এই উপত্যকায় ঘুরতে-ঘুরতে ডেভিস হঠাৎ একটা ধ্বসেপড়া টিলার ফাটলে কয়েকটা হাঁড়ি দেখতে পান। হাঁড়িগুলো পোড়ামাটির। গায়ে চমৎকার কারুকার্য আছে। মুখের ঢাকনা সিল করা। সিলমোহরে যাঁদের নাম আছে, তারা কিন্তু ফ্যারাও নন, পুরুতঠাকুর।
প্রাচীন মিশরে দেবদেবীদের পূজারি পুরুতঠাকুররা খুব প্রতাপশালী ছিলেন। ফ্যারাও তাদের পরামর্শেই চলতেন। ডেভিসের কুড়িয়ে পাওয়া হাঁড়িতে যাঁদের সিলমোহর আছে, তাঁরা তুতানখামেন নামে এক রাজার পুরুত।
এই তুতানখামেন নামটা থাকায় লন্ডনের পণ্ডিতমহলে হইচই পড়ে গেছে। তুতানখামেন ছিলেন বয়সে কিশোর এক ফ্যারাও সিংহাসনে বসার পর মাত্র কিছু দিনের মধ্যেই তিনি মারা যান।
পুরোনো আমলের গ্রিক পণ্ডিতদের পুঁথিতে তার কথা জানা গিয়েছিল। তাছাড়া ওই রাজরাজড়ার উপত্যকায় প্রাচীন ফ্যারাও যুগের যেসব ফলক পাওয়া গিয়েছিল, তাতে তাঁর উল্লেখ ছিল।
কিন্তু ওই উপত্যকা তন্নতন্ন করে খুঁজে তার কবর বা মমি পাওয়া যায়নি। অমন তন্নতন্ন করে খোঁজার একটা কারণ ছিল। গ্রিক পণ্ডিতদের লেখায় তো বটেই, সেই পুরোনো ফলকেও স্পষ্ট করে উল্লেখ ছিল, তুতানখামেনের মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ সে-আমলের প্রথা অনুসারে মমি করা হয় এবং মমির সঙ্গে সমাধিকক্ষে অজস্র মণিমুক্তা-হীরাজহরতও রাখা হয়। বলা বাহুল্য, এই গুপ্তধনের লোভেই অত খোঁজাখুঁজি।
শুধু পুরাতাত্ত্বিক পণ্ডিতরা নন, অনেক ধনলোভী দুর্দান্ত প্রকৃতির মানুষ, এমনকী, চোর-অকাতরাও রাজরাজড়ার উপত্যকা চষে ফেলেছে। কিন্তু তুতানখামেনের কবরের কোনও হদিশ পায়নি কেউ।
শেষে সবাই ধরে নিয়েছিল, তুতানখামেন নামে কোনও ফ্যারাও ছিলেনই না। ওটা স্রেফ বানানো গল্প।
কিন্তু ডেভিসের পাওয়া হাঁড়িতে তুতানখামেনের পুরুতদের সিলমোহর পাওয়া গেল এতদিনে। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, সত্যি ওই নামে একজন ফ্যারাও ছিলেন।
তার চেয়ে বড় কথা, হাঁড়িগুলোর সিল ভেঙে ঢাকনা খোলা হয়েছে লন্ডন জাদুঘরে। ডেভিস ওগুলো জাদুঘরে জমা দিয়েছেন। ইংলণ্ডের আইনের এই রীতি। পৃথিবীর যেখানেই হোক, কোনও ইংরেজ বা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রজা প্রাচীন কোনও জিনিস কুড়িয়ে পেলে কিংবা উদ্ধার বা আবিষ্কার করলে তা জাদুঘরে জমা দিতেই হবে। নয়তো জেল খাটতে হবে। ডেভিস তাই ওগুলো জমা দিতে বাধ্য হয়েছেন।
এখন দেখা যাচ্ছে, হাঁড়ির ভেতরে ভাঁজ করা পোশাক রয়েছে। এই পোশাক পুরুতরা রাজার শবযাত্রার সময় পরতেন।
তার মানে, তুতানখামেনের মৃত্যুর পর তাকে কবরে নিয়ে যাওয়ার সময় পুরুতরা এই পোশাক পরেছিলেন। তারপর প্রথামত সেগুলো খুলে হাঁড়িতে ভরেছিলেন। মুখে সিল এঁটে দিয়েছিলেন। তাহলে নিশ্চয় তুতানখামেনের কবরও কোথাও আছে।
ডেভিস যেখানে হাঁড়িগুলো পেয়েছেন, তারই কাছাকাছি কোথাও আছে। অথচ ডেভিস তা না খুঁজে হাঁড়িগুলো নিয়েই মিশর থেকে চলে এসেছেন।
কেন চলে এসেছেন?
লন্ডন মিউজিয়ামের অধ্যক্ষ বলেছেন, ডেভিস যখন রাতদুপুরে আমার বাড়িতে এসে আমার ঘুম ভাঙিয়ে ওঠাল, তখন আমি ওর চেহারা দেখে অবাক হলাম। কী যেন আতঙ্কে ঠকঠক করে কাঁপছে। আমি প্রশ্ন করে তার মুখে বেশিকিছু জানতে পারলাম না। শুধু কোনওরকমে বলল, এগুলো ভুতুড়ে জিনিস। এর মধ্যে ভূতপ্রেত আছে।
মিশর থেকে লন্ডন অবধি আনতে তার নার্ভের চূড়ান্ত হয়েছে তাই এ আপদ বিদায় করে বাঁচতে চায়। এই বলে ডেভিস তক্ষুনি চলে গেল। আমি হাঁড়িগুলো সাবধানে একটা ঘরে তালাবন্ধ করে রাখলাম। পরদিন সকালে শুনি, ডেভিস রাস্তায় মরে পড়ে আছে। তার লাশ মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ডাক্তাররা মৃত্যুর তেমন কোনও কারণ খুঁজে না পেয়ে বলেছেন, হার্টফেল। আমার অবাক লাগে, দৈত্যের মতো বলশালী এবং দুঃসাহসী মানুষ ডেভিস। তার বিচিত্র কীর্তিকলাপের কথা কে না জানেন! অথচ সে হঠাৎ হার্টফেল করে রাতারাতি মারা পড়ল। এবং আমার কাছ থেকে যাওয়ার পরেই! এর কোনও মাথামুণ্ড খুঁজে পাচ্ছি না। ব্যাপারটা রহস্যময়। পুলিশের গোয়েন্দা দফতর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের লোকেরা অবশ্য তদন্ত করে দেখছে।
সাংবাদিকরা অধ্যক্ষকে প্রশ্ন করেন, আচ্ছা স্যার, হাঁড়িগুলো আপনার জিম্মায় আসার পর কোনও অদ্ভুত কিছু ঘটেছে কি?
অধ্যক্ষ বলেন,–না। ওগুলো আমি যথারীতি পরদিনই জাদুঘরে নিয়ে গিয়ে রেখেছি। কিন্তু সেখানেও কোনও ভুতুড়ে ব্যাপার ঘটেনি। নানা দেশের সেরা পুরাতাত্ত্বিক পণ্ডিতদের হাঁড়িগুলো এবং পুরুতদের পোশাক-আশাক পরীক্ষা করে দেখতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তাঁরা এখন এ কাজে ব্যস্ত।…
লর্ড কার্নারভন ইলাস্ট্রেটেড লন্ডন নিউজের এই বিস্তারিত খবরটা পড়ে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন।
তুতানখামেন সম্পর্কে জানার জন্য তার কৌতূহল অনেকদিনের। প্রচুর পুঁথিপত্র হাতড়েছেন। ইউরোপ ও আমেরিকার জাদুঘরে বা পুরাদ্রব্যের সংগ্রহশালায় গিয়ে খোঁজাখুঁজি করেছেন। রোমের প্রখ্যাত আর্কাইভে পুরোনো পুঁথিশালায় পাঁচ বছর ধরে পুঁথি পড়ে এসেছেন–যদি তুতানখামেনের কবরের কোনও খোঁজখবর পান!
কিন্তু পাননি। এতদিন ডেভিস যদি বা একটা ক্ষীণ সূত্র পেল, সে অতর্কিতে মারা পড়ল। ঠিক কোন জায়গায় ওগুলো পাওয়া গেছে, তার মুখেই জানা যেত। কিন্তু সে রাস্তা একেবারে বন্ধ হয়ে গেল।
