”কাক দুটোকে কী করলে?”
”পায়ে দড়ি বেঁধে তারে ঝুলিয়ে দিয়েছিলাম। অন্যেরা দেখুক বড়ি নষ্ট করলে কেমন শাস্তি পেতে হবে। ওমমা তারপরই ঝাঁকে ঝাঁকে কাক এসে পাঁচিলে বসে গেল। তবে ছাদে কেউ নামেনি, বড়ির ধারেকাছেও কেউ আসেনি, যাই শকুন্তলাকে বলি, ও দুটোকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসতে।”
”পিসি তুমি ক’বার ছুড়লে?
‘দুটো পাথর।’ অপুর মা দুটো আঙুল তুলে দেখালে।
”আর তাতেই দুটো কুপোকাত! তোমার হাতে এত টিপ! তাও কত বছর প্রাকটিস নেই।”
ভ্রূ কুঁচকে অপুর মা বলল, ”কী নেই?”
”প্র্যাকটিস, মানে অনুশীলন।”
অপুর মা কী বুঝল কে জানে, শুধু বলল, ”অ। এখন হাতমুখ ধুয়ে এসো, আজ খিদেটিদে আছে তো, নাকি কেউ টিপিনের ভাগ দিয়েছে?”
”ভীষণ খিদে পাবে পিসি যদি গুলতিটা আমাকে দিয়ে দাও।”
কলাবতীর সঙ্গে পঞ্চুর সাক্ষাৎ
সেইদিনই অপুর মা গুলতিটা তুলে দিল কলাবতীর হাতে। পরের দিন একটি কাককেও দেখা গেল না ছাদের আশেপাশে। বোধ হয় অপুর মা’র শাস্তি দেওয়ার ধরন দেখে তারা বুঝতে পেরেছে বড়ি খাওয়ার সুখ থেকে প্রাণরক্ষা করাটা বেশি জরুরি। এরপর বড়ি দেওয়া আর শুকোনোর পর প্লাস্টিকের কৌটোয় তুলে রাখার কাজ সাত দিনের মধ্যেই অপুর মা সমাপ্ত করে ফেলল। তারপর বড়ির গুণগত উৎকর্ষ পরীক্ষা করার জন্য পোস্ত বড়িভাজা, পলতার শুক্তোবড়ি, হিং দিয়ে ঝালের বড়ি এবং টকের বড়ি রান্না হল এক রবিবারের দুপুরে।
খাওয়ার পর রাজশেখরের মন্তব্য, ”শুক্তোটা আর একদিন খাইয়ো, বহু বছর পর আসল বড়ি খেলুম।”
সত্যশেখর অবশ্য খুঁত ধরল, ”কালু, পোস্তর বড়িটা তোর কেমন লাগল? একটু ঝাল ঝাল হলে মোহন্তর পকৌড়ি আর মুখে দেওয়া যাবে না।”
কলাবতী বলল, ”তেঁতুলের টকে যে বড়ি খেলুম সেটা ধুপুকে খাওয়াতেই হবে পিসি, তুমি একদিন রেঁধে দাও, আমি ওর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাইয়ে আসব।”
এইসব কথা শুনে আত্মপ্রসাদ চেপে নম্রস্বরে অপুর মা বলে, ”শুধু টকের বড়ি কেন, অন্য বড়ির রান্নাও টিপিন কেরিতে করে দোব, নিয়ে গিয়ে ধুপুর মাকে খাইয়ে আসবে আর বলে দেবে এসব আটঘরার বড়ি।”
রাজশেখর বললেন, ”শুধু ধুপুর মাকে কেন, হরির বাড়িতেও পাঠাব, খেয়ে দেখুক আটঘরার বড়ি কী জিনিস।”
তিনদিন পর স্কুল থেকে ফিরে কলাবতী শোয়ার ঘরে ঢুকেই দেখল তিন বাটির টিফিন ক্যারিয়ারটা টেবলের ওপর রাখা। দেখেই সে বুঝে গেল এটাকে নিয়ে তাকে ধুপুদের বাড়ি যেতে হবে। যাওয়ার সম্ভাবনায় সে খুশিই হল। হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির বাইরে অনেক কিছু দেখা হয়ে যায়, শোনা যায়, হঠাৎ দেখা হয়ে যায় স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে। তা ছাড়া পিসি যাকে বলে ‘অখাদ্য—কুখাদ্য’, সেইসব জিনিস কিনে খাওয়া যায়।
আধঘণ্টা পর টিফিন ক্যারিয়ার হাতে ঝুলিয়ে কলাবতী যখন বেরোচ্ছে, অপুর মা তখন হুঁশিয়ারি দিল, ”রাস্তা দিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটবে, নাচতে নাচতে যেন যেয়ো না, টিপিন কেরিটা নাড়ানাড়ি কোরো না। আর বোলো গরম করে নিয়ে যেন খায়। ফেরত দেওয়ার সময় যেন ভাল করে ধুয়ে দেয়।”
ধুপুদের ফ্ল্যাট প্রায় দশ—বারো মিনিটের পথ। বাসরাস্তা পার হয়ে কিছুটা ভেতরে একটা মাঝারি চওড়া রাস্তা ধরে বেশ খানিকটা গেলে পড়বে একটা পার্ক। সেটার তিনদিকে চার—পাঁচতলার সাত—আটটা ফ্ল্যাটবাড়ি, ফুটপাথে ও পার্কে বড় বড় গাছ। এলাকাটায় নতুন বসত হয়েছে, তাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। পার্কের যেদিকে বাড়ি নেই সেই দিকে রেললাইন এবং সার দিয়ে টালির ঘর।
কলাবতী যেতে যেতে দেখল পার্কের ছোট গেটের ধারে ডালমুট, চানাভাজা, সিদ্ধ ছোলা নিয়ে বসে একটা লোক। তার পাশে তোলা উনুনে বালিভরা কড়াইয়ে চিনেবাদাম ভাজছে এক স্ত্রীলোক। গরম বাদাম খাওয়ার লোভ সামলাতে না পেরে সে দাঁড়িয়ে পড়ল। টিফিন ক্যারিয়ারটা ফুটপাথে রেখে কিনল একশো গ্রাম সদ্য ভাজা বাদাম। ঠোঙাটাকে হাতে নিয়ে একটা বাদাম দু’ আঙুলে টিপে দানা বার করে মুখে ফেলে চিবোতে চিবোতে বলল, ”নুন দাও।”
লোকটি হোমিওপ্যাথি ওষুধের পুরিয়ার মতো কাগজের একটা পুরিয়া তাকে দিল। তখন তার চোখে পড়ল গজ খানেক দূরে আইসক্রিমওলার পাশে রয়েছে ঝালমুড়িওলা।
কলাবতী বাদামের ঠোঙা হাতে এগোল ঝালমুড়ি কিনতে। ”দু’টাকার দাও, কাঁচালঙ্কা পেঁয়াজ বেশি করে।”
বাঁ হাতে বাদামের ঠোঙা ডান হাতে ঝালমুড়ির। কলাবতী ঠিক করল, আগে ঝালমুড়িটাকে শেষ করে একটা হাত টিফিন ক্যারিয়ারের জন্য রাখবে। এর পরেই সে চমকে উঠে তাকাল, যেখানে টিফিন ক্যারিয়ার ফুটপাতে রেখে বাদাম কিনছিল সেই জায়গাটার দিকে, দেখল একটা বাঁদর টিফিন ক্যারিয়ার তুলে নিয়ে রেলিংয়ের ওপর দিয়ে উঠে পার্কের ভেতর নামল। তারপর ছুটে দূরে গিয়ে টিফিন ক্যারিয়ারের মাথার খিলটা সরিয়ে ঢাকনা তুলল। বাঁদরটা বছর দেড়েকের বাচ্চচা ছেলের মতো, ল্যাজটা হাতখানেক লম্বা, গায়ের লোমের রং পাট—এর মতো।
বাদামওয়ালা চেঁচিয়ে উঠল, ”ধরো, ধরো, খুকি দাঁড়িয়ে আছ কেন, দৌড়োও ওর পিছে।”
কলাবতী ধড়মড়িয়ে ছুটে গেল গেটের দিকে। পার্কের মধ্যে ঢুকে ”হেই হেই” বলে চিৎকার করতে করতে ছুটল বাঁদরটার দিকে। ওপরের বাটিতে রাখা ছিল আলু ও বেগুন দিয়ে বড়ির ঝাল। বাঁদরটা কপকপ করে সেগুলো তুলে মুখে পুরছে। কলাবতীকে ছুটে আসতে দেখে বাঁদরটা টিফিন ক্যারিয়ার ফেলে পাশেই রাধাচূড়া গাছটায় উঠে মুহূর্তে মগডালে পৌঁছে গেল।
