লর্ড কার্নারভন তখনই অল্প কিছু খেয়ে নিয়ে তার মোটর গাড়িটি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। লন্ডনের দিকে প্রচণ্ড গতিতে চলতে থাকল তাঁর গাড়ি।
মাইল দশেক চলার পর হঠাৎ গাড়ির কলকবজা বিগড়ে গেল। ভাগ্যিস একটু তফাতে একটা গ্যারাজ ছিল। গ্যারাজের লোকেরা ঠেলতে-ঠেলতে নিয়ে গেল। গাড়ি সারিয়ে চালু করতে ঘণ্টা তিনেক লেগে গেল।
গ্যারাজের মালিক একটু হেসে বলল, আজ দিনটা শুভ নয়। মশাই, বেরোবার আগে কি তারিখটা লক্ষ করেননি? আজ অপয়া তেরো। আনলাকি থার্টিন।
লর্ড কার্নারভন রেগে বললেন, ওসব আমি মানি নে হে, বুঝলে?
লোকটা মুচকি হেসে বলল, ঠিক আছে। ভালোয়-ভালোয় পৌঁছন, এই ইচ্ছে করতে আপত্তি নেই। তবে কিছু বেগতিক ঘটলে আমাকে যেন শাপ দেবেন না।
লর্ড কার্নারভন আবার স্টিয়ারিং ধরে স্পিড বাড়িয়ে দিলেন গাড়ির।
লন্ডনের আধাআধি পথ এসেছেন, আবার হঠাৎ ঘড়ঘড় করতে করতে থেমে গেল গাড়ি। আবার গ্যারাজ খুঁজতে বেরোতে হল। সঙ্গে চাকর না নিয়ে এসে ভুল করেছেন। এখন আর পস্তানো বৃথা।
যাই হোক, এইভাবে রাস্তায় দুবার গাড়ি বিগড়ে যাওয়ায় লন্ডন পৌঁছতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল তার।
সন্ধ্যার মুখে কুয়াশা ঘন হয়ে উঠেছে। বাতি জ্বলেছে সদ্য। কিন্তু রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। আজ আর জাদুঘরে ঢোকা যাবে না। কখন বন্ধ হয়ে গেছে। বিরক্তমুখে লর্ড কার্নারভন গাড়ি চালাচ্ছেন।
একসময় হঠাৎ দেখতে পেলেন, সামনে আবছা একটা গাড়ি আসছে। গাড়িটা ঘোড়ার গাড়ি। দেখতে-দেখতে গাড়িটা এসে পড়ল।
কিন্তু আতঙ্কে লর্ড কার্নারভন দেখলেন, ঘোড়ার গাড়িটা তার গাড়ির দিকেই সোজা ছুটে আসছে। জোরে হর্ন বাজালেন। কিন্তু না–এই এসে পড়ল। লর্ড কার্নারভন ব্যস্ত হয়ে গাড়ির মুখ ঘুরিয়েই ব্রেক চাপলেন।
সঙ্গে-সঙ্গে তার গাড়ি উল্টে গিয়ে পাশের একটা খানায় পড়ল। প্রচণ্ড আঘাতে অচৈতন্য হয়ে পড়লেন তিনি।
লোকজন দৌড়ে এল চারপাশ থেকে। ততক্ষণে ঘোড়ার গাড়িটা কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেছে। তারা সাংঘাতিক আহত লর্ড কার্নারভনকে হাসপাতালে পৌঁছে দিল।
লর্ড কার্নারভনের জ্ঞান ফিরল তিন দিন পরে।
কিন্তু তারপর তিনি যা বললেন, শুনে তো ডাক্তাররা উদ্বিগ্ন হয়ে ভাবলেন– এই রে! দুর্ঘটনার ধাক্কায় লর্ডসায়েবের মাথার গোলমাল হয়ে গেছে!
লর্ড বললেন,–ঘোড়ার গাড়িটার ঘোড়াগুলো কালো রঙের। কোচোয়ানের পরনে ছিল প্রাচীন মিশরের পোশাক। আরোহীকে অস্পষ্টভাবে দেখেছি। মনে হয়েছে, তার মাথায় ফ্যারাওয়ের মুকুট ছিল।
হাউস অব লর্ডসের সদস্য বলে কথা। তার চিকিৎসার কোনও ত্রুটি হবে বা। তাকে নিয়ে যাওয়া হল মানসিক ব্যাধির ওয়ার্ডে। খ্যাতিমান মনস্তত্ত্ববিদ ডাক্তাররা নানাভাবে পরীক্ষা করে দেখে বললেন, নাঃ। লর্ড সম্পূর্ণ সুস্থ এবং স্বাভাবিক। তবে সেই ঘোড়ার গাড়ির ব্যাপারটা যেভাবে বর্ণনা করছেন, তাতে বোঝা যায় উনি তখন হ্যাঁলুসিনেশন-এ আচ্ছন্ন ছিলেন অর্থাৎ চোখের ভুল। মিশরসংক্রান্ত খবর পড়ে দ্রুত লন্ডনে ফিরে আসছিলেন এবং সারাপথ মাথায় ওই চিন্তা ছিল। তাই কুয়াশা এবং আবছা অন্ধকারে ঘোড়ার গাড়িটা দেখে ওই ভুল করে ফেলেছেন। ভুলের ফলেই উনি সাত তাড়াতাড়ি ব্রেক চাপেন এবং গাড়ি স্বাভাবিকভাবেই উল্টে যায়। এমনও হতে পারে, হ্যাঁলুসিনেশন-এর ফলে আতঙ্কে গাড়িটা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন খানার দিকে।
লর্ড কার্নারভন সুস্থ হয়ে বাড়ি ঢুকলেন। কিন্তু এবার তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা তাঁকে পরীক্ষা করে দেখে বললেন,–সামনের শীতকালটা আপনার শরীরের পক্ষে বিপজ্জনক হওয়ার আশঙ্কা আছে। তাই ওই সময় আপনার কোনও গ্রীষ্মপ্রধান দেশে গিয়ে থাকা উচিত।
বন্ধুরা পরামর্শ দিলেন ভারতে যেতে। কিন্তু লর্ড কার্নারভন আনন্দে নেচে উঠলেন। মিশরও তো গ্রীষ্মপ্রধান দেশ। তিনি মিশরেই যাবেন।
নিছক বেড়াতে যাবেন না। রথ দেখা কলা বেচার মতো মিশরে গিয়ে পুরাতাত্ত্বিক অভিযানে নামবেন। সেই রাজরাজড়ার উপত্যকায় তন্নতন্ন অনুসন্ধান চালাবেন। কোথায় ডেভিস হাঁড়িগুলো পেয়েছিল, খুঁজে বের করবেন। মাটি খুঁড়তে তো হবেই। এজন্য লোকজন দরকার। অভিজ্ঞ তদারককারীও চাই।
এজন্য প্রচুর টাকা দরকার। ইংলন্ডের দরবার থেকে অনুমতিও দরকার। লর্ড কার্নারভনের দুটোরই কোনও অসুবিধা ছিল না।
তিনি সদলবলে মিশরের ভ্যালি অফ দি কিংস-এ গিয়ে তাঁবু পাতলেন।…
এদিকে যেদিন লর্ড কার্নারভন দুর্ঘটনায় আহত হন, সেদিনই আরেকটি বিচিত্র ঘটনা ঘটেছিল।
হাওয়ার্ড কার্টার নামে এক যুবক চাকরির খোঁজে হন্যে হয়ে বেড়াচ্ছে। লেখাপড়া মোটামুটি করেছে। কিন্তু তার ঝোঁক ছবি আঁকাতে। বিশেষ করে ড্রইংয়ে তার হাত বেশ পাকা। তখনকার দিনে কলকারখানার ব্যাপারে ড্রইং জানা লোকের দরকার হতো, এখনও হয়। কিন্তু নিছক ড্রইংয়ে হাত থাকলেই তো চাকরি পাওয়া যায় না। ইঞ্জিনিয়ারিং বা কারিগরি বিদ্যাও পেটে থাকা চাই। কার্টারের সেসব কিছু ছিল না।
১৯১৩ সালের ১৩ই এপ্রিল কার্টার মনমরা হয়ে বসে আছে ভিক্টোরিয়া পার্কে, একটা গাছের তলায়। হতাশায় সে ভেঙে পড়েছে। মনে-মনে সংকল্প করছে, আত্মহত্যা করে বেকারজীবনের যন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি খুঁজে নেবে।
