না বলে পারলাম না, ঠাকুমা, তুমি বুঝি ভূত জব্দ করতে পারো?
ঠাকুমা চোখ কটমটিয়ে বললেন, স্কুলের সময় হয়ে এল। চান করতে যাও।
সেদিনই স্কুলের ছুটির পর ফুটবল খেলে কেতো আর টোটোর সঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে কেনারাম-বেচারামের গল্প শোনাচ্ছিলাম। খালের সাঁকোর কাছে এসে টোটো বলল, আজ এসপার-ওসপার করে তবে বাড়ি যাব। পুঁটু, আমার বই-খাতা ধর। কেতো, সেদিনকার মতো পুঁটুকে জাপটে ধরবিনে বলে দিচ্ছি। এক কিকে তোকে মাঠে ফেরত পাঠাব, হ্যাঁ!
কেতো ভয়েভয়ে বলল,–তোর প্ল্যানটা কী?
টোটো চাপা গলায় বলল,-তোরা ওই শিবমন্দিরের আড়ালে ঘাপটি মেরে বসে থাকবি। আমি ষষ্ঠীতলার গাছে উঠে ওত পাতব। মনে হচ্ছে, তিন-আঙুলে বেচুদার বিস্কুটের লোভে ওই গাছে উঠবে। বেচুদা তো ওখান দিয়েই যাবে। ক্লিয়ার?
কেতো বলল,–টোটো, তিন-আঙুলে যদি তোকে গাছ থেকে ঠেলে ফেলে দেয়?
টোটো ঘুসি দেখিয়ে বলল,–একখানা আপারকাট অ্যায়সা মারব যে, তিন আঙুলে এসে খালের জলে পড়বে।
বেলা পড়ে এসেছে। নিরিবিলি খালের দুধারে গাছপালা কালো হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। পাখিদের হা কমে যাচ্ছে। ভাঙা শিবমন্দিরের আড়ালে কেতের সঙ্গে চলে গেলাম। ষষ্ঠীতলায় একটা ঝাকড়া বটগাছ। টোটো গাছে উঠে গেল। তারপর আর সময় কাটতে চায় না। আঁধারে সব অস্পষ্ট হয়ে গেছে। বুক ঢিপঢিপ করছে অজানা ভয়ে। গোঁয়ার টোটোর পাল্লায় পড়ে কী বিপদ কোনদিক থেকে এসে যাবে, কে জানে! পোকামাকড়ের ডাক বেড়ে গেল এতক্ষণে। জোনাকি জ্বলতে দেখছিলাম এখানে ওখানে। কেতো ফিসফিস করে বলল, পুঁটু, বেচুদা এখনও ফিরতে না কেন রে?
সেই সময় ষষ্ঠীতলার গাছের ওপর টোটোর চেঁচানি শোনা গেল। অ্যাই! কী হচ্ছে? হি হি হি হি…আবার?…হি হি হি হি…আরে, মরে যাব!…হি হি হি…ওরে বাবা। হি হি হি হি…
তারপর ধপাস শব্দ। চেঁচিয়ে উঠলাম,-টোটো! টোটো।
–হি হি হি হি…মরে যাব! সত্যি! হি হি হি হি…ওরে বাবা! হি হি হি হি… বললাম,-কেতো! আয় তো দেখি।
কেতো পাছে আমাকে জাপটে ধরে, তার সঙ্গে দূরত্ব রেখে দৌড়ে গেলাম। গিয়ে দেখি, টোটো হি হি হি হি করে হাসতে-হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কেতো বলল,–সর্বনাশ। টোটো কাতুকুতুর পাল্লায় পড়েছে। পালিয়ে আয় পুঁটু!
কেতো পালানোর আগেই গাছ থেকে পাতা খসে পড়ার মতো কেউ পড়ল এবং কেমন বিচ্ছিরি গলায় বলে উঠল,-চোখ গেলে দেব! কান মলে দেব। ছাড় হতভাগা!
টোটোর হাসি থেমে গেল। সে ফোঁস-ফোঁস করে হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে দাঁড়াল। তারপর সটান উধাও হয়ে গেল। কেতো আমাকে জাপটে ধরে বলল–পুটু, এবার কী হবে?
গাছ থেকে সদ্য লাফিয়ে পড়া ছায়ামূর্তি তেমনই বিদঘুঁটে গলায় বলল, তিন-আঙুলে থাকতে ভয় কী খোকাবাবুরা? কাতুকুতু ব্যাটাচ্ছেলে আমাকে দেখেই পিঠটান দিয়েছে।
কেতো কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,–তু-তুমি তি-তিন-আঙুলে?
ছায়ামূর্তি একটা হাত তুলল। আঁধারে স্পষ্ট দেখলাম তার হাতে মোটে তিনটে আঙুল। সে সেই তিনটে আঙুল নেড়ে বলল,–শিগগির কেটে পড়ো তোমরা, বেচারাম আসছে। আমার বড্ড খিদে পেয়েছে।
খালের দিকে টর্চের আলোর ঝলক। কেতো বলল,–পুঁটু, চলে আয়। বেচুদা জব্দ হোক। ও বিস্কুটের ডবল দাম নেয়, তা জানিস? তিন-আঙুলে দাদা, আজ ওর ঝাঁকাসুদু তুলে নিয়ো।
তা আর বলতে? –বলে তিন-আঙুলে তড়াক করে গাছে উঠে গেল।
আমরা হনহন করে হাঁটতে থাকলাম। বাড়ির আশেপাশে কাতুকুতু গিয়ে লুকিয়ে থাকলে কী করব, সে একটা ভাবনা। তবে সে কাতুকুতু দিলেই ঠাকুমাকে চেঁচিয়ে ডাকব। নয়তো তিনআঙুলে দাদা তো আছেই।
কেতো চাপা গলায় বলল,–তিন-আঙুলে দাদা কিন্তু খুব ভালো। তাই না রে? টোটোকে কাতুকুতুর হাত থেকে না বাঁচালে কী হতো বল?
সায় দিতে যাচ্ছি, কাছাকাছি কেউ হাজ্জো করে হেঁচে উঠল। তারপর আর সেই হাঁচি থামতে চায় না। চেঁচিয়ে ডাকলাম,-ঠাকুমা, ঠাকুমা!
অমনি হাঁচি থেমে গেল। ঠাকুমাকে ওরা এত ভয় পায় কেন?
পরদিন সকালে পড়তে বসেছি, এমন সময় দেখি, কেনারাম-বেচারাম দুই ভাই এক আলখাল্লাধারী ফকিরকে সঙ্গে নিয়ে হাজির। ঠাকুমা হাসিমুখে ডাকলেন,–এসো! বাবা এসো! তোমার জন্য কতদিন থেকে পথ চেয়ে বসে আছি। আসছ না দেখে কিনু আর বেচুকে পাঠিয়েছিলাম।
বেচারাম বলল,–তিন-আঙুলে কাল সন্ধ্যায় আমার আঁকাসুদু তুলে নিয়েছে। আগে ওই ব্যাটাচ্ছেলেকে জব্দ করুন ফকিরবাবা!
কেনারাম বলল, না। আগে নাক কাটাকে।
ফকিরবাবা বিড়বিড় করে মন্তর আওড়াতে আওড়াতে বাগানের মাটিতে বসলেন। তারপর একটু হেসে ঠাকুমাকে বললেন, বেটি, সেবার তোকে বলেছিলাম শয়তানদের এই ঝুলিতে ভরে পদ্মার ওপারে ফেলে দিয়ে আসি। তুই বললি, না, না, গঙ্গা পার করে দিলেই যথেষ্ট। এখন দ্যাখ বেটি, ওরা গঙ্গা পেরিয়ে আবার ফিরে এসেছে। পদ্মাপারে দেশের বর্ডার। বর্ডার পেরনোর ঝক্কি আছে। বুঝলি কিছু? পাসপোর্ট-ভিসার হাঙ্গামা আছে না?
ঠাকুমা হাসলেন। বুঝেছি বাবা, খুব বুঝেছি। এবার তুমি ওদের পদ্মাপার করেই দিয়ে এসো।
মুচকি হেসে ফকিরবাবা বললেন, আগে দই-চিড়ে-কলা দে বেটি! ফলার করি। তারপর হচ্ছে।
ভন্তুমাস্টার বললেন, কিন্তু ফকিরবাবা, শুনেছি বর্ডারে ঘুষ দিলে নাকি পেরনো যায়।
ঠাকুমা চোখ পাকিয়ে বললেন,–ভন্তু, পুটুকে আঁক কষাও।
