গুলতিতে রবারের ছিলে বাঁধার জন্য দরকার শক্ত টোন সুতো, সেটিও বেরোল পিসির আজব বাক্স থেকে। কবে যেন সুতোয় বাঁধা বই দিল্লি থেকে ডাকে এসেছিল সত্যশেখরের জন্য। অপূর মা তখনই সুতোটা তুলে রেখেছিল। তবে পাওয়া গেল না নরম চামড়ার টুকরো।
”দরকার নেই কালুদিদি চামড়ার, গ্রামে আমরা শাড়ির মোটা পাড় দিয়েই চালিয়ে দিয়েছি।”
সুতরাং সমস্যা মিটে গেল।
রাত্রে অপুর মা শোয় কলাবতীর খাটের পাশে মেঝেয় বিছানা পেতে। এই শোয়ার স্থানটি সে নিজেই নির্বাচন করেছে, কারণ ‘অতটুকু মেয়ে রাতে একা একা ঘুমোলে খারাপ স্বপন দেখে ভয় পেতে পারে।’ স্বপন দেখে ভয় পেয়ে কিনা কে জানে, তবে প্রায়ই ভোরবেলা দেখা যায় কলাবতী মেঝেয় পিসিকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোচ্ছে।
কলাবতী ঘুমিয়ে পড়ার পর অপুর মা তার বিছানায় ছুঁচ সুতো কাঁচি নিয়ে বসে গুলতি তৈরি শেষ করল যখন, বসার ঘরে প্রায় একমানুষ উঁচু গ্র্যান্ড ফাদার ক্লকে তখন রাত বারোটা বাজল। ঘড়িটি রাজশেখর কেনেন চৌরঙ্গি এক্সচেঞ্জ নামে তাঁর চেনা এক নিলাম ঘর থেকে। ফ্রান্সে তৈরি দেড়শো বছরের পুরনো ঘড়িটা তাঁর কথায় ‘জলের দামে মাত্র তিরিশ হাজার টাকায় পেয়েছে।’
সকালে ঘুম থেকে উঠে কলাবতী দেখল তার বালিশের পাশে লোহার গুলতিটা, তাতে রবারের ছিলে বাঁধা। সেটা হাতে নিয়ে দুই ছিলের মাঝে জোড় দেওয়া কাপড়ের পাড়টা টিপে ধরে রবারটা ধরে ছেড়ে দিল, শব্দ হল ‘ছপাং’। দু—তিনবার ছপাং শব্দটা শুনে খাট থেকে লাফ দিয়ে নেমে বারান্দায় এসে ”পিসি, পিসি” বলে চেঁচাতে শুরু করে দিল। অপুর মা তখন একতলার ঘর মোছামুছির ঠিকে ঝি কান্তির মা’র দালান মোছার দিকে নজর রাখতে রাখতে তার রান্নাঘরের সহকারী শকুন্তলাকে নির্দেশ দিচ্ছিল, ”ফিজ থেকে ডালবাটাগুলো বার করে ভাল করে ফ্যাটা, আজ আবার বড়ি দোব। দেখব আজ কাকের একদিন কি আমার একদিন।”
কলাবতী একতলায় নেমে এসে বলল, ”পিসি কখন বানালে গুলতিটা, রাতে? এটা নিয়ে আমি কিন্তু আজ স্কুলে সবাইকে দেখাব।”
”একদম নয়।” অপুর মা কড়া গলায় কলাবতীতে দমিয়ে দিয়ে বলল, ”আজ বড়ি দোব, ওটা আমার দরকার।”
”কাক শালিক মারবে? কিন্তু কি দিয়ে ছুড়বে গুলতি, সেজন্য তো সুপুরির মতো ইট কি পাথর চাই।”
”তুমি কি ভেবেছ, সে ব্যবস্থা আমি করিনি? কাল রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসার সময় দেখলুম একটা বাড়ির জন্য ভিত খোঁড়া হয়েছে, আর ইট, বালি, পাথরকুচি গাদা করে রাখা ফুটপাতের ধারে। মাটি তো নয় যেন নলেন পাটালি। ওই মাটি পুড়িয়ে খুব শক্ত গুলি হবে। তাই আজ ভোরবেলায় যখন রাস্তার লোকজন প্রায় নেই তখন বালতি নিয়ে আর মোটা পেলাসটিকের একটা বড় থলি নিয়ে বেরিয়ে পড়লুম।”
”বাড়ির জন্য ভিত খোঁড়া হচ্ছে তো অনেক দূরে, প্রায় পাঁচশো গজ এখান থেকে! তুমি এত দূর থেকে বয়ে আনতে পারলে?”
”কেন পারব না!” অপুর মা অবাক হয়ে বলল, ”ভত্তি এক বালতি মাটির ওজন কত? পনেরো—কুড়ি কেজি, আর পেলাসটিকে পাথরকুচির ওজন বড়জোর পাঁচ—সাত কেজি। দু’হাতে এ দুটো বইতে পারব না!” অপুর মা যেভাবে তাকিয়ে রইল তাতে কলাবতীর নিজেকে মনে হল সে গোপাল ভাঁড়ের মতো হাসির কথা বলছে।
কলাবতী কথা বাড়াবার সাহস আজ পেল না। দোতলা থেকে নেমে এল সত্যশেখর, সেরেস্তায় মক্কেল আসার সময় হয়ে গেছে। কলাবতীর হাতে গুলতিটা দেখে ভ্রূ কুঁচকে বলল, ”কালু, তোর হাতে ওটা কী?”
”গুলতি।”
”একটা যাচ্ছেতাই বাজে জিনিস, পেলি কোথা থেকে? জানিস কী বিপজ্জনক ওটা? তোর বড়দি তখন তোর বয়সি, খেলাচ্ছলে ধাঁ করে গুলতিতে ইট লাগিয়ে মেরে আমার কপাল ফাটিয়ে দিয়েছিল। ভেরি ভেরি ডেঞ্জারাস ওয়েপন। মলয়াকে আমি একমাস ক্ষমা করিনি। আসলে বকদিঘির মেয়ে তো, ওর বাপের মতোই আটঘরাকে সহ্য করতে পারে না।”
”বড়দিকে তা হলে তো জিজ্ঞেস করতে হয় কেন তোমার কপাল ফাটিয়েছিলেন।”
”খবরদার। বড়দির কাছ থেকে আমার সম্পর্কে কোনও ইনফর্মেশন নেওয়ার চেষ্টা করবি না, টপ টু বটম বাজে খবর দেবে।” বলেই সত্যশেখর লম্বা পায়ে সেরেস্তার দিকে হাঁটা দিল।
স্কুলে যাওয়ার সময় কলাবতী দেখল শকুন্তলা পাটি, কাপড় আর ডালবাটা ভর্তি গামলা আর অপুর মা হাতে গুলতি আর পলিথিনের একটা থলি নিয়ে তিনতলায় উঠছে। বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার সময় ফটক দিয়ে ঢুকেই তার চোখ গেল ছাদের পাঁচিলে। অন্তত পঞ্চাশটা কাক সার দিয়ে বসে চিৎকার করে চলেছে। এমন দৃশ্য তাদের বাড়িতে সে আগে কখনও দেখেনি।
সদর দরজা পেরিয়ে ঢুকতেই দেখা হল মুরারির সঙ্গে। অবাক কলাবতী বলল, ”মুরারিদা, ছাদে কী হয়েছে, কত কাক বসে চেঁচাচ্ছে?”
”কাকেরা হরিসংকীর্তন করছে। অপুর মা ওদের দু’জনকে স্বগ্গে পাঠিয়েছে কিনা।”
”গুলতি দিয়ে?”
‘তবে না তো কী!”
শুনেই উত্তেজিত কলাবতী ছুটল দোতলায়। অপুর মা তখন রাজশেখরকে চা দিয়ে বসার ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে। ”পিসি, তুমি দু—দুটো কাক মেরেছ গুলতি দিয়ে!”
”হাঁ।” গম্ভীর মুখে কলাবতীর পাশ কাটিয়ে অপুর মা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
”আমি কাক মারা দেখব পিসি, চলো, ছাদে, গন্ডা গন্ডা কাক বসে আছে। গুলতিটা কোথায়?”
অপুর মা সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে বলল, ”কলকাতার কাক যে এমন বিটকেল হয় তা যদি আগে জানতুম তা হলে কি মারতুম, বাড়ি যেন মাথায় তুলেছে। কত্তাবাবু পর্যন্ত বকলেন আমায়। এখন উনি বন্ধুর বাড়িতে যাচ্ছেন, সন্ধ্যের আগে ফিরবেন না। আর বাবা আমি ওই গুলতি ধরছি না!”
