ঘুরে দেখি, সেই লোকটার মতোই কালো কুচকুচে লম্বানেকো একদল লোক এসে হাজির। তারা মাছ-মাছ-বলে চাঁচেমেচি করছে এবং আগের লোকটা তাদের থামাবার চেষ্টা করছে। রাগে মহাখাপ্পা হয়ে উঠে দাঁড়ালুম। তারপর প্রচণ্ড ধমক দিয়ে বললুম,–চুপ সব। চুপ! পেয়েছ কী তোমরা? এখানে হইচই করছ কেন অত?
লোকগুলো একগলায় বলল, মাছ, মাছ।
তেড়ে গিয়ে বললুম,–মাছ ধরতে না ধরতেই মাছ চাইতে এসেছ। ধরলে তবে তো।
আগের লোকটা বলল,-বাবুমশাই বড় ভালোমানুষ। তোরা খামোকা চ্যাঁচিচ্ছিস কেন বাপু? মাছ আগে বঁড়শিতে ধরা পড়ুক। শুনুন বাবুমশাই, আমরা মোটমাট বারোজন আছি। বেশি নয়, মাথাপিছু একটা করে টুকরো দেবেন। ব্যাস। বলে সে ঠোঁট চেটে নিল! আহা! কতকাল আমরা মাছ খাইনি!
এসব লোকের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই। একে আমি একা, আর ওরা বারোজন। তাই আবার ছিপের কাছে গিয়ে বসলুম। চারের মাছটা আবার পালিয়েছে। মাছ ধরতে বসার আনন্দটাও আর নেই। স্টেশনমাস্টারও কি এজন্যই সাবধানে থাকতে বলেছিলেন?
একটু পরে ওদের দেখার জন্য পেছনে তাকালুম। অবাক হয়ে দেখলুম ধেড়ে লোকগুলো বাচ্ছা ছেলেদের মতো বটগাছটার ঝুরি বেয়ে উঠছে কেউ, কেউ ডালে চড়ে বসেছে, কেউ ডাল থেকে ধুপ করে পড়ছে। আবার ঝুরি বেয়ে উঠে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে একপাল হনুমান যেন। বয়স্ক লোকেরা এমন কেন খেলে, কম্মিনকালে তো দেখিনি।
এতক্ষণে একটু খটকা লাগল। কিন্তু চারে বুজকুড়ি দেখা দিয়েছে। মাছটা টোপ না খেয়ে ছাড়বে না। ফাতনার দিকে মন না দিয়ে তারা কী করছে, তাই নিয়ে মাথা ঘামান বৃথা।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরে-পরে পেছনে তাকাতে অবশ্য ভূলিনি। লোকগুলো যেন আপনমনে খেলায় মেতে রয়েছে। ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না। ফাতনাটা একবার নড়ল মনে হল। কিন্তু দোনামনার জন্য খ্যাচ মারতে পারলুম না। দুপুর ঘনিয়ে বিকেলে নামল। বিকেলও ক্রমশ ফুরিয়ে যাচ্ছিল। আলো কমে এল। পেছনে বটের ঝুরি এবং ডালপালায় লোকগুলো একই ভঙ্গিতে খেলায় মেতে আছে। তারপর ওদের কথা মন থেকে ঝেটিয়ে ফেললুম। চুলোয় যাক ওরা। ছিপে মাছ ধরতে একাগ্রতা দরকার। মনে আশা জেগেছে, অনেক মাছ ঠিক সন্ধ্যার মুখে টোপ ধরে মোক্ষম টান দেয়– এই মাছটাও তাই করবে।
কিন্তু হাতের রেখা মুছে ফেলার মতো ধূসরতা ঘনিয়ে উঠল এবং ফাতনাটাও অস্পষ্ট হয়ে উঠল, তখন হতাশ হয়ে ছিপ গুটিয়ে ফেললুম। ঝিলের জলের ওপর কুয়াশার পর্দা ঝুলছে। শূন্য ঝোলা আর ছিপটা হাতে নিয়ে ক্লান্তভাবে পা বাড়ালুম। বটতলায় আবছা আঁধার জমেছে। পোকামাকড় ডাকতে শুরু করেছে। কিন্তু লোকগুলো কোথায় গেল? ভাবলুম, মাছ গাঁথতে পারিনি লক্ষ করে ওরাও হতাশ হয়ে কেটে পড়েছে।
একটু দূরে কেকরাডিহি স্টেশনের সিগন্যাল বাতি জ্বলজ্বল করছিল। সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ আমার ফেরার ট্রেন। ধীরেসুস্থে হাঁটছিলুম। সবে চাঁদটা বেরিয়ে এসেছে। ফিকে জ্যোত্সা ছড়াচ্ছে কেকরাডিহির মাঠে। লোকগুলো এবং কাকগুলোর চেহারার মধ্যে কেমন যেন মিল আছে-ভাবতে-ভাবতে খটকাটা বেড়ে গিয়েছিল। তারপর মনে হল, আমারই দেখারই ভুল। রোদ-বৃষ্টিশীতে খেটে ওদের চেহারা অমন ঘেঁকুটে হয়ে গেছে। আর কাকের হামলাও কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। এদিকে মাছের ওপর গ্রামের লোকের অমন কাঙালপনা থাকতেই পারে। সব মাছ তো শহরে চালান যাচ্ছে আজকাল। কাজেই একটা অকারণ একটা স্বাভাবিক ব্যাপারকে রহস্যময় বলে ডাকছি।
কিন্তু হঠাৎ দেখি, সামনে একদঙ্গল ছায়ামূর্তি সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। থমকে দাঁড়ালুম। তাদের কালো মুখে সাদা দাঁত ঝিকমিক করছে। আতঙ্কে বোবাধরা গলায় বলে উঠলুম, কী কী চাই তোমাদের?
তখনকার মতো একগলায় ওরা চেঁচিয়ে উঠল, মাছ-মাছ!
এতক্ষণে নাকি স্বরে মাছ উচ্চারণ শুনেই শরীর হিম হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলুম ওরা কে। ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বললুম,–মাছ তো পাইনি।
একসঙ্গে ব্যাটাচ্ছেলেরা চেঁচিয়ে উঠল,–মিছে কঁথা। মিছে কঁথা।
কাকুতিমিনতি করে বললুম,–বিশ্বাস করো, মাছ পাইনি।
একজন বলল,–ওঁরে। ওঁরে ঝোঁলাটা কেঁড়ে নেঁ!
তারপর দেখি, ওরা এক পা করে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। অমনি ঝোলাটা ছুঁড়ে ফেলে দিলুম। ওরা বিদঘুঁটে চ্যাঁচামেচি করে ঝাঁপিয়ে পড়ল ঝোলাটার ওপর। আর সেই সুযোগে আমি দৌড় দিলুম। দৌড়-দৌড়-দৌড়! একেবারে স্টেশনে পৌঁছে সোজা স্টেশনঘরে ঢুকে পড়লুম।
টেবিলের ওপর রেলের লণ্ঠন জ্বলছে। কিন্তু স্টেশনমাস্টার কোথায় গেলেন? হাঁফাতে-হাঁফাতে তাঁকে ডাকব ভাবছি, কোণার অন্ধকার জায়গা থেকে তার সাড়া পেলুম, কী মশাই, মাছ পেলেন নাকি?
বললুম,–মাছ তো দূরের কথা, কাকমারির ঝিলে গিয়ে জোর বেঁচে গিয়েছি। উঃ! আপনি ঠিকই বলেছিলেন।
কিন্তু আমার যে মাছের ভাগ চাই! কথা দিয়েছেন। বলে স্টেশন-মাস্টার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এলেন। মুখে সেই অদ্ভুত হাসিটা। আমি মাছ খেতে ভালবাসি। মাছ আঁমার চাই।
শেষ বাক্যটি কী নাকিস্বরে উচ্চারণ করলেন? আর ঠিক সেই লম্বানেকো আজব প্রাণীগুলোর মতোই ওঁর গায়ের রং এবং উনি এক পা করে আমার দিকে এগুচ্ছেন দেখছি। এক লাফে বেরিয়ে যাব ভাবছি, হঠাৎ কেউ ঘরে ঢুকে হেঁড়ে গলায় গর্জন করল, তবে রে ব্যাটা মাছখেকো! আবার তুমি আমার আপিসে ঢুকে বসে আছ?
