কার্টার বলল,–আমার ধারণা, ওরা সম্ভবত প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিল।
একজন বিশেষজ্ঞ বললেন, কীসের ভয়?
কার্টার মাথা নেড়ে বলল, জানি না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, আতঙ্ক ছাড়া এর কোনও ব্যাখ্যা হতে পারে না। যেন তারা কোনও অশরীরী আত্মার বিভীষিকা দেখে পালিয়ে গিয়েছিল এই ঘর থেকে।
এ ঘরে তুতানখামেনের মমি নেই। সামনে একটা ছোট্ট দরজা দেখা যাচ্ছিল। সেই দরজাটা কিন্তু অক্ষত। তার জোরে তুতানখামেনের সাংকেতিক চিহ্ন আঁকা সিলমোহর।
ভাঙা হল সেটা। ভেতরে ঘুপচি একটা ঘর। ঘরের মধ্যিখানে কফিন দেখা গেল। কফিনের ভেতর তুতানখামেনের মমি। অভিশপ্ত বালকরাজা ঘুমিয়ে আছেন অনন্ত ঘুমে।
কফিনের ঢাকনাটা সোনার পাতে তৈরি। সে-বাজারে তার দাম হিসেব করা হয়েছিল পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড! টাকার হিসেবে সে-যুগেই লক্ষাধিক টাকা।
এই দ্বিতীয় ঘরেও পোড়ামাটির পাত্রে অজস্র মণিমুক্তা ভরা। সিলমোহর ভেঙে সব গুনে তালিকা তৈরি হল।
দুই ঘরে যে ধনরত্ন পাওয়া গেল, কার্টার তার একটা মোটামুটি তালিকা করেছিল। এখনও সেই তালিকা আছে লন্ডন জাদুঘরে। কিন্তু তালিকার ধনরত্ন…
সে কথা পরে বলছি।
তুতানখামেনের মমি এবং গুপ্তধনের আবিষ্কারের খবর ছড়িয়ে পড়ল সারা বিশ্বে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনী পাঠানো হল রাজরাজড়ার উপত্যকায় পাহারা দিতে। গুপ্তধন নিয়ে যাওয়া হবে লন্ডনে।
কিন্তু সেসব কাণ্ডের আগে ঘটল বিচিত্র সব ঘটনা।
বিশেষজ্ঞদের মধ্যে পরস্পর তীব্র কলহ বেধে গেল। কী নিয়ে কলহ, আজ আর জানার কোনও উপায় নেই। যদিও অনুমান করতে অসুবিধা হয় না কিছু।
পরস্পরের মধ্যে কলহের পরিণামে কেউ-কেউ খুনও হয়ে গেলেন। কাটারকেও মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে উড়োচিঠি আসছিল। তাঁবুর মধ্যে সেইসব চিঠি এনে কে ফেলে রেখে যেত। কার্টার শেষপর্যন্ত ভয় পেয়ে লন্ডনে পালিয়ে গেল।
একটা ব্যাপার আঁচ করা যায়। গুপ্তধনের লোভেই যেন এসব কাণ্ড হচ্ছিল।
কিন্তু এ পর্যন্ত একটা কারণ আমরা আঁচ করতে পারি, পরের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে তা পারি না।
বিশেষজ্ঞদের মধ্যে খুনোখুনির পর যাঁরা বেঁচে ছিলেন, যে-যার দেশে ফিরে যান। তারপর অদ্ভুত রোগে ভুগে অল্প সময়েই মারা পড়েন। সমকালীন সংবাদপত্রে লেখা আছে–রহস্যময় মৃত্যু।
আর কার্টার?
এক সকালে তাকেও বিছানায় মৃত দেখা যায়। মৃত্যুর কারণ অজ্ঞাত। শুধু বলা হয়, হার্টফেল।
তার পাশে ডাক্তাররা লিখে রেখেছেন–সম্ভবত ভয় পেয়ে কিংবা আকস্মিক উত্তেজনায়।
কিন্তু তার চেয়েও বিচিত্র ব্যাপার, লন্ডনে শেষপর্যন্ত তুতানখামেনের গুপ্তধন বলে যে ধনরত্ন নিয়ে যাওয়া হয়, কার্টারের বেসরকারি তালিকা অনুসারে তা মাত্র শতকরা দশ ভাগ। বাকি নব্বই ভাগ কোথায় গেল? তার কোনও পাত্তা আজও মেলেনি।
তেরো ভূতের কবলে
সবে চাঁদটা উঠেছে, আর তার ফিকে জ্যোৎস্নায় সার বেঁধে একদঙ্গল ছায়ামূর্তি আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের কালো মুখে সাদা দাঁতগুলো ঝিকমিক করছে। তারপর তারা এক-পা এক-পা করে এগিয়ে আসতে থাকল।
কেকরাডিহির মাঠে অনেক বছর আগে এক সন্ধ্যাবেলায় এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য মনে পড়লে এখনও আতঙ্কে আমার শরীর হিম হয়ে যায়। কথায় বলে বারো ভূতের পাল্লায় পড়া। আমি পড়েছিলুম তেরো ভূতের পাল্লায়।
ছিপ ফেলে মাছ ধরার বাতিক তত কম দুঃখে ঘোচেনি। অমন দামি বিলিতি হুইল মুচড়ে ভেঙে ট্রেনের জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলেছিলুম। তারপর নাক কান ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলুম, আর কদাচ ছিপ হাতে করব না। সেই প্রতিজ্ঞা এখনও রেখেছি। উপরন্তু মাছ কেন, আমিষ খাওয়াই ছেড়ে দিয়েছি। তাই বেশ নিরাপদেই আছি বলতে গেলে।
ব্যাপারটা বললে কেউ বিশ্বাস করবে না জানি। কিন্তু এতদিন পরে কাগজে পড়লুম, কেকরাডিহির কাছে সেই কাকমারি ঝিলে সরকার মৎসচাষ প্রকল্প শুরু করবেন। কাজেই আগাগোড়া ছাপার হরফে সবটাই বলে দেওয়া উচিত–লোকেরা যদি সাবধান হয়। কিন্তু মাছখেকো বাঙালি পরলোকে গিয়েও মাছের জন্য ছোঁকছোঁক করে। আমার কথা শুনবে কি কেউ?
বছর-পাঁচেক আগের কথা। তখন আমার ছিপের নেশা ছিল প্রচণ্ড রকমের। আমাদের মফস্বল শহরটার আনাচে কানাচে এমন পুকুর বা জলা ছিল না, যেখানে আমি ছিপ ফেলিনি। নেশা তুঙ্গে উঠলে তখন দূরে যাওয়া শুরু করেছিলুম। কোথায় কোন গ্রামে কার পুকুরে কীরকম মাছ আছে, তক্কে তক্কে থেকে খবর নিতুম আর সেখানে গিয়ে হাজির হতুম।
মাছ তো বাজারে পয়সা দিয়ে কেনা যায়। আবার জাল ফেলেও মাছ ধরতে অসুবিধে নেই। কিন্তু ছিপ ফেলে মাছ ধরার কোনও তুলনা হয় না। তার চেয়ে বড় কথা, মাছ ধরার চেয়ে মাছের আশায় জলের ধারে বসে থাকার মতো আনন্দ আর কিছুতে নেই।
নিরিবিলি নিঝুম পরিবেশ। দামের ওপর একঠ্যাঙে সাদা বক বসে যেন ধ্যান করছে। মাছের প্রতীক্ষায় থেকে হঠাৎ কোনও তিতি-বিরক্ত মাছরাঙা ঠা-া চেঁচিয়ে উঠছে। জলের ওপর তরতরিয়ে খেলে বেড়াচ্ছে জলমাকড়সার ঝক। টুকটুকে লাল গাংফড়িংটা ফাতনার ওপর উড়ে-উড়ে ছোঁ মারছে। তারপর ফাতনার কাছে জলের বুজকুড়ি ফুটছে। হ্যাঁ, চারে মাছ এসেছে। এত মোটা বুজকুড়ি যখন, তখন মাছটা হয়তো কিলোদশেক হবে। উত্তেজনায় রক্ত চনমন করছে। ঝুঁকে বসে ছিপটা শক্ত করে ধরেছি। ফাতনা নড়লেই মারব এক জোরাল খাচ। তারপর…
