অপুর মা কামারশালের ভেতরে উঁকি দিল। ময়লা একটা ধুতি মালকোঁচা পরা, সেটায় জড়ানো কালিমাখা গামছা। ঊর্ধ্বাঙ্গে বগলকাটা কালো গেঞ্জি। গালে এক সপ্তাহের কাঁচাপাকা দাড়ি। মুখ শরীরের মতোই শীর্ণ এবং লম্বাটে। চুলে কখনও চিরুনি পড়েছে বলে মনে হয় না। চোখ দুটি ঘন ভুরুর নীচে ড্যাবড্যাবে এবং ঈষৎ লাল। শ্যামা উবু হয়ে বসে ছিল, অপুর মাকে ভেতরে ঢুকতে দেখে উঠে দাঁড়াল।
”কী চাই আপনার?”
”লোহার একটা গুলতি করে দিতে হবে।”
শ্যামার চোখ আরও গোলাকার হয়ে স্থির হয়ে রইল পাঁচ সেকেন্ড। অবশেষে বলল, ”গুলতি! কার জন্য?”
”আমার জন্য।”
অপুর মা’র গম্ভীর মুখ ও কণ্ঠস্বর শ্যামাকে বুঝিয়ে দিল, ব্যাপারটা হালকা করে দেখা ঠিক হবে না।
”আমি তো জীবনে গুলতি তৈরি করিনি, ওসব আমার দ্বারা করা সম্ভব নয়।”
”কেন সম্ভব নয়? গুলতি আপনি কি কখনও চোখে দেখেননি?”
”দেখেছি, ছেলেবেলায় আমার নিজেরই একটা ছিল, কাঠের। চড়কের মেলায় কিনেছিলুম। গুলতি দিয়ে পাথর ছুড়ে রাস্তার একটা কুকুরকে মারতেই সে আমাকে কামড়ে দেয়। ভাগ্যিস কুকুরটা পাগলা ছিল না। পরদিনই মা গুলতিটা দিয়ে উনুন ধরায়।”
অপুর মা বুঝে গেল শ্যামাচরণ কামার কথা বলতে ভালবাসে। কিন্তু এখন আজেবাজে কথা বলার সময় নয়। সে কাজের কথা পাড়ল। ”আপনার কাজের এত নাম কত লোকের কাছে শুনেছি বলেই তো খুঁজতে খুঁজতে আপনার কারখানায় এলুম।”
কথাগুলো শুনে শ্যামার চোখ ভাললাগার আমেজে ছোট হয়ে কোটরে প্রায় ঢুকে গেল। কলাবতী এতক্ষণ ঘরটার চারধারে চোখ বোলাচ্ছিল। ছোট ছোট নানান আকারের লোহার টুকরো কোনওটা গোল কোনওটা চ্যাপটা, কোনওটা ‘দ’ বা ইংরিজি ‘জেড’—এর মতো, লোহার সরু ও মোটা পাত এক কোনায়, আর এক কোনায় কয়লা। মাটির মেঝেয় গর্ত করে কয়লার চুল্লি, চামড়ায় তৈরি হাপর থেকে একটা নল মাটির তলা দিয়ে গেছে চুল্লিটার নীচে। হাপরটাকে হাতল ধরে ওঠানামা করালে বাতাস যায় নল দিয়ে চুল্লিটার তলায়, গনগন করে ওঠে কয়লার আগুনের আঁচ।
শ্যামাচরণ ছোট্ট একটা নিচু টুলে বসে হাপরের হাতল ধরে ওঠানামা করাতে শুরু করল। ঝিমিয়ে থাকা চুল্লি থেকে দু’চারটে ফুলকি ছিটকে উঠল।
”লোহা দিয়ে গুলতি বানানো সোজা কাজ নয়। আপনি কাঠ দিয়ে করে নিন, ছুতোর মিস্তিরির কাছে যান। আমার দুটো ঘর পরেই অনিল মিস্তিরির কারখানা, ওকে গিয়ে বলুন।” শ্যামাচরণ সহজ স্বরে পরামর্শ দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল।
”অ। তা হলে আপনি পারবেন না। তা হলে আপনার সম্পর্কে যা শুনেছিলুম তা সবই ভুল।” অপুর মা চিবিয়ে চিবিয়ে এমনভাবে কথাগুলো বলল যা শোনামাত্র শ্যামার মাথা চিড়বিড়িয়ে উঠল।
”কী শুনেছেন আমার সম্পর্কে?” চড়া গলায় বলল শ্যামা।
অপর মা তার গলা এক ডেসিবেল নামিয়ে বলল, ”আপনি যে কাজ করেন তা খুব নিঁখুত আর টেকসই হয়, অবশ্য গাঁজার জন্য যদি আপনাকে আলাদা পয়সা দেওয়া হয়।”
শ্যামাচরণ প্রায় লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ভীষণ চটে গেছে সে অপুর মা’র কথায়। বলল, ”গাঁজা খাই তো বেশ করি। এইরকম আগুনের পাশে বসে দশ ঘণ্টা লোহা পিটোতে হলে আপনিও খেতেন।”
শুনে অপ্রতিভ হয়ে গেল অপুর মা। কিছুক্ষণ রান্নাঘরে থাকলেই তার মাথা ধরে আসে, তখন ইচ্ছে করে বাইরে বেরিয়ে আসতে, ঠান্ডা হাওয়া লাগাতে, আর এ তো গনগনে আঁচের ধারে এমন বদ্ধ ঘরে দশ ঘণ্টা কাটানো। অপুর মা’র মন ভরে উঠল সহানুভূতিতে। সে বলল, ”আমি আপনাকে দু’টাকা দোব গাঁজার জন্য, বলুন আমার কাজটা করে দেবেন কিনা।”
ইতিমধ্যে কলাবতী ঘরের কোণে পড়ে থাকা নানা আকারের চল্লিশ—পঞ্চাশটা লোহার টুকরো ঝুঁকে দেখছিল। টুকরোগুলো বাঁকানো, তার কোনওটা ৪৫ ডিগ্রিতে, কোনওটা একেবারেই গোল, কোনওটা সমকোণের। দেখেই বোঝা যায় এ—সবই শ্যামার হাতের কাজ। তৈরি করেছে কারও অর্ডার পেয়ে। কলাবতীর মনে পড়ল এই ধরনের লোহা সে দেখেছে পাড়ার হার্ডওয়্যারের দোকানে, কাকার সঙ্গে ছোট একটা হাতুড়ি কিনতে গিয়ে।
হঠাৎ সে দুটো এক ফুট লম্বা লোহা তুলে নিল, দুটোই ৪৫ ডিগ্রিতে বাঁকানো। সে দুটোকে একসঙ্গে জোড়া দিয়ে মুঠোয় ধরতেই আকার নিল ইংরেজি ‘ওয়াই’ অক্ষরের মতো। দু’হাত তুলে কলাবতী চেঁচিয়ে উঠল, ”পেয়ে গেছি, গুলতি পেয়ে গেছি।”
শ্যামাচরণ আর অপুর মা অবাক হয়ে কলাবতীর দিকে তাকাল।
”অ্যাই, অ্যাই মেয়েটা, রেখে দে, রেখে দে”—ধমকে উঠল শ্যামা, ”একদম ওতে হাত দিবি না, দু’ডজন কালকের মধ্যে পৌঁছে না দিলে আমার পিণ্ডি চটকে দেবে ননীবাবু।”
শ্যামাচরণের ধমকানি কলাবতীর কানে ঢুকল না। সে উত্তেজিত হয়ে অপুর মা’র কাছে এসে জোড়া দেওয়া লোহা চোখের সামনে ধরল।
”ওম্মা তাই তো? এ তো ঠিক গুলতির মতোই!” কলাবতীর হাত থেকে লোহাদুটো প্রায় কেড়ে নিয়ে অপুর মা ছেলেমানুষের মতো গলায় শ্যামাকে বলল, ”এ দুটো আপনি জুড়ে দিন, আপনি বরং পরে আর দুটো তৈরি করে দেবেন।”
শ্যামার চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আবার ড্যাবড্যাবে হয়ে উঠল। খিঁচিয়ে উঠে বলল, ”তার মানে? জুড়ে দিন, তৈরি করে নেবেন, এ কি বেগুনভাজা না চাটনি করা? অ্যাই মেয়েটা, ও দুটো যেখানে ছিল সেখানে রেখে আয়। ওসব পরের জিনিস, আমার নয়।”
অপুর মা প্রমাদ গুনল, হাতের মুঠোয় এসে পাখি উড়ে পালাবে? মরিয়া হয়ে সে বলল, ”কত টাকা নেবেন ও দুটোর জন্য? এ তো এক মিনিটের কাজ। গাঁজার জন্য পাঁচটাকা দোব আর কালুদিদিকে তুই—তোকারি করবেন না, ও জমিদারবাড়ির মেয়ে।”
