ছোটমামার কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। বৃষ্টি থেমে গেছে। কিন্তু আকাশ কালো হয়ে আছে মেঘে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। খুব শিগগির সন্ধ্যা এসে গেছে। আবছা আঁধার ক্রমে ঘন হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের পথ চিনে ফিরব কেমন করে, সেই ভাবনায় গলা শুকিয়ে গেল। মরিয়া হয়ে হাঁটতে-হাঁটতে আবার ডাকলুম,–ছোটমামা! ছোটমামা!
এবার কাছাকাছি কোথাও চাপাস্বরে সাড়া পাওয়া গেল, চলে আয় পুঁটু।
সহসা আওয়াজ ফিরে পেয়ে বললুম, আপনি কোথায়?
–এই গাছের ডগায়।
অবাক হয়ে বললুম,-গাছে কী করছেন?
–চ্যাঁচাচ্ছিস কেন? তুইও উঠে আয়। পুলিশের দারোগা আমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
সামনে একটা গাছ। তার ডগা থেকে ছোটমামার চাপাগলার কথা শোনা যাচ্ছিল। গাছটার কাছে গিয়ে বললুম, ছোটমামা। আমি উঠব কেমন করে?
–এই ঠ্যাং ঝুলিয়ে দিলুম। দুহাতে চেপে ধর। আমি তোকে টেনে তুলব।
গাছের তলায় অন্ধকারটা বেশি। কিছু দেখা যাচ্ছে না। হাত বাড়িয়ে ছোটমামার ঠ্যাং খুঁজতে খুঁজতে কী একটা হাতে ঠেকল। ওপর থেকে ছোটমামা বললেন,–চেপে ধর! ছাড়িস না যেন। ছেড়ে দিলে আছাড় খেয়ে হাড়গোড় ভাঙা দ হয়ে যাবি কিন্তু।
ঠ্যাংটা দু-হাতে চেপে ধরতেই মনে হল ভীষণ ঠান্ডা হিম বরফের জিনিস। হাত কনকন করে উঠল ঠান্ডার চোটে। সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিলুম। ছোটমামা বললেন, কী হল?
–আপনার পা অত ঠান্ডা কেন ছোটমামা?
–খালি কথা বানায়। ওই দ্যাখ টর্চ জ্বালিয়ে দারোগাবাবু আসছেন।
কিছু দূরে টর্চের আলো দেখতে পেলাম। জ্বলছে আর নিভছে। এদিকেই এগিয়ে আসছে লোকটা। ওপর থেকে ছোটমামা ঠান্ডা হিম ঠ্যাংটা বারবার আমার নাকের ডগায় ঝুলিয়ে দিচ্ছেন, আর ঠান্ডার চোটে আমি সরে আসছি। এতক্ষণে টর্চের আলো গাছতলায় এসে পড়ল। তারপর সেই আলোয় যা দেখলুম বুক ধড়াস করে উঠল। ছোটমামার ঠ্যাংটা মস্ত লম্বা এবং তার চেয়ে সাংঘাতিক ব্যাপার, ঠ্যাংটা একটা কঙ্কালের।
আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলুম, দারোগাবাবু! দারোগাবাবু!
টর্চ হাতে লোকটা বলল, কী হল খোকা? দারোগাবাবুদারোগাবাবু করে চেঁচাচ্ছ কেন?
লোকটা কাছাকাছি এলে বললুম, আমার ছোটমামা সেজে এই গাছে কে যেন বসে আছে।
সে টর্চের আলোয় গাছের ওপরটা তন্নতন্ন করে দেখে বলল, কই থোকা? কেউ তো নেই। তুমি মিছিমিছি ভয় পেয়েছ। তোমার বাড়ি কোথায়?
কাঁদ-কাঁদ মুখে বললুম,–পলাশপুর।
–চলো, আমি পলাশপুরেই যাচ্ছি।
লোকটা দারোগাবাবু নয়। কাজেই তার সঙ্গে হাঁটতে থাকলুম। একটু পরে আবার ছোটমামার সাড়া পেলুম। পুটু! পুঁটু! বলে ডাকাডাকি করছেন।
টর্চের আলোয় ছোটমামাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলুম। লোকটা বলল, কী রকম লোক মশাই আপনি? ভাগ্নেকে ওই ভুতুড়ে জায়গায় ফেলে এসেছিলেন?
ছোটমামা বললেন, কী রে? ভয় পেয়েছিলি নাকি?
–পাব না? একটা কঙ্কালের ঠ্যাং ঝুলিয়ে কেউ আমাকে গাছে তোলার চেষ্টা করছিল। অবিকল আপনার মতো গলায় কথা বলছিল।
ছোটমামা খাপ্পা হয়ে বললেন,–তবে রে! আয় তো দেখি সে কোন ব্যাটাছেলে?
লোকটা বলল, খুব হয়েছে মশাই! ভূতের সঙ্গে লড়াই করার সময় পরে অনেক পাবেন। চলে আসুন। খোকাবাবুকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
ছোটমামা বললেন, ঠিক আছে। চল পুটু!
গ্রামে ঢুকে লোকটা বলল, বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেব নাকি?
ছোটমামা বললেন, নানো। এবার আমরা যেতে পারব। আপনাকে পেয়ে খুব সুবিধে হল। দিব্যি পথ চলে আসা গেল। তা মশাইয়ের বাড়ি?
-ঝাঁপুইতলা।
–নাম?
–ঈশ্বর গোলোকপতি ঢোল।
শোনামাত্র ছোটমামা চেঁচিয়ে উঠলেন,–পুঁটু! এ যে দেখছি, তিন নম্বর ভূ-ভূ-ভূ-ভয়ে দীর্ঘ উ ত।
তারপর দৌডুতে থাকলেন। আমিও দৌড়ুতে থাকলুম। তবে এবার রাস্তা ভুল হওয়ার কারণ নেই।
বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে ঘুরে দেখি, আলোটা নেই এবং কুকুরগুলো প্রচণ্ড চ্যাঁচিমেচি করছে। ব্যাপারটা সত্যি গোলমেলে।…
তিন-আঙুলে দাদা
বেচারাম এসে ঠাকুমাকে গড় করে বলল,-এবার একটা কিছু করুন ৫দিদিঠাকরুন! ব্যাটাছেলে বড্ড বেশি জ্বালাচ্ছে। আমি যে এর পর ফতুর হয়ে যাব।
আমি বারান্দায় শতরঞ্চিতে বসে ভমাস্টারের ধমক খাচ্ছিলাম। ঠাকুমা কাছাকাছি থাকলেই দেখেছি ওঁর তর্জনগর্জন বেড়ে যায়। কিন্তু এই সাতসকালে বিস্কুটওয়ালা বেচারামের হঠাৎ মুখ চুন করে এসে ঠাকুমাকে গড় এবং ওই নালিশ! ভত্তমাস্টার আমাকে ভুলে গিয়ে চোখ টেরিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
ঠাকুমা ফুলবাগানের সেবাযত্ন করছিলেন। হাতে একটা খুরপি। বললেন, নাক কাটা না তিন-আঙুলে?
বেচারাম করুণমুখে বলল, আজ্ঞে তিনআঙুলে। নাককাটা তো মানুষজনের সাড়া পেলেই লজ্জায় লুকিয়ে পড়ে। কিন্তু তিন-আঙুলে মহা ধড়িবাজ। গাছের ডালে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। তলা দিয়ে কেউ গেলেই হয় চুল টেনে দেয়, নয়তো কানে খিমচি কাটে। মিওিরমশাইয়ের জামাইয়ের কানে–
ঠাকুমা তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, কখানা বিস্কুট নিয়েছে তা-ই বল।
তিনখানা খাস্তা, একখানা কিরিমকেক, আড়াইখানা নিমকি।-বেচারাম ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে ফের বলল, এখনও পুরো হিসেব করে দেখিনি। মাথার ঝাঁকায় পেলাস্টিক মোড়া ছিল। সেই পেলাস্টিক তুলে, কীরকম হাতসাফাই ভাবুন।
ঠাকুমা গম্ভীরমুখে বললেন,-প্লাস্টিক তুললেই তো শব্দ হবে। তোর ভুল হচ্ছে না তো বেচু?
বেচারাম জোরে মাথা নেড়ে বলল,–তিন-আঙুলে কে ছিল মনে নেই দিদিঠাকরুণ?
