এতদিনে সেই অভিশপ্ত রাজার মমি ও ধনরত্নের কিংবদঢ়ি সত্য প্রমাণিত হতে চলেছে। লর্ড কার্নারভন এবং কার্টার তো বটেই, দলের প্রতিটি মানুষ আগ্রহে উত্তেজনায় অস্থির হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন।
অবশেষে দরজা কীভাবে খোলা যায়, পরীক্ষা করছিল কার্টার। হঠাৎ সে চমকে উঠে বলল, লর্ড! এই দরজা মনে হচ্ছে কোনও একসময়ে ভাঙা হয়েছিল যেন।
লর্ড কার্নারভন বিস্মিত হয়ে বললেন,–সে কী!
–হ্যাঁ লর্ড। এই দেখুন, দরজার সিলমোহরগুলো দুভাগ হয়ে আছে এবং কেউ সেই ভাঙা জায়গাটা আবার জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাছাড়া কপাটের জোড়ের দিকটা লক্ষ করুন। চিড় খেয়ে আছে জায়গায়।
লর্ড কার্নারভন পরীক্ষা করে দেখে বললেন,–তাই মনে হচ্ছে, কার্টার। কিন্তু তাই যদি হয়, তাহলে ভেতরে নিশ্চয় আর একতিল সোনাদানা তো নেই-ই, এমনকী মমিটা আছে কি না তাও সন্দেহ।
কার্টার চিন্তিতমুখে বলল,–তাহলে দরজা ভেঙে দেখা যাক কী হয়েছে।
লর্ড কার্নারভন বললেন, কিন্তু যদি সত্যি ভেতরে কিছু না থাকে, তাহলে শেষপর্যন্ত বিশ্বের পুরাতাত্ত্বিকরা, এমনকী লন্ডনের জাদুঘর কর্তৃপক্ষও ভাবতে পারেন–আসলে হয়তো আমরাই সব গুপ্তধন মেরে দিয়েছি এবং মিথ্যা করে রটাচ্ছি
যে কারা আমাদের আগেই দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকেছিল। তাই না কার্টার?
কার্টার ভেবে দেখে বলল, হ্যাঁ, তাও তো বটে।
–কার্টার, ব্রিটিশ আইন অনুসারে তুতানখামেনের সবকিছুই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজকীয় সম্পত্তি বলে গণ্য হবে। অতএব আমাদের মিথ্যা বদনামের ভাগী হওয়া উচিত নয়। বরং আমরা লন্ডন জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে খবর পাঠাই। তাদের বিশেষজ্ঞ দলটি এসে আগে দেখুন, সত্যি দরজা অনেক আগে ভাঙা হয়েছিল কি না। তারপর তাঁদের সামনেই আমরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকব এবং কী আছে দেখব। এমনটি হলে কেউ আমাদের চোর বদনাম দিতে পারবে না।
কার্টার সায় দিয়ে বলল, ঠিক বলেছেন লর্ড। আজই টেলিগ্রাম করার ব্যবস্থা করি।
লোক পাঠানো হল কায়রো শহরে। সেখান থেকে টেলিগ্রাম গেল।
আর তুতানখামেনের সমাধিকক্ষের দরজায় পাহারার ব্যবস্থা হল। লর্ড কার্নারভন এবং কার্টার তো সজাগ রইলেনই। পালাক্রমে রাত জেগে প্রহরীদের দিকেও লক্ষ রাখলেন দুজনে।
চতুর্থ রাত্রে এক সাংঘাতিক ঘটনা ঘটল।
শেষ রাত্রে ছিল লর্ড কার্নারভানের পাহারার পালা। কার্টারকে জাগিয়ে দিয়ে তিনি তাঁবুতে শুতে গেলেন।
রামেসিসের কবরের কাছে তাঁবু। লর্ড চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই কার্টার যেন একটা আর্তনাদ শুনল কোথাও। একজন প্রহরীকে পাঠাল ব্যাপারটা অনুসন্ধান করতে। একটু পরে সে দৌড়ে এসে হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল,–লর্ডসায়েব পড়ে আছেন রামেসিসের কবরের ওপরে।
সেই শেষরাত্রে হইচই পড়ে গেল।
লর্ডসায়েবের শরীরে কোথাও ক্ষতচিহ্ন নেই। কিন্তু তিনি মারা পড়েছেন। মুখের কষায় জেলার সঙ্গে রক্ত আছে। নাকেও কয়েক ফোঁটা টাটকা রক্ত।
লর্ড কার্নারভনের মৃতদেহ কায়রো শহরের মর্গে পাঠানো হয়েছিল। শবব্যবচ্ছেদ করে ডাক্তাররা মৃত্যুর কোনও কারণ খুঁজে পাননি। রিপোর্টে শুধু লিখেছেন, হার্টফেল। সম্ভবত আকস্মিকভাবে ভয় পেয়ে কিংবা উত্তেজিত হয়েই হার্টফেল করে মারা পড়েছেন।
অবশ্য তাঁর বয়স হয়েছিল। তার ওপর দশ বছর ধরে এইরকম একটা পাণ্ডববর্জিত জায়গায় কাটানো। স্নানাহার নিয়মিত ছিল না। নার্ভের ওপর দিনের পর দিন দশ বছর ধরে তীব্র চাপ পড়েছিল। মানসিক অবস্থা ও স্বাস্থ্য দুই-ই বিচার করে বলা যায়, হার্টফেল হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
সাতদিন পরে লন্ডন থেকে বিশেষজ্ঞরা এসে পড়লেন। সবাই চুঁদে পুরাতাত্ত্বিক পণ্ডিত এবং প্রাচীন জিনিস সম্পর্কে প্রত্যেকেরই অসাধারণ জ্ঞান।
ভঁরা সমাধিকক্ষের দরজা পরীক্ষা করে বললেন, হ্যাঁ। কয়েকশো বছর আগে কেউ বা কারা এই দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকেছিল। বেরিয়ে এসে আবার দরজা আগের মতো আটকাবার চেষ্টা করেছে। সিলমোহরগুলো জোড়াতাড়া দিয়ে সেঁটে দিয়েছে। ডাকাত ছাড়া কে হতে পারে তারা?
বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নানা দেশের কিছু সাংবাদিক ও ফোটোগ্রাফারও এসেছিলেন। অনেক ছবি তোলা হল দরজার। রেকর্ড হিসেবে এ ছবির দাম আছে।
দরজা ভেঙে ফেলা হল। ভেতর থেকে ভ্যাপসা গন্ধ বেরিয়ে এল প্রথমে। তারপর ক্রমশ একটা মিঠে গন্ধ ছড়ালবাসি ফুল কিংবা পুরোনো আতরের গন্ধের মতো। ভেতরে ঘন অন্ধকার থমথম করছে দিনদুপুরে।
পেট্রোম্যাক্স বাতি জ্বেলে বিশেষজ্ঞরা ভেতরে ঢুকলেন। তারপর হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ঘরের মেঝেয় ছড়িয়ে রয়েছে কিছু ডালাভাঙা বাক্স-পেটরা, সিন্দুক এবং মেঝের ওপর বহুমূল্য প্রাচীন কাপড়চোপড়, আর কিংবদন্তিখ্যাত সেই সোনা হীরা-মণি-মুক্তো! তাছাড়া রয়েছে রত্নখচিত অজস্র দেবতার মূর্তি, কারুকার্যময় পাত্র, প্রচুর ছবিও।
প্রথম ছবিটি তুলল ইলাস্ট্রেটেড লন্ডন নিউজ পত্রিকার ফোটোগ্রাফার। সেই ছবি কদিন পরে ওই পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। আজও তা বিভিন্ন বইপত্তরে দেখতে পাওয়া যায়।
বিস্ময়ের ঘোর কাটলে বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে বললেন,–ডাকাতরা সব ধনরত্ন নিয়ে পালাবার মুখে হঠাৎ কোনও কারণে সব ফেলে পালিয়ে গেছে। এবং বাইরের দরজাটাও আটকে দিতে বাধ্য হয়েছে, এমনকী ভাঙা সিলমোহরও জোড়া দিয়েছে আমরা তো সেটা দেখেই এসেছি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন? কেন তারা এমন করে সব ফেলে পালাল?
