১৯১৭ সালে কার্টার আর স্থির থাকতে পারল না। অধ্যক্ষের সঙ্গে ততদিনে তার স্নেহের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কার্টার বলল, আমি মিশরে গিয়ে তুতানখামেনের কবর খুঁজে বের করব। আমাকে সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন।
অনেক সাধাসাধির পর অনুমতি পাওয়া গেল। তবে অধ্যক্ষ বললেন,–দেখো বাবা, তুমি কিন্তু পুরাতাত্ত্বিক হিসেবে পণ্ডিতসমাজে স্বীকৃত নও। তাই তোমাকে স্বাধীনভাবে কাজ করার অনুমতি দেওয়া যাবে না। বরং অন্য উপায়ে সে-ব্যবস্থা করছি। তুমি আমার চিঠি নিয়ে চলে যাও মিশরে। সেখানে লর্ড কার্নারভন চার বছর ধরে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। তুমি তার সঙ্গে দেখা করো। তাঁর দলে থেকেই তুমি তোমার কাজ করতে পারবে।
কার্টার তার চিঠি নিয়ে চলে এল মিশরে।
ভ্যালি অব দি কিংস-এ পাহাড়, মরু ও রুক্ষ অনুর্বর এলাকায় লর্ড কার্নারভনের তাঁবু খুঁজে বের করল। লর্ড খুশি হলেন এই মেধাবী বুদ্ধিমান যুবককে পেয়ে। দ্বিগুণ উদ্যমে তন্নতন্ন করে খোঁজ শুরু হল। যেখানে সন্দেহ হয়, সেখানেই মাটি খোঁড়া চলতে থাকে। কিন্তু তুতানখামেনের কবরের কোনও পাত্তা পাওয়া যায় না।
অথচ কার্টারের বিশ্বাস, ভিক্টোরিয়া পার্কের সেই অদ্ভুত রহস্যময় ঘটনার মধ্যে একটা স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। কার্টারই একদিন না একদিন তুতানখামেনের কবর আবিষ্কার করতে পারবে।
১৯২২ সাল পর্যন্ত খোঁড়াখুড়ির কাজ চলল। কিন্তু সব নিষ্ফল হল।
লর্ড কার্নারভন এতদিনে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। ন-বছর ধরে পড়ে আছেন এই উপত্যকায়। অজস্র টাকাকড়ি খরচ হয়ে গেছে। লন্ডন জাদুঘরের সাহায্যও প্রচুর পেয়েছেন। কিন্তু সবই জলে গেছে। এবার বললেন,-থাক। স্বদেশে ফিরে যাই। তুতানখামেনের কবর সম্ভবত আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
কার্টার বলল, যদি অনুগ্রহ করে আর একটা বছর সময় দেন, আমি কথা দিচ্ছি–তুতানখামেনের কবর আমি আবিষ্কার করবই।
লর্ড কার্নারভন বিরক্ত হয়ে বললেন, তুমি ফ্যারাওয়ের গুপ্তধনের লোভে পাগল হয়ে উঠেছ দেখছি।
না লর্ড! কার্টার মিনতি করে বলল, ধনরত্নের প্রতি একটুও লোভ নেই আমার। আমি একথাও দিচ্ছি, যদি তুতানখামেনের গুপ্তধন আবিষ্কার করতে পারি, তার থেকে এককণাও আমি নেব না। আমাকে বিশ্বাস করুন!
লর্ড কার্নারভন শুনলেন না। পরদিনই চলে যাবেন ঠিক করলেন।
জিনিসপত্র বাঁধাছাদা হয়ে গেছে। ভোরে মোটরগাড়ি, খচ্চর, উট আর ঘোড়ার পিঠে সব নিয়ে অনুসন্ধানী দল রওনা দেবে। রাতে কার্টার মনমরা হয়ে ঘুরতে বেরিয়েছেন তাঁবু ছেড়ে।
জ্যোৎস্নারাত। আনমনে ঘুরতে-ঘুরতে কার্টার ফ্যারাও দ্বিতীয় রামেসিসের কবরের কাছে এসে দাঁড়াল। জনহীন উপত্যকায় ফিকে জ্যোৎস্না পড়ে আছে। হঠাৎ দেখল, একটা অস্পষ্ট মূর্তি রামেসিসের কবরের ধারে দাঁড়িয়ে আছে।
কার্টার বলল,–কে ওখানে?
অমনি নির্জন-নিশুতি রাত কাঁপয়ে একটা অট্টহাসি শোনা গেল। কার্টার চমকে উঠেছিল। কাঁপতে কাঁপতে বলল,-কে হাসছ এমন করে? কে তুমি?
জবাব এল, আমি তোমার প্রাণদাতা। হাসছি তোমার নির্বুদ্ধিতার জন্য।
–আমার প্রাণদাতা? তার মানে?
–ভিক্টোরিয়া পার্কে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। মনে পড়ে না?
কার্টার শিউরে ওঠে। কথা জড়িয়ে যায় মুখে। কোনওরকমে বলে,–আপনি বেন্নেস?
–হ্যাঁ, আমি সেই অভিশপ্ত কিশোর ফ্যারাও তুতানখামেনের প্রধান পুরোহিত বেন্নেস। শোনো কার্টার, তুতানখামেন কিশোর বয়সে দুর্বিনীত ছিল বলে তাঁকে দেবতারা অভিশাপ দিয়েছিলেন। তার আত্মা নরকযন্ত্রণায় হাজার-হাজার বছর ধরে কষ্ট পাচ্ছে। তার মুক্তি হতে পারে, যদি কোনও জীবিত মানুষ তাঁর নামে আত্মবলি দেয়। আর শোনো…।
এই পর্যন্ত শুনেই কার্টার অজ্ঞান হয়ে গেল।
যখন তার জ্ঞান ফিরল, তখন সকাল হয়ে গেছে। সূর্য উঠেছে। সে উঠে বসল। তারপর মনে পড়ল সবকথা। তখনই সেখান থেকে পালাবার জন্য উঠে দাঁড়াল। লর্ড কার্নারভনের দল হয়তো রওনা দিয়েছে। কিন্তু সে-মুহূর্তে তার চোখে পড়ল, রামেসিসের কবরের তিন-চার হাত দূরে একটা ফাটল দেখা যাচ্ছে এবং ফাটলের তলায় শক্ত পাথরের একটা ধাপ। ধাপে একটা মাছের রেখাচিত্র। রেখাচিত্রের মধ্যে একটা সংকেত আছে। সেই সংকেতচিহ্ন ডেভিসের পাওয়া হাঁড়ির গায়ে ছিল। তাহলে কি…
দেখামাত্র কার্টার ছুটে চলল তাঁবুর দিকে।
তখন তাঁবু গুটোনো হয়ে গেছে। লর্ডসায়েব ব্যস্ত হয়ে কার্টারকে খুঁজছেন। তার জন্যই রওনা দিতে দেরি হয়েছে।
কার্টার হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল,–পাওয়া গেছে! তুতানখামেনের কবরের খোঁজ পাওয়া গেছে।
ফ্যারাও রামেসিসের কবরের সেই ফাটলে একটা ধাপ থেকে নিচের দিকে চলে গেছে ষোলোটা ধাপ। শেষ ধাপের সামনে দেখা গেল একটা দরজা। এই সেই তুতানখামেনের সমাধিকক্ষ!
যুগ-যুগ ধরে এই সমাধিকক্ষের গুপ্তধনের কিংবদন্তি প্রচলিত। তুতানখামেনের মৃত্যুর পর নাকি প্রাসাদের সব ধনরত্ন মণিমাণিক্য তাঁর মমির সঙ্গে এখানে এনে রাখা হয়েছিল।
কেন? এর জবাবও পাওয়া যায় একটি ফলকে। দেবতাদের অভিশাপে কিশোর রাজা তুতানখামেন মারা যান। তাই পুরোহিতরা বিধান দিয়েছিলেন, রাজার প্রাসাদের সব ধনরত্নেরও অভিশাপের ছোঁয়া লেগেছে। ওই ধন যে ব্যবহার করবে, তারই অভিশাপ লাগবে এবং সাংঘাতিক রোগের কবলে পড়ে অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যাবে।
