শ্যামাচরণ ভ্রূকুটি করল। অবিশ্বাসভরে তাকিয়ে বলল, ”কোথাকার জমিদার?”
”আটঘরার জমিদার, এই বস্তির পেছনেই ওদের বিরাট বাড়ি।” অপুর মা’র গলা গর্ব মিশিয়ে একটু চড়ল।
”সিংহিবাড়ি?”
”হ্যাঁ। জানেন দেখছি।”
”জানব না কেন, ও বাড়ির মুরারি তো দুখ্যু পেলে, মনখারাপ হলে মাঝে মধ্যে আমার এখানে এসে দু—চারটে টান দিয়ে যায়। লোকটা খুব সরল, দুটো টান দিয়েই বলে চাকরি ছেড়ে দোব, আর সহ্য করতে পারি না।”
কলাবতী অবাক হয়ে বলল, ”মুরারিদা এখানে মাঝেমধ্যে আসে গাঁজায় টান দিতে, পিসি এটা তো জানতুম না।”
”আমিও তো এই প্রথম শুনছি, তা চাকরি ছাড়বে কেন?”
শ্যামাচরণ টুলে বসে হাপরের হাতলটা ধরল। দু’বার ওঠানামা করিয়ে আঁচ উসকে দিয়ে বলল, ”মুরারি খুব ভয়ে ভয়ে থাকে, জমিদারবাবু দেশ থেকে একজন মেয়েছেলেকে এনেছে, তার গলার আওয়াজ মিটিংয়ে বক্তিতার সময় মাইকের তিনটে চোঙা দিয়ে যে শব্দ বেরোয় তা এক করলে যা দাঁড়াবে ততটা আওয়াজ একসঙ্গে তার গলা দিয়ে বেরোয়। মুরারির হার্ট ভাল নয়, ও বলে, শ্যামা, শুনলে বুক ধড়ফড় করে, মাথা ঘোরে, মনে হয় এবার মরে যাব। একবার যদি দেখা হয় তা হলে দেখতুম তার গলার জোর কতটা, ঠান্ডা করে দিতুম, আপনি কি জানেন সে মেয়েছেলেটাকে?”
শ্যামা তাকাল অপুর মা’র দিকে। মুখ থমথমে হয়ে গেছে রাগ চাপতে চাপতে। ”হ্যাঁ জানি সেই মেয়েছেলেটাকে।” শান্তভাবে নিচু গলায় অপুর মা বলল, ”কিন্তু কথাগুলো বেটপকা বলে ফেলে মুরারিদার যে কী সব্বোনাশ আপনি করলেন তা হয়তো জানেন না।”
শ্যামা অবাক হয়ে বলল, ”কী সব্বোনাশ করলুম মুরারির?”
”মুরারিদা যে মেয়েছেলের কথা বলেছে, আমিই সেই। এবার আমায় কী ঠান্ডা করবি কর।” অপুর মা লোহাদুটো মুঠোয় ধরে এক পা এগিয়ে যেতেই শ্যামা টুল থেকে লাফিয়ে উঠল।
অপুর মা এবার ছাড়ল তার ডাকাতে গলাটাকে, ”মেরে মাথা ফাটিয়ে দোব হতচ্ছাড়া। এক্ষুনি আমায় এ দুটো দিয়ে গুলতিটা তৈরি করে দে বলছি, নয়তো তোরই একদিন কি আমারই একদিন। সিংহিবাড়ির মেয়েকে তুই—তোকারি করা?”
কামারশালের দরজায় তিন—চারজন লোক হাজির হয়ে গেছে। তারা ভেতরে ঢুকবে কি ঢুকবে না, এ ভেবে ইতস্তত করছে। একজন বলল, ”শ্যামাদা হয়েছে কী? আবার খদ্দেরের সঙ্গে ঝামেলা পাকিয়েছ।”
শ্যামা জবাব দেওয়ার আগেই অপুর মা বলল, ”হবে আবার কী, ছোটমুখে বড় কথা! কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় জানে না, গাঁজা খেয়ে খেয়ে বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেয়েছে। করে দাও বলছি।”
দরজা থেকে একজন বলল, ”ও শ্যামাদা, ঝামেলা বাড়াচ্ছ কেন, করে দাও না, মাসিমা যা চাইছে।”
আর একজন বলল, ”কী না কী হল রে বাবা, ভাবলুম ডাকাত পড়ল বুঝি, আজকাল তো মেয়ে—ডাকাতও হয়।”
আর একজন বলল, ”দম মারাটা এবার একটু কমাও শ্যামাদা।”
গজগজ করে শ্যামা বলল, ”সারাদিনে একটা টানও দিইনি আর বলছিস কিনা দমমারা কমাতে? ভাগ, ভাগ এখান থেকে।”
দরজা থেকে লোকগুলো সরে যেতেই শ্যামা বলল অপুর মাকে, ”মুরারি ঠিকই বলেছে। তিনটে চোঙার আওয়াজ আপনার গলায়। দেখি ও দুটো।” হাত বাড়িয়ে লোহাদুটো নিয়ে চুল্লিতে ঢোকাল। জোরে জোরে হাপর টেনে গনগনে করে তুলল চুল্লিটা। যখন তেতে লোহাদুটোয় কমলা রং ধরেছে তখন একটা একটা করে তুলে নেহাইয়ের ওপর রেখে সরু মুখ ছেনি দিয়ে লোহার ঠিক মাঝখানে দুটো করে গর্ত করল দুই ইঞ্চির ব্যবধানে। এরপর জলভরা একটা লোহার বালতির মধ্যে গরম লোহাদুটো ফেলে দিতেই ছ্যাঁ করে উঠে সাদা ধোঁয়া উড়ল।
”এ কী, জোড়া হল কই?” কলাবতী উৎকণ্ঠিত স্বরে বলল।
”আমার এখানে লোহা জোড়া লাগাবার জিনিস থাকে না, ওসব থাকে মোটর সারাইয়ের গ্যারেজে, যাকে বলে ওয়েল্ডিং।” এই যে গত্তো করে দিলুম এবার লোহা দুটোকে একসঙ্গে ধরে ওর মধ্যে দিয়ে বল্টু আর নাট ঢুকিয়ে টাইট করে দিলেই জোড়ার কাজ হয়ে যাবে। এখান থেকে বেরিয়ে বাঁ দিকে দশ পা গেলেই হাডওয়ারের দোকান, দুটো বল্টু আর দুটো নাট কিনে লাগিয়ে নেবেন।”
আঁচলের গিঁট খুলে অপুর মা দোমড়ানো একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বার করে বলল, ”এতে হবে?”
জবাব না দিয়ে শ্যামাচরণ নোটটা টুক করে টেনে নিয়ে বলল, ”পাঁচটা টাকা আর দিতে হবে না। যা ক্ষতি হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।”
কলাবতী বলল, ”কী ক্ষতি হল আপনার?”
”মুরারির সব্বোনাশ করে ফেললুম। বেচারা হার্টের রুগি, এখন তো উঠতে বসতে ওর কানের কাছে যে চোঙগলার বক্তিতা বাজবে, বেচারা এবার মরেই যাবে।” শ্যামাচরণ টপ করে টুলে বসে হাপরের হাতল ধরল।
ওরা হার্ডওয়্যারের দোকান থেকে নাট—বল্টু কিনল, দোকানদারই সেগুলো টাইট করে লাগিয়ে দিতেই ‘ওয়াই’ হয়ে গেল লোহাজোড়া। কলাবতী বাঁ হাতে ওয়াইয়ের গোড়াটা মুঠোয় ধরে মুখের সামনে তুলে এক চোখ বন্ধ করে টিপ করল। তারপর ডান হাত কাল্পনিক রাবারের ছিলে দু’আঙুলে চেপে ধরে টান দিয়ে ছেড়েই নিজের মনে বলে, ”ঠকাস…ডাকাতটার কপালে…পড়ে গেল।” বলেই সে হেসে উঠল।
অপুর মা বলল, ”একেই বলে গাছে কাঁটাল গোঁপে তেল, কলকাতা কি আটঘরা যে, এখানে বাড়িতে ডাকাত পড়বে? তাড়াতাড়ি বাড়ি চলো, মুরারিদার সঙ্গে কথা বলতে হবে।”
কলাবতী চলা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, ”না পিসি না, মুরারিদাকে তুমি কিছু বলতে পারবে না। দাদুর কাছে শুনেছি সত্যি সত্যিই ওর হার্টের অসুখ আছে, মানুষটা খুব ভাল, সবাইকে ভালবাসে, তোমাকেও মেয়ের মতো ভালবাসে, ওকে তুমি কিছু বোলো না, প্লিজ পিসি।” অপুর মা’র হাত চেপে ধরল কলাবতী।
