ভন্তুমাস্টার গর্জন করলেন, একটি চৌবাচ্চায় দশ গ্যালন জল ধরে। সেই চৌবাচ্চায় একটি ছিদ্র আছে। ছিদ্র দিয়া–
ফকিরবাবার খবর ততক্ষণে রটে গেছে। একজন-দুজন করে লোকের ভিড় জমতে শুরু করেছে। কলার পাতায় ফলার সেরে ফরিবাবা যখন ভূত ধরতে বেরোলেন, তখন তার পেছনে বিশাল মিছিল। ভন্তুমাস্টারকে খুঁজে পেলাম না আর। সেই ফাঁকে আমিও দৌড়ে গিয়ে মিছিলে ঢুকে পড়লাম। দেখলাম কেতো আর টোটোও এসে গেছে কখন।
ষষ্ঠীতলার কিছু আগে, রাস্তায় ফকিরবাবা তার প্রকাণ্ড লোহার চিমটে দিয়ে দাগ এঁকে বললেন,–খবরদার, খবরদার, এই দাগ পেরিয়ে কেউ যেন আসবে না। দাগ পেরিয়েছ কী মরেছ। খবরদার, খবরদার!
ফকিরবাবা ষষ্ঠীতলার পেছনের জঙ্গলে উধাও হয়ে গেলেন। সবাই চুপ করে আছে। শুনলাম, মিত্তিরমশাই মুচকি হেসে চুপিচুপি ভেঁটুবাবুকে বলছেন, রামবাবুর বাঁশবনের বেহালাদারকে পেলে হয়। মহা ধূর্ত। খাল পেরিয়ে হয়তো সিঙ্গিমশাইয়ের বাঁশবনে গিয়ে ঢুকে পড়েছে।
সিঙ্গিমশাই পেছনেই ছিলেন। বলে উঠলেন,–বাজে কথা বোলো না মিত্তির! আমার বাঁশবনে কে আছে তা জানো?
তর্কাতর্কি বেধে গেল। অন্যেরা চুপ! চুপ! বলে থামানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু সিঙ্গিমশাইকে থামানো শক্ত। শেষপর্যন্ত ফকিরবাবাকে ষষ্ঠীতলায় ফিরতে দেখে তর্কাতর্কি থেমে গেল। ফকিরবাবার কাঁধের তাপ্লিমারা রংবেরঙের ঝুলিটি এখন প্রায় পুঁটুলি হয়ে উঠেছে। সামনে এসে তিনি বললেন,-চললাম এবার পদ্মাপারে। ফিরে এসে আবার ফলার খাব।
মুখে ঝলমলে হাসি। প্রকাণ্ড পুঁটুলি হয়ে ওঠা ঝুলিটি খুব নড়ছিল। মিছিল করে গাঁয়ের লোকেরা ওঁর পেছন-পেছন চলল। গাঁয়ের শেষে মল্লিকদের আমবাগানের ধারে পিচরাস্তা। ফকিরবাবা পিচরাস্তায় উঠলে আমার চোখে পড়ল, ওঁর পিঠের দিকে তাপ্লিমারা ঝুলি ফুঁড়ে কালো কুচকুচে তিনটে আঙুল বেরিয়ে আছে। খুব নড়ছে আঙুল তিনটে। টা-টা বাই বাই করছে কি তিন-আঙুলে দাদা?
দেখে কষ্ট হল। বেশ তো ছিল তিন-আঙুলে। বেচারামকে জব্দ করেছিল। কাতুকুতুকে জব্দ করেছিল। ঠাকুমা কী যে করেন! ভ্যাট!
কিছুদিন পরে এক সকালে ভন্তুমাস্টার আমাকে আঁক কষাচ্ছেন। ঠাকুমা ফুলগাছের সেবাযত্ন করছেন। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন,–অ্যাই হতচ্ছাড়া! ভালো হবে না বলছি! রেখে যা। রেখে যা।
ভন্তুমাস্টার বললেন,–কী হল মাসিমা?
ঠাকুমা বাগানের বেড়ার দিকে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। অ্যাই বাঁদর! খুরপি দিয়ে যা। নইলে আবার ফকিরবাবাকে খবর পাঠাব।
ভন্তুমাস্টার আবার বললেন,–কী হল মাসিমা?
ঠাকুমা ঘুরে প্রায় আর্তনাদ করে বললেন,–ও ভন্তু, ও পুঁটে, আমার খুরপি নিয়ে পালাচ্ছে। ধরো, ধরো!
–কে খুরপি নিয়ে পালাচ্ছে মাসিমা?
–তিন-আঙুলে। শিগগির ওকে ধরো।
ভন্ডুমাস্টার দৌড়ে গেলেন। আমিও দৌড়লাম। বাগানের বাইরে খুরপিটা পড়ে থাকতে দেখা গেল। ভন্তুমাস্টার খুরপিটা কুড়োতে গিয়েই উঁহু হু হু করে পিছিয়ে এলেন। তারপর কানে হাত বুলোতে-বুলোতে বললেন, উঁহু হু হু, বড় জ্বালা করছে যে। ও পুঁটু, আমার কানটা আছে না নেই দ্যাখ তো বাবা!
হাসি চেপে বললাম, আছে মাস্টারমশাই!
ভন্তুমাস্টার কানে হাত চাপা দিয়ে বললেন,–কোবরেজমশাইয়ের কাছে মলম লাগিয়ে আনি। উঁহু হু হু! তারপর টাট্টুঘোড়ার মতো উধাও হয়ে গেলেন।
তিন-আঙুলে ফকিরবাবার ঝুলি ফুঁড়ে পালিয়ে এসেছে জেনে আমার খুব আনন্দ হচ্ছিল। বললাম,–তিন-আঙুলে দাদা! ঠাকুমার খুরপিটা আমি কুড়োচ্ছি। আমার কান মুলে দেবে না তো?
না। তিন-আঙুলে আমার কান মলে দিল না। খুরপিটা কুড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ঠাকুমাকে দিলাম। ঠাকুমা খুশি হয়ে বললেন, তিন-আঙুলে ফিরে এসেছে যখন, তখন থাক। গা-গেরামে দু-একটা ভূত না থাকলে চলে? তবে নাককাটাটা বড্ড বোকা। সেও পালিয়ে আসতে পারত। তাই না পুঁটু?
তুতানখামেনের গুপ্তধন
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের বছর। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই এপ্রিল। লন্ডন শহর থেকে প্রায় ষাট মাইল দূরে একটি ছোট্ট সুন্দর গ্রাম ব্লুবার্ড। সেখানে ছুটি কাটাচ্ছেন লর্ড কার্নারভন। ইংলন্ডের হাউস অব লর্ডসের একজন সম্মানিত সদস্য তিনি। তাঁর গ্রামের এই বাড়িটির নাম ইজিপ্ট। ইজিপ্ট বা মিশর নামে বাড়ির নাম রাখার কারণ, লর্ড কার্নারভন একজন পুরাতত্ত্ববিদ এবং বিশেষ করে মিশরের প্রাচীন সভ্যতা নিয়ে খুব মাথা ঘামান। মমি, পিরামিড এবং আরও নানান বিস্ময়কর কীর্তির প্রতি তাঁর কৌতূহলের শেষ নেই।
ইজিপ্টের বারান্দায় বসে সেদিন তিনি খবরের কাগজ পড়ছিলেন।
সেদিনকার ডাকে একটি পত্রিকা এসেছে। ইলাস্ট্রেটেড লন্ডন নিউজ। তার একটা বিশেষ খবর তিনি খুব মন দিয়ে পড়ছিলেন।
ডেভিস নামে একজন খামখেয়ালি দুর্দান্ত প্রকৃতির মানুষ আছেন লন্ডনে। প্রায়ই তিনি দুর্গম জায়গায় দুঃসাহসিক অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে পড়েন। কমাস আগে ডেভিস আফ্রিকার কঙ্গো অঞ্চলের গহন অরণ্যে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ঘুরতে-ঘুরতে পরে মিশরে আসেন। মিশরে এসে সম্প্রতি তিনি প্রাচীন কিছু জিনিস দৈবাৎ কুড়িয়ে পেয়েছিলেন।
মিশরের একটা রুক্ষ পাহাড়ি অঞ্চলে মাটির তলা থেকে প্রাচীন রাজা বা ফ্যারাওদের কবর, মমি ইত্যাদি আবিষ্কৃত হয়েছে। পুরাতাত্ত্বিকরা এই অঞ্চলের নাম দিয়েছেন ভ্যালি অব দি কিংস অর্থাৎ রাজরাজড়ার উপত্যকা।
