সে জায়গাটা একেবারে নির্জন। একসময় সে তৈরি হয়ে উঠে দাঁড়ায়। গাছের ডালে মাফলার বেঁধে ফাস বানাবে এবং ঝুলে পড়বে।
গাছে চড়তে যাচ্ছে, হঠাৎ কে পিছন থেকে হো-হো করে হেসে উঠল। কার্টার চমকে উঠল। ঘুরে দেখল, একটা পাগলাটে চেহারার বুড়ো ভিখিরিগোছের লোক কখন এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে এবং তার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
কার্টার ক্ষোভে ও রাগে বলে উঠল, দাঁত বের করার কী আছে এতে?
বুড়ো বলল, আছে বইকী। আলবত আছে। এই তাজা জোয়ান বয়সে এমন মরার শখ দেখলে হাসি পাওয়ারই কথা।
কার্টার একটু অবাক হয়ে বলল,-মরতে যাচ্ছি কে বলল তোমাকে?
দেখেই বোঝা যায়। বুড়ো এসে কার্টারের কাঁধে হাত রেখে বলল,–শোনো বাছা, তোমাকে একটা ভালো খবর দিই। যে জন্যে মরতে যাচ্ছ, তার একটা সুব্যবস্থা হয়ে যাবে। তুমি এক্ষুনি চলে যাও লন্ডন মিউজিয়ামের অধ্যক্ষমশায়ের কাছে। গিয়ে বলল, বেসে আমাকে পাঠিয়েছেন। আমি ড্রইংয়ের কাজটা ভালোই পারি। ব্যস, দেখবে–তোমার চাকরি তো হয়েই যাবে, উপরন্তু এই থেকে তুমি একদিন পৃথিবীর নামী লোক হয়ে উঠবে। যাও, এক্ষুনি চলে যাও।
কার্টার হাঁ করে তাকিয়ে ছিল ওর মুখের দিকে। এসব কথা শুনে সে তো খুবই অবাক। এই লোকটা কেমন করে তার সব কথা জানল? কে এ?
লোকটার পোশাকের দিকে এতক্ষণে চোখ গেল কার্টারের। এমন অদ্ভুত পোশাকও তো সে কস্মিনকালে দেখেনি। পোশাকটা ছেঁড়াখোঁড়া এবং নোংরা বটে
–কিন্তু একসময় দামিই ছিল। কেমন একটা বিশ্রী দুর্গন্ধও নাকে লাগছে।
কার্টার বলল, তুমি নিশ্চয় পাগল-টাগল বটে। যাও, বিরক্ত কোরো না।
লোকটা ওঁর কাধ ছেড়ে দিয়ে ফের হো-হো করে হেসে বলল, ভাগ্যলক্ষ্মীকে পায়ে ঠেলতে নেই বাছা। যা বললাম, শুনলে বরাত খুলে যাবে। এখন মানা না মানা তোমার ইচ্ছা। বলে সে হনহন করে চলতে শুরু করল এবং ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে মিলিয়ে গেল।
কার্টার অবাক হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর তার মনে হল, দেখা যাক ওর কথা সত্যি না মিথ্যে।
সে পার্ক থেকে বেরিয়ে সোজা চলে গেল জাদুঘরে। সেখানে কর্মচারীদের কাছে জিগ্যেস করে জানল, সত্যি একজন ভালো ড্রইং-জানা লোক খোঁজা হচ্ছে।
কাটার অধ্যক্ষমশায়ের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পেল।
অধ্যক্ষ বললেন, কী চাই?
–বেন্নেস নামে এক বুড়ো ভদ্রলোক আপনার কাছে আসতে বললেন, তাই এলাম। আপনারা নাকি ড্রইং-জানা লোক খুঁজছেন। …কার্টার জানাল।
অধ্যক্ষ ভুরু কুঁচকে বললেন,–কে বললে?
–বেন্নেস ।
–বেন্নেস! সে আবার কে? কেমন চেহারা বলল তো?
কার্টার তার চেহারা ও পোশাকের মোটামুটি একটা বর্ণনা দিল। ঘরে অধ্যক্ষ এবং আরও জনাতিন ভদ্রলোক ছিলেন। তারা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিলেন। তাদের চোখেমুখে বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠেছে।
কার্টার বলল আপনি কি তাকে চেনেন না স্যার?
অধ্যক্ষ একটু হেসে বললেন, তুমি নিশ্চয় রসিকতা করছ, যুবক। একজন বেন্নেসকে আমি এবং এই ভদ্রমহোদয়রা চেনেন বটে, কিন্তু সে চেনাও মাত্র দিন দুই আগে। তবে…
ঘরের তিনজন ভদ্রলোকই হেসে উঠলেন। অধ্যক্ষকে থামতে দেখে কার্টার জিগ্যেস করলু,–তবে কী স্যার?
অধ্যক্ষ হঠাং টেবিলের সামনে ঝুঁকে ক্রুদ্ধস্বরে বলে উঠলেন,–এ রসিকতার অর্থ কী?
কার্টার অপ্রস্তুত হয়ে বলল, আমি রসিকতা করিনি স্যার। সত্যি বলছি, মাত্র কিছুক্ষণ আগে ভিক্টোরিয়া পার্কে ওঁর সঙ্গে দেখা হল। ঈশ্বরের দিব্যি।
ঘরের একজন ভদ্রলোক এবার বললেন,–শোনো ভাই, ব্যাপারটা খুলেই বলি। বেন্নেস নামে একজন পুরুত ছিলেন পাঁচ হাজার বছর আগে মিশরে। তিনি ছিলেন ফ্যারাও তুতানখামেনের পুরুত। সম্প্রতি দুদিন হল, ডেভিস নামে এক অভিযাত্রী মিশর থেকে কিছু জিনিস এনেছেন। তার মধ্যে কয়েকটা মাটির হাঁড়ি আছে। একটা হাঁড়ির ঢাকায় ওই বেনেসের সিলমোহর আছে এবং ভেতরে আছে তার পোশাক। রাজার শবযাত্রায় বেন্নেস সেই পোশাক পরেছিলেন। এবার বুঝতে পারছ তো, কেন অধ্যক্ষ ক্রুদ্ধ হয়েছেন?
কার্টার শিউরে উঠল। সর্বনাশ! তাহলে কি সেই বেলেসের ভূতের সঙ্গে তার পার্কে দেখা হল? কাঁধে হাত রেখেছিল যেখানে, সেখানটায় এতক্ষণ রক্ত জমে গেছে মনে হল। এর পর অতি কষ্টে এবং কাঁপতে কাঁপতে সে বলল, দয়া করে আমাকে বেন্নেসের পোশাকটা একবার দেখাবেন?
পোশাক পাশের একটা টেবিলেই ছিল। ওঁরা তিনজনেই পুরাতাত্ত্বিক। পরীক্ষা করছিলেন এতক্ষণ সেগুলো।
কার্টারকে পোশাক দেখিয়ে দিতেই কার্টার অস্ফুট চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেল।
সমসাময়িক পত্রপত্রিকা ও বইয়ের বিবরণে দেখা যায়, কার্টারকে লন্ডন জাদুঘর কর্তৃপক্ষ শেষপর্যন্ত ড্রইংয়ের কাজে নিযুক্ত করেছিলেন। তার কাজটা ছিল এই মিশরের ভ্যালি অব দি কিংস-এ পাওয়া অজস্র ফলকের চিত্রলিপি পুরাতাত্ত্বিকরা পেনসিলের স্কেচে নকল করতেন। কার্টার তাতে কালি বুলিয়ে স্পষ্ট করত। তারপর সেগুলো বিভিন্ন দেশের পণ্ডিতদের কাছে পাঠোদ্ধারের জন্য পাঠানো হতো।
কার্টারের মনে মিশরের প্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কে ক্রমশ তীব্র কৌতূহল জেগে উঠেছিল। তখন সে জাদুঘরে বসেই পড়াশোনায় মন দিল। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হল। চলল ১৯১৮ সাল পর্যন্ত। সেই ডামাডোলের মধ্যে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত চার বছর ধরে ড্রইং বিশারদ কার্টার মেতে রইল পুরোনো বই নিয়ে। প্রাচীন মিশর তাকে পেয়ে বসেছিল। বিশেষ করে পুরুত বেগ্নেসের সেই অত্যদ্ভুত আবির্ভাব কার্টারকে রহস্যের গোলকধাঁধায় ঘুরিয়ে মারছিল।
