–হুঁ। শুনেছি পকেটমার ছিল। বাবুগঞ্জের হাটে ধরা পড়ে নাকি ওই অবস্থা।
ভন্তুমাস্টার বলে উঠলেন,–আমি স্বচক্ষে দেখেছিলাম মাসিমা। মারের চোটে একখানা হাত ভেঙে গিয়েছিল। অন্য হাতের আঙুলের দুটো হাড় গুড়ো হয়ে গিয়েছিল। হাসপাতালে সেই হাতখানা আর অন্য হাতের দুটো আঙুল কেটে বাদ দিয়েছিলেন ডাক্তারবাবুরা। সেইজন্যই তো তিন-আঙুলে নাম হয়েছিল।
ঠাকুমা চোখ কটমটিয়ে বললেন,–ভন্তু, পুঁটুকে আঁক কষাও। হাফইয়ারলিতে আঁকে গোল্লা পেয়েছে।
ভন্তুমাস্টার ঘুরে গর্জন করলেন।–একটা বানর ছয় ফুট উচ্চ খুঁটিতে উঠিবার চেষ্টা করিতেছে। মিনিটে ছয় ইঞ্চি উঠিয়া দুই ইঞ্চি নামিয়া যাইতেছে। এইরূপে ছয় ফুট উঠিতে তাহার কতক্ষণ সময় লাগিবে?
আমার কান ঠাকুমা এবং বেচারামের দিকে। বেচারাম বলল,–মাথার আঁকায় যে টান পড়েছিল দিদিঠাকরুন!
ঠাকুমা বললেন,–তুই ওকে দেখতে পেলি?
–নাহ। ঘুরঘুঁটে আঁধার। তার ওপর টিপটিপিয়ে বিষ্টি। ষষ্ঠীতলা কেমন জায়গা তা তো জানেন।
তুই এখন আয় বেচু। আমি দেখছি কী করা যায়। বলে ঠাকুমা একটা ফুলগাছের মাটিতে খুরপির কোপ বসালেন। বেচারাম তুষোমুখে চলে গেল।
বানরটাকে খুঁটির ডগায় ভমাস্টার চড়াতে পারলেও আমি পারলাম না। ষষ্ঠীতলার পর একটা খাল আছে। খালের ওপর কাঠের সাঁকো। ওই পথেই আমাকে রোজ স্কুল যেতে-আসতে হয়। ছুটির পর স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলে বাড়ি ফিরতে আঁধার ঘনিয়ে আসে। খালটা গ্রামের শেষদিকটায়। এ পাড়ায় আমার স্কুলের সঙ্গী বলতে কেতো আর টোটো। টোটো ব্যাকে খেলে। কেতো গোলে। আমি কোনও কোনওদিন হাফব্যাকে চান্স পাই। কিন্তু টোটো যতই গোঁয়ার হোক, ওর ওপর ভরসা রাখা কঠিন। খুব দৌড়বাজ যে! বেগতিক দেখলেই উধাও হয়ে যায়।
আর কেতোর স্বভাব হল ভয় পেলেই আমাকে জাপটে ধরা। ভাবনায় পড়ে গেলাম।
আমাদের গাঁয়ে অনেকরকম ভূত আছে জানতাম। কিন্তু কখনও তাদের সামনাসামনি দেখতে পাইনি। একজনের নাম ছিল কাদুনে। সে নাকি খালের ধারে কেঁদে-কেঁদে বেড়ায়। একজনের নাম হাসুনে। সে রাতবিরেতে খালি হেসে বেড়ায় হিহি করে। কাতুকুতু নামে এক বেজায় দুই ভূত ছিল। সে একলা-দোকলা মানুষজন পেলেই তাকে কাতুকুতু দিয়ে অস্থির করত। হেঁচো ভূত আমাদের বাগানে এসে নাকি খুব হাঁচত। আর রামবাবুদের বাঁশবনে ছিল এক বেহালা-বাজিয়ে ভূত। দিনদুপুরেও তার বাজনা শোনা যেত। একবার কেতের সঙ্গে কঞ্চি কাটতে ঢুকে তার বেহালা শুনে ভয়ে পালিয়ে এসেছিলাম। তার বাজনার সুর বড় বিচ্ছিরি।
কিন্তু নাককাটা আর তিন-আঙুলে-র কথা সেই প্রথম শুনলাম।
বোঝা গেল এক পকেটমার মরে তিন-আঙুলে হয়েছে। কিন্তু নাক কাটাটা কে? ভন্তুমাস্টার চলে যাওয়ার পর ঠাকুমার কাছে জেনে নেব ভাবছি, এমন সময় বেচারামের দাদা কেনারাম এসে গড় করল। ঠাকুমা বললেন,–তোর আবার কী হল রে কিনু? দুধে জল মিশিয়ে সিঙ্গিমশাইয়ের চঁটি খেয়েছিস নাকি?
কেনারাম কাদোকঁদো মুখে বলল, না দিদিঠাকরুন! সর্বনাশ হয়ে গেছে। নাককাটা আমার এক হাঁড়ি দুধ নাক দিয়ে টেনে নিয়েছে। কাল সন্ধেবেলা দুধটা জ্বাল দিয়ে রেখেছিলাম। সকালে দেখি একটি ফোঁটাও নেই।
–তুই কী করে জানলি নাককাটাই দুধ খেয়েছে?
আজ্ঞে, আমার মেয়ে ইমলি দেখেছে। আমি গিয়েছিলাম রামবাবুদের গরু দুইতে। ইমলির মা পুকুরঘাটে বাসন মাজতে গিয়েছিল। ইমলি একা ছিল। বলল কী, একটা রোগাটে কালো কুচকুচে লোক পাঁচিল ডিঙিয়ে এসেছিল। তার নাক নেই। ইমলি তাই দেখে তো ভয়ে কাঠ। লোকটা দুধের হাঁড়িতে মুখ ঢুকিয়ে চেঁ-ঠো করে সব শুষে নিয়ে পালিয়ে গেল।
ঠাকুমা গুম হয়ে বললেন,–হুঁ। দেখছি।
কেনারাম কাকুতিমিনতি করে বলল,–দেখছি নয় দিদিঠাকরুন। এর একটা পিতিকার আপনি ছাড়া আর কেউ পারবে না। শুনলাম কাল সন্ধেবেলা বেচুরও সর্বনাশ হয়েছে। আমি বুঝতে পারছি না দিদিঠাকরুন, নাককাটা আর তিন-আঙুলে সবাইকে ছেড়ে আমাদের দু-ভাইয়ের পেছনে লাগল কেন? আমরা ওদের কী করেছি?
ঠাকুমা একটু ভেবে বললেন,–হ্যাঁ রে কিনু, পাঁচুকে তুই তো দেখেছিস?
কোরাম ভুরু কুঁচকে বলল,–পাঁচু, মানে ঝাপুইহাটির সেই পাঁচু-চোর?
–আবার কে? ঠাকুমা একটু কষ্টমাখা হাসি ফোঁটালেন মুখে। –পঞ্চগ্রামী বিচারে পাঁচুর নাক কেটে দিয়েছিল। তা পাঁচুর বিরুদ্ধে দুই সাক্ষী দিসনি তো?
কেনারাম প্রথমে হকচকিয়ে গেল। তারপর আস্তে বলল,–সে তো অনেকদিনের কথা। সাক্ষী দিইনি, তবে পঞ্চগেরামির সময় বারোয়ারিতলায় ছিলাম বটে। সবাই পাঁচুর নাক কাটার বিচারে হইচই করে সায় দিল। তখন আমিও দিয়ে থাকব। কিন্তু কথা হচ্ছে, নাক কেটেছিল তো নোলে। তার কোনও ক্ষতি আজ পর্যন্ত হয়েছে বলে তো শুনিনি দিদিঠাকরুন!
ঠাকুমা কেমন রহস্যময় হাসলেন এবার। হবে কী করে? হলেও বা জানবি কী করে? নোলেও তো কবে মরে গেছে শুনেছি।
কেনারাম আবার ঠাকুমাকে প্রতিকারের নালিশ জানিয়ে চলে গেল। আমার এতক্ষণে অবাক লাগল। আজ বেচারাম-কেনারাম ঠাকুমার কাছে নালিশ জানাতে এল। সেদিন মিত্তিরমশাই তার জামাইয়ের কানে কে চিমটি কেটেছে বলতে এসেছিলেন। কাল ভেঁটুবাবুও ক্রাচে ভর করে ঠাকুমার কাছে কী যেন বলতে এসেছিলেন। সারারাত নাকি ঘুম হয়নি এবং হাঁচি কথাটাও কানে এসেছিল। কিন্তু সবাই ঠাকুমার কাছে ভূতের বিরুদ্ধে নালিশ জানাতে আসছে কেন?
