর—খেলানোওলার কাছে ছিল? তুমি পেলে কী করে?”
”পরে সব বলব। এখন থেকে ওকে নতুন করে ট্রেনিং দোব, অন্যরকমের।”
পঞ্চুকে হাত ধরে কলাবতী দোতলায় নিয়ে এল। রাজশেখর তখন লাইব্রেরি ঘরের টেবলে একটা ম্যাপের বই খুলে চশমা চোখে ঝুঁকে দেখছিলেন।
কলাবতী দরজায় দাঁড়িয়ে পঞ্চুর কানে ফিসফিস করে বলল ”ওই হচ্ছে দাদু, বইটা দিয়ে আয়।” এই বলে সে পঞ্চুর ঘাড়ে একটা ঠেলা দিল। পঞ্চু চোখ তুলে তাকিয়ে বারকয়েক পিটপিট করে ঢুকল ঘরের মধ্যে, দুলে দুলে রাজশেখরের পাশে পৌঁছোল নিঃশব্দে, তারপর চিঁ চিঁ আওয়াজ করল মুখে। চমকে রাজশেখর তাকালেন এবং তাজ্জব বনে গেলেন।
