কিছুক্ষণ কলাবতীর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে অপুর মা’র ঠোঁট পাতলা হাসিতে মুচড়ে গেল, বলল, ”আচ্ছা, বলব না। তবে তোমাকেও কথা দিতে হবে এমন কাজের মেয়ের মতো সাজে কখনও বাড়ির বাইরে যাবে না।”
”তুমি কথা রাখলে আমিও রাখব।” কলাবতী পালটা শর্ত রাখল।
অপুর মা তাড়া দিয়ে বলল, ”হয়েছে হয়েছে, পা চালিয়ে বাড়ি চলো। কতক্ষণ বেরিয়েছি বলো তো! তবে কি জান কালুদি, এই গলার ওপর আমার তো কোনও হাত নেই, জম্মো থেকেই পেয়েছি। শুনেছি আমার ঠাকুদ্দার নাকি এমন গলা ছিল।”
হাঁটতে হাঁটতে অপুর মা বলে চলল, ”ঠাকুদ্দা একটা হাঁক দিলে নাকি ছেলের কান্না বন্ধ হয়ে হেঁচকি উঠত, মাঠের গোরু ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট লাগাত, ডাব পাড়তে ওঠা মানুষ গাছ থেকে পড়ে যেত।”
”আচ্ছা পিসি, তুমি কখনও ঠাকুরদার মতো হাঁক দিয়েছে?” কৌতূহলে কলাবতী জিজ্ঞেস করল।
”ঠাকুদ্দার মতো কি না জানি না। তবে অপুর বাবা তো পাঠশালের মাস্টার ছিল। আমাদের বাড়ির পাশে মস্ত ধানখেত, তা লাগোয়া বিরাট একটা বিল, তারপর একটা গ্রাম, নাম বায়সা, পাঠশালাটা ছিল ওই বায়সায়, তা প্রায় আধ মাইল তো হবেই, তার বেশিও হতে পারে। অপুর বাবা তো ভাত না খেয়েই পড়াতে চলে যেত। দুপুরে উনুন থেকে ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে আমি ধানখেতের ধারে গিয়ে বায়সার দিকে মুখ করে গলাটা একটু উঁচুতে তুলে তখন বলতুম…” অপুর মা এবার মুখের দু’পাশে দু’হাতের চেটো চোঙার মতো করে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘ভাআত বেএড়েছিই’ আর তখনই পাঠশালে টিপিন হয়ে যেত। গ্রামের পাঠশালে তো আর ঘড়ি থাকে না।”
কলাবতী মজা করে বলল ”পিসি, এখন তুমি অমন গলায় ‘ভাত বেড়েছি’ বলতে পারবে?
”পাগল হয়েছে!” সিংহিবাড়ির লোহার ফটকের আগল খুলে অপুর মা ভেতরে পা দিয়ে বলল,”এটা কলকাতা শহর, এখানে কি গলা ছাড়া যায়! তখন বয়স কম ছিল, জোর ছিল কলজেতে, আর সেটা ছিল গ্রাম। তবু মাঝেমধ্যে রেগে গিয়ে গলাটা তখন আর বশে থাকে না, তুলে ফেলি। শুনলে না কামারটার কাছে, মুরারিদা গাঁজায় দুটো টান দিয়েই কী বলেছে।” অপুর মা’র স্বরে অভিমান আর ক্ষোভ ঝরে পড়ল।
.
গুলতি তৈরি হয়ে গেল
বাড়িতে পা দিয়েই কলাবতী দোতলায় ছুটে গেল লোহার ‘ওয়াই’টা দাদুকে দেখাবার জন্য। রাজশেখর তখন বসার ঘরে ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে টিভিতে রোমা আর এভার্টনের মধ্যে দু’দিন আগে খেলা ফুটবল ম্যাচটা ই এস পি এন চ্যানেলে দেখছিলেন। পাশেই মেঝেয় বসে মুরারিও দেখছিল খেলা। কলাবতী তার হাতের জিনিসটা তুলে ধরে বলল, ”বলো তো দাদু এটা কী?”
রাজশেখর ভ্রূ কুঁচকে দেখে বললেন, ”তক্তা রাখার ব্র্যাকেট।”
”মোটেই না, এটা দিয়ে তৈরি হবে গুলতি।” কলাবতী ওয়াইটা বাঁ হাতের মুঠোয় আঁকড়ে ডান হাতে কাল্পনিক তির ছোড়ার মতো ভঙ্গিতে ছিলে টেনে ধরল। ”মালোপাড়ার বস্তির মধ্যে শ্যামা কামারের কামারশাল থেকে তৈরি করালুম। পিসি এবার কাক, চিল, বেড়াল, কুকুর দেখলেই শিক্ষা দিয়ে দেবে। উফফ অমন সাধের বড়ির কী দশাটা করল।”
রাজশেখর হাসি চেপে বললেন, ”দিদি, এবার যে দুটো এক বিঘত লম্বা রবার লাগবে আর রবারদুটোর মাঝে একটুকরো চামড়া লাগবে, তা না হলে তো গুলতি হবে না।”
”রবার!” কলাবতী চিন্তায় পড়ে গেল, ”পিসি অবশ্য রবাটের কথা বলেছিল। কোথায় পাই বলো তো দাদু?”
দাদু—নাতনি খুবই সমস্যায় পড়ে গেল। রাজশেখর বললেন, ”আমরা ছেলেবেলায় যেসব গুলতি বিক্রি হতে দেখেছি তার ছিলেগুলো মোটরের চাকার টিউব কেটে বানাত।”
”টিউব পাব কোথায়! যেসব দোকান টায়ার সারায় সেখানে খোঁজ করব। স্কুল যাওয়ার পথে অমন একটা দোকান পড়ে, কাল তা হলে খোঁজ নোব।”
এতক্ষণে মুরারি কথা বলল, ”মোটরের টায়ারের মধ্যে গোলাপানা যে রবারটা থাকে, যার মধ্যে হাওয়া ভরে, সেটার কথা কি বলছেন কত্তাবাবু?”
”হ্যাঁ হ্যাঁ, ওকে টিউব বলে।” রাজশেখর উৎসুক চোখে তাকালেন।
”ছোটবাবু তো এমন একটা গোল রবারের টিউব নিয়ে সাঁতার কাটতে যেত কেলাবে, আপনার মনে আছে কত্তাবাবু?”
”খুব মনে আছে। সাঁতার শেখার জন্য ক্লাবে ভর্তি হয়ে টিউবে চড়ে সারাক্ষণ জলে ভেসে বেড়াত। সাঁতারটা আর শেখা হল না।” রাজশেখর হতাশ এবং বিরক্ত স্বরে বললেন।
”সেই টিউবটা তো একতলায় বাতিল জিনিসের ঘরে এখনও পড়ে রয়েছে, ওটা থেকেই তো গুলতির ছিলে তৈরি করা যায়।”
.
তিন মিনিটের মধ্যেই মুরারি চুপসে থাকা বড় একটা লাল রঙের টিউব কলাবতীর হাতে তুলে দিয়ে বলল, ”এটা অপুর মাকে দাও, ও কাঁচি দিয়ে কেটে ছিলে বানিয়ে নেবে।” তারপর নিচু গলায় বলল, ”কালুদিদি, শ্যামা আমার সম্পর্কে কি কিছু বলল?”
কলাবতী আকাশ থেকে পড়ার মতো চোখ এবং গলার স্বর নিয়ে বলল, ”সে কী মুরারিদা, লোকটা তোমায় চেনে নাকি? কই, কিছু তো বলল না!”
আশ্বস্ত হয়ে মুরারি বলল, ”শ্যামা আমার পাশের গ্রামের ছেলে, মানুষটা খুব ভাল।”
সেই সন্ধ্যাতেই রান্নাঘরে ঢোকার আগে অপুর মা তার তিনটে কাঁচির মধ্যে যেটা বড়, সেটা দিয়ে টিউবটা কেটে দুটো রবারের ছিলে বার করল। ওয়াইয়ের দুটো ঊর্ধ্ববাহুর সঙ্গে বাঁধার জন্য শক্ত টোন সুতো চাই। কলাবতীর ঘরের লাগোয়া একটা ছোট্ট ঘর অপুর মা’র। সেখানে আছে পুরনো একটা কাঠের দেরাজ আর আলনা। আর আছে একটা স্টিলের তোরঙ্গ, কলাবতী তার নাম দিয়েছে ‘আজব বাক্স’। সেই বাক্সে আছে বাতিল চিরুনি, টুথব্রাশ, ভাঙা ছিটকিনি, নানান মাপের স্ক্রু ড্রাইভার, ঘুড়ির সুতো, উড পেনসিলের টুকরো, ইরেজার, শাড়ির পাড়, কলাবতীর হোমটাস্কের খাতা যার অর্ধেক পাতা সাদা রয়ে গেছে, নাইনলের দড়ি, বোরিক তুলো, অর্ধেক খাওয়া ওষুধের শিশি, নানান মাপের ও রঙের বোতাম, ব্লেড, হাতলভাঙা হাতুড়ি, ফলকাটা ভোঁতা ছুরি এবং আরও বহুবিধ দ্রব্য। মজার কথা, এইসবের কোনও না কোনওটা কখনও—না—কখনও ঠিক দরকার পড়ে যায়, আর তখন বাক্স থেকে অপুর মা সেটি বার করে দেয়।
