কলাবতী ফ্যালফ্যাল করে মুখ তুলে বাঁদরটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে টিফিন ক্যারিয়ারটায় ঢাকনা পরাবার আগে প্রথম বাটিতে পড়ে থাকা ঝোলটুকু ফেলে দিল। তবু ভাল, বাকি দুটি বাটি অক্ষত রয়ে গেছে। পার্কে যারা ঘটনাটা দেখেছে তাদের বেশির ভাগই হাসল, দু—তিনজন সহানুভূতি জানাল। লজ্জায় গরম হয়ে গেল কলাবতীর কান। একটা বাঁদরের কাছে এমন হেনস্থা হতে হল! মজা পেয়ে লোকেরা তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। ভাবছে, মেয়েটা কী নির্বোধ!
কলাবতী পার্ক থেকে বেরিয়ে আসতেই বাদামওলা তাকে বলল, ”বাঁদরটা আমার ছোলা, চানা চুরি করে খেত। কেন চুরি করত সেটা আমি বুঝি। মানুষের মতো জানোয়ারেরও খিদে পায়। মানুষ ভিক্ষে করেও পেট চালাতে পারে, কিন্তু জানোয়ার তো ভিক্ষে করতে পারে না, তাই চুরি করে খায়। একদিন আমি ওকে পাকড়াও করে আচ্ছাসে পিটুনি দিয়ে বললুম, চুরি করবি না, এখানে এসে দাঁড়াবি, আমি তোকে চানা দোব। ও এসে দাঁড়াত, আমি একমুঠো চানা দিতাম। কিন্তু ওইটুকু খাবারে কি পেট ভরে? তাই ও চুরি করে খায়। খুকি তুমি কিছু মনে কোরো না, ওকে মাফ করে দাও।”
.
পার্কের ধারেই চারতলা একটা বাড়ির দোতলায় ধুপুদের ফ্ল্যাট। তাকে দেখে ধুপু অবিশ্বাসভরে তাকিয়ে বলল, ”তুই! কী ব্যাপার, হাতে ওটা কী?”
”বড়ি।”
এরপর কলাবতী তার আগমনের কারণ জানিয়ে দিতে ধুপু বলল, ”মা তো বড়মাসির বাড়ি গেছে, সন্ধ্যের পর আসবে। যাই হোক, ওগুলো আমি রেখে দিচ্ছি, রাতে সবাই খাব।” ধুপু টিফিন ক্যারিয়ারের ঢাকনাটা তুলে ভ্রূ কুঁচকে বলল, ”এটা যে একদম খালি!”
কলাবতী অপ্রতিভ হেসে বলল, ”আর বলিস কেন, ওটায় ছিল বড়ির ঝাল, একটা বাঁদর খেয়ে নিল।”
তারপর সে ধুপুকে বলল ফুটপাত থেকে টিফিন ক্যারিয়ার তুলে নিয়ে বাঁদরের পালানো এবং পার্কের মধ্যে বসে তার বড়ি খাওয়ার ঘটনাটা শুনেই ধুপু হো হো করে হেসে উঠে বলল, ”পঞ্চু তোকেও তা হলে ঘোল খাইয়েছে!”
”এটা ঘোল খাওয়ানো নয়, চুরি।”
”এখানে খুব কম বাড়িই আছে যেখানে পঞ্চু রান্নাঘরে ঢোকেনি বা চুরি করে খায়নি, তবে জিনিসপত্তর ভাঙে না, কাপড়চোপড় ছেঁড়ে না, রেললাইনের ধারে থাকত উসমান বাঁদরওয়ালা, তার ছিল তিনটে বাঁদর, তাদের দিয়ে রাস্তায় খেলা দেখিয়ে সে পেট চালাত। অদ্ভুত ট্রেনিং দিয়েছিল তিনটেকে। একেবারে মানুষের মতো আচরণ করত! পঞ্চু ছিল তিনটের একটা, মানেকা গাঁধি কী যেন আইন করলেন, কেউ খাঁচায় পশুপাখি আটকে রেখে তাদের কষ্ট দিতে পারবে না, তাদের দিয়ে খেলা দেখাতে পারবে না। ব্যাস, একদিন উসমানকে বাঁদর সমেত পুলিশে থানায় ধরে নিয়ে গেল, পঞ্চুটা থানা থেকে পালাল। উসমানকে অবশ্য পুলিশ ছেড়ে দেয়। বাকি বাঁদরদুটোকে পুলিশ সল্টলেকে বন দপ্তরের হাতে তুলে দিয়েছে বলে শুনেছি। উসমান তারপর দিনমজুরের কাজ নিল। এদিকে পঞ্চু ঠিক ফিরে এসেছে। রাতে উসমানের কাছেই থাকে, খায়ও ওর সঙ্গে, দিনের বেলা থাকে পার্কের গাছে। তার মধ্যেই কখনও লোকের বাড়িতে ঢুকে রেন ওয়াটারপাইপ বেয়ে তিন কি চার তলায় উঠে সেখান থেকে লাফিয়ে বারান্দায় নেমে ভেতরে ঢুকে পড়ে। কোন বাড়িতে ঢুকেছে সেটা জানতে পারি যখন ‘ধর ধর, তাড়া ওটাকে তাড়া’ বলে একটা চেঁচামেচি শুরু হয়।” বলতে বলতে ধুপুর হাসি দেখে কলাবতী বুঝল, পঞ্চু নামক বজ্জাতটি ওর খুবই স্নেহের পাত্র।
”উসমান কি ওকে খেতে দেয় না?”
শুনেই ম্লান হয়ে গেল ধুপুর মুখ। বলল, ”উসমান মরে গেছে। ইট ভর্তি লরির ওপর বসে দমদম যাচ্ছিল, লরিটা একটা গর্তে পড়ে উলটে যায় আর উসমান ইটের নীচে চাপা পড়ে, হাসপাতালে দু’দিন বেঁচে ছিল। তারপর থেকে পঞ্চু অনাথ। আমাদের পেছনের পাড়ার এক হাউজিংয়ের দরোয়ান ওকে পোষার চেষ্টা করেছিল। গলায় বকলস পরিয়ে চেন দিয়ে বাড়ির গেটে বেঁধে রেখে দিত। কিন্তু পঞ্চু দু’ বেলা খাওয়া পাবার জন্য বাঁধা থাকতে চায়নি। পাঁচদিনের দিনই চেন খুলে পালিয়ে যায়।”
”পঞ্চু নামটা কার দেওয়া, উসমানের?”
”আরে না, না, নামটা ওই শিবনাথ বাদামওয়ালার দেওয়া। পুরো নাম পঞ্চানন। তার মানে শিব, মহাদেব।”
”মহাদেবই বটে! তোর পঞ্চুকে বাগে পেলে গুলতি মেরে ওর মাথা ফাটাব।”
”খবরদার কালু, ওই কাজটি করতে যাস না। পঞ্চু অসম্ভব ভাল নকল করতে পারে। যা একবার দেখবে, সঙ্গে সঙ্গে কপি করে নেবে, তারপর করে দেখাবে। মাথা হয়তো তুই ওর ফাটাবি কিন্তু একদিন তোরই মাথা ফাটাবে ওই গুলতি দিয়েই। মা একদিন হাতা দিয়ে রান্নাঘরে ওর মাথায় ঠকাস করে মেরেছিল, দু’দিন পর সকালে মা ওমলেট করছে তখন কে যেন মাথায় খুট করে মারল। চমকে মা ফিরে দেখে পঞ্চু রান্নাঘরের টুলের ওপর। হাতে সেই হাতাটা আর কিচকিচ, কিচকিচ করে হাসছে। এখনও আমরা ওটা নিয়ে হাসাহাসি করি। এক মিনিট বোস, টিফিন ক্যারিয়ারটা খালি করে দিচ্ছি, তোর পিসি হঠাৎ বড়ির রান্না করে পাঠালেন যে?”
”সেদিন টিফিনে তুই বড়ি খাওয়ালি, এটা তার রিটার্ন। কাল স্কুলে অবশ্যই বলবি খেয়ে কেমন লাগল।”
ধুপুর কাছ থেকে ফেরার সময় কলাবতী দেখল, ঝালমুড়িওয়ালা তখনও রয়েছে। পঞ্চুকে তাড়া করতে গিয়ে হাতের বাদাম ও ঝালমুড়ির ঠোঙা প্রথমেই বিসর্জন দিতে হয়েছিল। আবার সে দাঁড়িয়ে বিসর্জিত ঠোঙাটা উদ্ধারের চেষ্টায় রিপিট করল, ”দু’ টাকার দাও, কাঁচালঙ্কা পেঁয়াজ বেশি করে।”
