ঠোঙা হাতে নিয়েই কলাবতী দেখল ঝালমুড়িওয়ালার পেছনে পার্কের রেলিংয়ের ওপর বসে পঞ্চু। কোথা থেকে কখন যে এল কে জানে। ওকে দেখে মায়া হল কলাবতীর। পঞ্চুকে একজন মানুষ হিসেবে ভাবার চেষ্টা করে সে কষ্ট পেল।
একগাল মুড়ি মুখে দিয়ে ঠোঙাটা সামনে বাড়িয়ে সে বলল, ”আয় পঞ্চু।”
শোনামাত্র পঞ্চু রেলিং থেকে লাফ দিয়ে নেমে এসে ঠোঙাটা কলাবতীর হাত থেকে তুলে নিয়ে যেভাবে সে মুড়ি ঢেলেছিল, হুবহু সেইভাবে মুখে ঢেলে ঠোঙাটা শেষ করে দিল। কলাবতী বুঝল ওর ভীষণ খিদে পেয়েছে। আইসক্রীমওয়ালা চলে যাওয়ার উদ্যোগ করছিল, দাঁড়িয়ে পড়ল পঞ্চুর মুড়ি খাওয়া দেখতে। কলাবতী তার কাছ থেকে একটা কাপ কিনল। কাঠের চামচ দিয়ে খানিকটা আইসক্রিম মুখে তুলে সে—কাপটা পঞ্চুর দিকে বাড়িয়ে দিল। তার নকল করে চামচ দিয়ে তুলে তুলে কেমন করে খায় সেটা দেখবে। চামচ নয় জিভ দিয়ে তিন চারবার চেটেই সে কাপটা পরিষ্কার করে ফেলল। কলাবতী হেসে টিফিন ক্যারিয়ারটা হাতে তুলে নিয়ে এগোতেই তার জিনসের হিপ পকেটে টান পড়ল। এবার তার আরও অবাক হওয়ার পালা। তার টাকা রাখার ব্যাগটা পঞ্চুর হাতে!
বাদামওয়ালা শিবনাথকে হাসতে দেখে কলাবতী আশ্বস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ”ব্যপার কী?”
”পঞ্চু ছোলা খাওয়াতে বলছে। ও জানে ছোলা কেনার পয়সা ব্যাগে থাকে, তাই ব্যাগটা তুলে নিয়ে বলছে কিনে দাও।” শিবনাথ একটা ঠোঙায় দু’মুঠো সিদ্ধ ছোলা ভরে কলাবতীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ”পঁচিশ পয়সা।”
পঞ্চুর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে দাম চুকিয়ে দিয়ে কলাবতী বলল, ‘ছোলা বিক্রি করিয়ে দেওয়ার জন্য ওকে কমিশন দিয়ো।”
ঠোঙাটা পঞ্চুর হাতে দিয়ে টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে কলাবতী হাঁটা শুরু করল। একটু গিয়েই রাস্তা পার হওয়ার জন্য সে দুদিকে তাকাল। দেখল পঞ্চু চার হাত পায়ে ছুটে আসছে লেজটা ‘ৎ’—এর মতো বাঁকানো, তার পাশে এসে পঞ্চু মাড়ি বার করে দাঁতগুলো দেখিয়ে ‘কিচকিচ’ শব্দ করে দু—তিনবার কিছু একটা বলতে চাইল। ওর ভাষা বোঝার সাধ্য নেই কলাবতীর, তবু কিছু একটা ধরে নিয়ে বলল, ”রাস্তা পার হবি? আঙুল ধর।” সে বাঁ হাতের তর্জনীটা বাড়িয়ে ধরল, একটা বাচ্চচা ছেলের মতো পঞ্চু আঙুলটা আঁকড়ে ধরে দুলতে দুলতে হেঁটে রাস্তা পার হয়ে ফুটপাতে উঠে দু পা এগোতে না এগোতেই কিচকিচ করে ডেকে ভয়ে কলাবতীর হাঁটু জড়িয়ে ধরল। সামনে দিয়ে আসছেন এক প্রৌঢ়, তাঁর হাতে ধরা চেনে বাঁধা এক ডোবারমান।
কলাবতী এর আগে কুকুরের সঙ্গে বাঁদরের বা ছাগলের সঙ্গে বাঁদরের খেলা রাস্তায় দেখেছে। কুকুরে—বাঁদরে ভাব হয় বন্ধুত্ব হয়, কিন্তু এই ডোবারমানটার সঙ্গে পঞ্চুর যে ভাব হয়নি সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। কুকুরটা কামড়ে দিতে পারে এই আশঙ্কায় চটপট সে পঞ্চুকে বগল ধরে কোলে তুলে নিল, যেভাবে ছোট ভাইকে কাঁখে নেয় দিদিরা, সেইভাবে।
প্রৌঢ় লোকটি কৌতুকভরে কোলে ওঠা বাঁদরটির এবং কলাবতীর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হেসে ওদের পাশ দিয়ে চলে গেলেন। খুবই শিক্ষিত ডোবারমান তাই পঞ্চুর দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে একটু চাপা ‘গরররর’ ছাড়া একটা ‘ঘেউ’ পর্যন্ত করল না। পঞ্চু কলাবতীকে জড়িয়ে মুখ পেছন দিকে ফিরিয়ে যতক্ষণ দেখা যায়, সাক্ষাৎ যম দেখার মতো চোখ নিয়ে তাকিয়ে রইল।
.
পঞ্চুর নতুন আশ্রয়
পঞ্চুকে কোলে করে কলাবতী বাড়িতে ঢুকল। একতলায় কেউ নেই, দোতলায় এসে দেখল রাজশেখর টেলিফোনে কথা বলছেন। কলাবতীকে দেখে অবাক হয়ে রিসিভারে দুটো কথা বলে সেটা নামিয়ে রাখলেন।
”একে কোথায় পেলি?” রাজশেখরের এটাই প্রথম প্রতিক্রিয়া।
”বলছি।” পঞ্চুকে কোল থেকে মেঝেয় নামিয়ে দিতেই সে কলাবতীর পা আঁকড়ে ভীত চোখে এধার—ওধার তাকাতে লাগল। ওকে পাশে নিয়ে কলাবতী সোফায় বসল।
‘এর নাম পঞ্চু, পঞ্চানন। এর কেউ নেই, পার্কের কাছে একটা গাছে থাকে আর বাড়ি বাড়ি ঢুকে চুরি করে খায়। আমার টিফিন ক্যারিয়ারটা চুরি করে দৌড় লাগায়। আমি ওকে ধরার আগেই প্রথম বাটির আলু বড়ি বেগুনের ঝালটা ওর গব্বায় চলে যায়। তারপর ধুপুর কাছে শুনলুম পঞ্চু ছিল বাঁদর—খেলানো উসমান নামে একজনের কাছে। ও কিন্তু খুব ট্রেইন্ড।”
রাজশেখর বললেন, ”টেইন্ড যে, সেটা তো দেখেই বুঝতে পারছি, কীরকম চুপচাপ ভদ্দরলোকের মতো বসে রয়েছে! তা একে বাড়ি আনলি কেন?”
কলাবতী বলল, ”দ্যাখো দাদু, চুরির জন্য পঞ্চুর তো আমার হাতে মার খাওয়ার কথা। কিন্তু, যেই ওকে মুড়ি খেতে ডাকলুম অমনই কাছে চলে এল, আসলে খাবার দেখে ও ভয় ভুলে গেল। তারপর আইসক্রিম খাওয়ালুম, তারপর ছোলাও। আমি চলে আসছি, ও আমার পিছু নিল। একটা ডোবারমান দেখে পালাবার পথ না পেয়েও আমাকে আঁকড়ে ধরল, আমিও ওকে কোলে তুলে নিলুম।
”দাদু তুমিই তো বলেছিলে, একটা মানুষ ভাল না খারাপ সেটা বোঝা যায় পশুপাখিরা মানুষটাকে কীভাবে গ্রহণ করছে, তাই দেখে। পঞ্চু আমাকে নিশ্চিন্তে গ্রহণ করেছে। আমি যে সত্যি সত্যিই ভাল, এর থেকে বড় প্রমাণ আমার কাছে আর কী হতে পারে।”
রাজশেখরের চোখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, ”এখন তোর নিজেকে কেমন লাগছে?”
কলাবতী পঞ্চুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ”দারুণ লাগছে। এত ভাল আগে কখনও লাগেনি। পঞ্চু কিন্তু আমাদের বাড়িতে থাকবে।” আবদারে কলাবতীর স্বর নাকি হয়ে গেল।
