ঠিক এই মুহূর্তে বিদঘুঁটে ঘটনাটা ঘটতে শুরু করেছিল। কিন্তু তখনও কিছু টের পাইনি।
তার আগের কথাটা বলে নিই।
শুনেছিলুম কেকরাডিহির ওদিকে একটা ঝিল আছে। তার নাম কাকমারি ঝিল। কাকের কথাটা কেন আসছে জানতুম না। পরে অবশ্য জেনেছিলুম। তো সেই ঝিলে নাকি আদ্যিকালের বিশাল বিশাল সব মাছ আছে। ছিপ ফেললে তারা এসে টোপ ঠোকরায় বটে, কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ একটা মাছও গাঁথতে পারেনি বঁড়শিতে। সেই শুনে আমার জেদ চড়ে গিয়েছিল।
আশ্বিনের এক দুপুরবেলা কেকরাডিহি স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে পড়লুম। নেমে দেখি, ছোট্ট এক স্টেশন। খাঁ-খাঁ করছে চারদিক। স্টেশনমাস্টার বয়সে প্রবীণ। আমাকে দেখে একটু হেসে বললেন,-কাকমারির ঝিলে ছিপ ফেলতে এসেছেন বুঝি? যান গিয়ে দেখুন যদি একটা গাঁথতে পারেন। তবে…
ওঁকে হঠাৎ চুপ করতে দেখে বললুম,–তবে কী?
উনি কেমন যেন গম্ভীর হয়ে বললেন,-কিছু না। বলছিলুম কী, একটু সাবধানে থাকবেন।
–কেন বলুন তো? ছিনতাইয়ের ভয় আছে নাকি?
স্টেশনমাস্টার এবার কেমন যেন হাসলেন, নানা। জঙ্গুলে জলা জায়গা। ওখানে ছিনতাইবাজরা যাবে কী আশায়? কাক। বুঝলেন? কাকের বড় উপদ্রব ওখানে। সেজন্যই তো কাকমারি ঝিল নাম হয়েছে। মাছ মারবেন, না কাক মারবেন, সেটাই প্রবলেম। যাক গে। এসেই পড়েছেন যখন, তখন আর দেরি করবেন না। সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসুন ভালোয়-ভালোয়।
এই সব অদ্ভুত কথাবার্তা শুনে মাথামুন্ডু কিছুই বুঝলাম না।
ভদ্রলোক স্টেশনঘরে ঢুকে গেছেন। চেঁচিয়ে জিগ্যেস করলুম, ঝিলটা কোনদিকে বলুন তো?
জানালায় মুখ বাড়িয়ে বললেন, নাক বরাবর হেঁটে যান। আর একটা কথা। মাছ যদি গাঁথতে পারেন, আমার কিন্তু ওয়ানথার্ড পাওনা রইল। তারপর হেঁ-হেঁ করে বিদঘুঁটে হাসতে লাগলেন।
প্রতিশ্রুতি দিয়ে নাক বরাবর হাঁটতে থাকলুম। রাস্তা-টাস্তা নেই। পোড় জমির ওপর ঘন ঘাস আর ঝোঁপঝাড় গজিয়ে রয়েছে। বেশ খানিকটা এগিয়ে ঝিলটা দেখা গেল। দারুণ সুন্দর পরিবেশ। জলজ গাছ আর দামে ঢাকা ঝিলটা আয়তনে প্রকাণ্ড বলা যায়। মস্ত বটগাছের তলায় মাছ ধরার ঘাটটা দেখে মনে আনন্দে নেমে উঠল। কিছুক্ষণের মধ্যে চার ছড়িয়ে টোপ গেঁথে ছিপ ফেলে আরাম করে ছায়ায় বসে পড়লুম।
কিছুক্ষণ পরে ফাতনার কাছে বুজকুড়ি কাটতে দেখে ছিপ বাগিয়ে ধরেছি। তারপর ফাতনাটা নড়ে ওঠা মাত্র যেই খাচ মারতে গেছি, অমনি কা-কা করে কোত্থেকে একঝাক কালো কুচকুচে কাক আমার মাথায় ওপর কালো চাকার মতো পাক খেতে শুরু করেছে। তাদের বিকট চ্যাঁচিমেচিতে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে।
কাকের কথাটা পথে আসতে-আসতে ভুলেই গিয়েছিলুম। ছিপ ছেড়ে দিয়ে প্রচণ্ড খাপ্পা হয়ে পড়লুম। তারপর ঢিল কুড়িয়ে কাকগুলোকে তাড়াবার চেষ্টা করলুম। এই করতে গিয়ে আমার টুপিটা পড়ে গেল। আমার মাথায় বিরাট টাক। ধড়িবাজ কাকগুলো সেই টাক লক্ষ করে ঝাঁপিয়ে আসতে থাকল। তখন মরিয়া হয়ে ছিপ তুলে বাই-বাই করে ঘোরাতে শুরু করলুম। গাছের পাতায় শেষপর্যন্ত বঁড়শি আটকে গেল বটে, কিন্তু এবার কাকগুলো জব্দ হয়ে সরে গেল। বটগাছটার মাথায় গিয়ে বসল।
আগে জানলে গোটাকতক পটকা আনতুম সঙ্গে। কী আর করা যায়। অনেক কষ্টে পাতা থেকে বঁড়শি ছাড়িয়ে টোপ গেঁথে ঠিক জায়গায় ফেলে বসে রইলুম। কিন্তু এবার সতর্ক হয়েছি। বারবার পিছন ফিরে দেখে নিচ্ছি। কিন্তু কাকগুলো আর টু করছে না। ডালপালার ভেতর কোথায় বুঝি ঘাপটি মেরে বসে আছে। কয়েক মিনিট নির্ঞ্ঝাট কেটে গেলে বুঝলুম, বাছাধনরা ভয় পেয়ে গেছে। দৈবাৎ বঁড়শি গেঁথে গেলে কী অবস্থা হবে, নিশ্চয় আঁচ করেছে।
ফাতনার কাছে বুকুড়িগুলো মিলিয়ে গেছে কখন। মাছটা হয়তো ডাঙার ওপর ওই হুলুস্থুলু টের পেয়ে কেটে পড়েছে। কাকগুলোর ওপর রাগে খাপ্পা হয়ে গেলুম! তারপর খেয়াল হল, ওই যাঃ। টুপিটা কোথায় পড়েছে খুঁজে আনতে হয়। কাকের লক্ষ্যস্থল আমার এই বিরাট টাকাটাকে এখনও ঢাকিনি কোন্ আক্কেলে?
টুপিটা ঝোঁপের পাশে পড়ে ছিল। কুড়িয়ে মাথায় পরেছি, হঠাৎ বটতলার অন্যপাশ থেকে একটা কালো খেকুটে চেহারার লম্বানেকে তোক বেরিয়ে এল। পাড়াগাঁয়ের মাঠে খেতখামারে যারা কাজ করে, সত তাদেরই কেউ। কোমরে একটুখানি ন্যাকড়া জড়ানো শুধু, বাদবাকি শরীর নগ্ন। একগাল হেসে সে বলল, মাছ ধরতে পারলেন বাবুমশাই?
বিরক্ত হয়ে বললুম, কই আর পারলুম? যা কাকের উপদ্রব!
লোকটা খা-খা ধরনের হাসি হেসে বলল,–বলে দেব। আর ঝামেলা করবে না–তবে কিন্তু মাছের ভাগ দিতে হবে বাবুমশাই!
–তা না হয় দেব! কিন্তু বলে দেব মানে কী? কাকগুলো কি তোমার পোষা কাক নাকি?
–আজ্ঞে কতকটা।
–কতকটা মানে?
লোকটা তার লম্বা নাকের ডগা চুলকে বলল,–অত কথায় কাজ কী বাবুমশাই? যান, বসুন গে।
ছিপের কাছে বসলুম আবার। ভাবলুম লোকটা আসলে রসিকতা করছে। বললুম,–ওহে! মাছ ধরতে পারলে তোমাকে একটা অবশ্যই দেব! তুমি দেখ, যেন কাকগুলো আর বিরক্ত না করে, বরং গাছের ডাল ভেঙে নাও একটা।
লোকটা বলল–কিছু ভাববেন না। আপনি ফাতনার দিকে চোখ রাখুন।
ফাতটানার কাছে আবার বুকুড়ি ফুটে উঠল। ছিপ বাগিয়ে ধরলুম। ফাতনাটা নড়লেই খাচ মারব। কিন্তু সেই সময় পেছনে বটতলায় ধূপ ধূপ ধূপ ধূপ শব্দ হল এবং চেরাগলায় কারা চ্যাঁচামেচি করে দৌড়ে এল,–মাছ! মাছ! মাছ! মাছ!
