স্টেশনমাস্টাররূপী লোকটা অমনি জানালা গলিয়ে পালিয়ে গেল। আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি। আসল স্টেশনমাস্টার-যাঁর সঙ্গে তখন আলাপ হয়েছিল, হাসতে-হাসতে বললেন, ভয় পাননি তো? এই অখাদ্য স্টেশনে মশাই এইসব ঝামেলা লেগেই আছে। দেশে মাছের বড় আকাল। যাকগে, বসুন। মুখ দেখেই বুঝেছি কী ঘটেছে। যাই হোক, সেই আমার ছিপে মাছ ধরার নেশা ঘুচে গেছে তো গেছে! আসার সময় ছিপটা ভেঙে ট্রেনের জানলা গলিয়ে ফেলে দিয়েছি। এখন বেশ শান্তিতেই আছি। নিরামিষ খাই-দাই।…
দাড়িবাবাদের কবলে
তাঁকে বড়রা বলতেন তোতামিয়াঁ। আমরা ছোটরা বলতুম তোতামামা। কেউ-কেউ তাকে বলতেন, জাহাজি তোতা। কারণ তোতামামা ছিলেন জাহাজের নাবিক।
আমাদের ছোট্ট শহরে হিন্দু ও মুসলিমরা মিলেমিশে বাস করতেন। তোতামামার বাড়ি ছিল আমাদের বাড়ির পাশেই। তাঁর ভাই ছিলেন দর্জি। তার ডাকনাম ছিল আমিয়া। দুজনেরই আসল নাম আমার জানা ছিল না। কিন্তু তোতা-আতা দুইভাই ছিলেন একেবারে বিপরীত। যেমন মেজাজে, তেমনি চেহারায়।
তোতামামা ছিলেন লম্বা-চওড়া প্রকাণ্ড মানুষ। তেমনি প্রকাণ্ড ভূঁড়ি। মাথার চুল কাঁচাপাকা। সামনের দিকে অল্প চুল। কিন্তু পেছনে একেবারে খুঁটিয়ে ছাঁটা। তবে দেখবার মতো জিনিস ছিল তার গোঁফ। সূচলো বাঁকা গোঁফের ডগা। কিন্তু বিশাল সেই গোঁফ। রোজ দাড়ি কামাতেন। তাই বাবা ঠাট্টা করে বলতেন, কী হে তোতামিয়া! রোজ দাড়ি কামাও কি গোঁফকে দেখনসই করার জন্য?
তোমামা ভুঁড়ি কাঁপিয়ে হেসে বলতেন, তুমি ঠিকই ধরেছ। তবে কী জানো? আমার জাহাজের ক্যাপ্টেন হুবার্ট সায়েব ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি রাখেন। তাই কোনও নাবিকের দাড়ি রাখা পছন্দ করেন না। দাড়ি রাখবেন শুধু তিনি। ক্যাপ্টেন বলে কথা।
তোতামামা সারা বছর সমুদ্রে পৃথিবীর এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে জাহাজে কাটিয়ে বাড়ি ফিরতেন মাত্র একবার। কিছুদিন ছুটি কাটিয়ে আবার কলকাতা ফিরে যেতেন। তারপর আবার জাহাজে পাড়ি দিতেন এক দেশ থেকে অন্য দেশে। যখন বাড়ি ফিরতেন, তখন পাড়ার ছোট-বড় সবার জন্য কত জিনিস নিয়ে আসতেন এবং উপহার দিতেন। আমার জন্য আনতেন রংবেরঙের ছবির বই, কালার পেনসিল, লজেন্স। আমাদের বাড়ির ভেতরে বারান্দায় বসে চা খেতে-খেতে তার সমুদ্রযাত্রার অদ্ভুত-অদ্ভুত গল্প শোনাতেন। তাই তোতামামা এলেই আমি আহ্লাদে আটখানা হয়ে যেতুম। বাবা ও মা-ও খুশি হয়ে গল্প শুনতেন।
সেবার পুজোর আগে সন্ধ্যাবেলায় পড়তে বসেছি, এমনসময় বাইরে তোতামামার চেনা সেই ভরাট গলার ডাক শোনা গেল,–পুঁটু। ও পুঁটু!
অমনি দৌড়ে ছোট্ট উঠোন পেরিয়ে সদর দরজা খুলে দিলাম। তারপরই ভীষণ ভড়কে গেলুম। এ আবার কে? সেই দশাসই চেহারা, পরনে প্যান্ট-শার্ট, কাঁধে ব্যাগ অথচ মুখে গোফ নেই এবং মাথায় চুল নেই। পুরো মাথা জুড়ে চকচকে টাক!
আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি দেখে তোমামা বললেন, কী রে পুঁটু? চিনতে পারছিসনে? আমি তোর সেই তোতামামা?
অবাক হয়ে বললুম,–আপনার গোঁফ নেই কেন? মাথায় চুল নেই কেন তোতামামা?
ভেতরে চল। সব বলব। –বলে তোতামামা বাড়ি ঢুকলেন।
বাবা ইতিমধ্যে উঠোনে নেমে এসেছেন। তিনিও খুব অবাক হয়ে বললেন,–কী অদ্ভুত ব্যাপার! ওহে তোতামিয়া! তোমার গোঁফ কোথায় গেল? মাথাজুড়ে টাক পড়ল কেন? তোমার গালই বা অমন চকচক করছে কেন?
তোমামা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিষণ্ণ মুখে বললেন,–আর বোলো না হে! প্রাণে বেঁচে ফিরতে পেরেছি এই যথেষ্ট। বলে তিনি হাঁক দিলেন, কই গো বোনটি? শিগগির চা দাও। তোমার হাতের চা না খেলে চাঙ্গা হব না। ট্রেন থেকে নেমেই প্রথমে এ বাড়ি ঢুকেছি।
মা বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মা-ও ভীষণ অবাক। বললেন,–এ কী দাদা! তোমার এমন চেহারা হল কেন?
তোতামিয়াঁ বারান্দায় উঠে একটা চেয়ারে বসে বললেন, আগে চা। তারপর কথা হবে। হ্যাঁ–পুঁটুর কোন ক্লাস হল এবার?
বললুম, ক্লাস সিক্স।
বাহ! এই নে। তোর জন্য কত ইংরেজি গল্পের বই এনেছি দ্যাখ! –তোতামামা কয়েকটা রংচঙে লম্বা-চওড়া বই বের করে আমার হাতে গুঁজে দিলেন। তারপর বাবাকে বললেন, তোমার জন্য এই সেফটি রেজার, ব্লেড আর দাড়ি কামানোর লোশন এনেছি। আর আমার বোনটির জন্য এনেছি পাপুয়া দ্বীপের আদিবাসীদের তৈরি কতরকমের গয়না। হা–একসেট সাবানও এনেছি।
মা তখনই চা করতে গেলেন। বাবা পাশে একটা চেয়ার টেনে বসলেন। আমি থামে হেলান দিয়ে তোতামামার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলুম। ইনি কি সত্যি সেই তোতামামা, নাকি অন্য কেউ? কিছু বলা যায় না। আমাদের পাড়ার শেষে একটা কবরখানা আছে। কেন যেন গা ছমছম করতে লাগল।
বাবা বললেন,–দেখো ভাই তোতা! তোমার সেফটি রেজার, ব্লেড, আর এই লোশন দিয়ে দাড়ি কামিয়ে আমার অবস্থা তোমার মতো হবে না তো?
তোতামামা একটু হেসে বললেন, আরে নানা! ওগুলো খাঁটি অস্ট্রেলিয়ায় তৈরি। ও সবের সঙ্গে আমার গোঁফ হারানো বা মাথাজুড়ে টাক গজানোর কোনও সম্পর্ক নেই।
মা শিগগির চা এনে দিয়ে মোড়ায় বসে উপহারগুলো দেখতে থাকলেন। আমি বললুম,–এবার বলুন না তোতামামা, আপনার গোঁফের কী হল? মাথায় অমন টাক পড়ল কেন?
তোতামামা আস্তেসুস্থে চা খাওয়ার পর বললেন,–সে এক সাংঘাতিক ঘটনা। বললে তোমরা বিশ্বাস করবে না। কিন্তু যা বলছি, তা কত সত্যি আমি জানি। আমার অবস্থা এমন কেন হল এবার শোনো।
