ঘরের ভেতরে আবছা আঁধার। কেমন একটা পুরোনো-পুরোনো গন্ধও টের পেলাম। নড়বড়ে কয়েকটা চেয়ার, একটা টেবিল এবং একপাশে একটা তক্তপোশ। আমরা চেয়ারে বসলুম। ভদ্রলোক তক্তপোশে। তক্তপোশটা মচমচ করে উঠল। বললেন, নিশ্চয় ফুটবল ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন?
ছোটমামা বললেন, আজ্ঞে হ্যাঁ।
–মারামারি হয়নি আজ?
–ভীষণ মারামারি। যে যাকে সামনে পাচ্ছে পেটাচ্ছে।
ভদ্রলোক হাসতে-হাসতে বললেন,–তা তো পেটাবেই। তা না হলে ফুটবল ম্যাচ কীসে? বছর দুই আগে কেকরাডিহি আর ঘুঘুডাঙার ম্যাচে খুব মারামারি বেধে গেল। আমি তো একজনকে পেটাতে শুরু করলুম।
–বলেন কী!
–শুনুন না। যাকে পেটাচ্ছিলুম সে হঠাৎ সামনে একখানা থান ইট পেয়ে গেল। তারপর সেই ইট আমার মাথায় এবং সঙ্গে সঙ্গে আমি অক্কা পেলুম!
ছোটমামা আরও অবাক হয়েবললেন, অক্কা মানে?
ভদ্রলোক আরও হেসে-হেসে বললেন, অক্কা বোঝেন না? টেঁসে গেলুম
–টেঁসে গেলেন মানে?
–ধুর মশাই! তাও বোঝেন না? এই ছেলেটা যে ভয় পাবে, নইলে খোলাখুলি বলতুম। যাকগে! ঝড়বৃষ্টি দারুণ জমেছে! বলে ভদ্রলোক দরজার বাইরে বৃষ্টি দেখতে থাকলেন। ছোটমামা আমার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন,–মশাইয়ের নামটা জানতে পারি?
–ঈশ্বর গোলোকপতি ঢোল।
–ঈশ্বর মানে?
গোলোকপতিবাবু একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, খালি এর মানে ওর মানে! নামের গোড়ায় চন্দ্রবিন্দু দিলে কী হয়?
ছোটমামা সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,–মরা মানুষের নামের গোড়ায় চন্দ্রবিন্দু দেওয়া হয়। কিন্তু আপনি তো দেখছি জ্যান্ত মানুষ।
গোলোকপতি জোরে মাথা নেড়ে সহাস্যে বললেন,–ওই যে মাথায় ইট বলছিলুম। এক ইটেই ভবনদীর পার। বুঝলেন এবার?
ছোটমামা চটে গেল, আপনি বলতে চাইছেন যে আপনি জ্যান্ত মানুষ নন?
–ঠিক ধরেছেন, সেন্ট পারসেন্ট ঠিক।
ছোটমামা আরও চটে গিয়ে বললেন, তার মানে আপনি ভূত?
গোলোকপতি হঠাৎ খাপ্পা হয়ে বললে, যা-তা বলবেন না! কানাকে কানা, খোঁড়াকে খোঁড়া বললে তাদের রাগ হয় না। আমার ভীষণ রাগ হচ্ছে।
–কী আশ্চর্য! কী অদ্ভুত!
–আবার ভূত বলছেন। তার সঙ্গে বিচ্ছিরি একটা অদ!
এবার আমার বুক ঢিপঢিপ করছিল। বললুম,–ছোটমামা, বৃষ্টি কমেছে মনে হচ্ছে। চলুন এবার।
ছোটমামা ধমক দিয়ে বললেন, চুপচাপ বসে থাক। এর একটা বিহিত না করে যাওয়া যায় না! ও মশাই, প্রমাণ করতে পারেন যে আপনি ভূত?
আবার ভূত বলা হচ্ছে। তবে রে।বলে গোলোকপতি মুখখানা ভয়ঙ্কর করে ফেললেন। তারপর দাঁত কড়মড় করতে থাকলেন।
আমি আতঙ্কে চোখ বন্ধ করলুম। তারপর কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে চোখ খুলে দেখি, ছোটমামাও নিজের মুখখানা ভয়ঙ্কর করে চোখ কটমটিয়ে এবং দাঁত কড়মড় করে গোলোকপতির সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছেন। গোলোকপতি একের পর এক সাংঘাতিক মুখভক্তি করছেন। ছোটমামাও পাল্টা তাই করছেন। দুজনে দুজনকে ভয় দেখানোর লড়াই বেধে গেছে।
তারপর দেখি, গোলোকপতি উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাত বাড়িয়ে সাংঘাতিক জান্তব গর্জন শুরু করলেন। ছোটমামাও উঠে দাঁড়িয়ে ঘ্যাঁও-ঘ্যাঁও শব্দ করে বললেন,–চোঁখ উঁপড়ে নেঁব।
গোলোকপতি বললেন,–ঘাঁড় মঁটকে দেঁব।
তারপর দুজনে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল। প্রচণ্ড শব্দে কোথাও বাজ পড়ল। ঘরের ভেতর ততক্ষণে আরও আঁধার জমেছে। তক্তপোশ, টেবিল, চেয়ার মড়মড় করার শব্দ শুনে ছিটকে দরজার বাইরে চলে গেলুম। চেঁচিয়ে উঠলুম,–ছোটমামা! ছোটমামা! কোনও সাড়া পেলাম না।
ঘরের ভেতর দুমদাম সমানে চলছে। সেই সঙ্গে ফোঁস ফোঁস ঘোঁত ঘোঁত আঃ উঃ এইসব চাপা শব্দ। কিছুক্ষণ পরে শব্দগুলো থেমে গেল। তারপর ছোটমামার সাড়া পেলুম,–পুঁটু! ও পুঁটু!
কাঁদ-কাঁদ গলায় বললুম,–এই তো এখানে।
ছোটমামা দরজার কাছে এসে বললেন, ভয় পেয়েছিস নাকি? ভূতকে কক্ষনও ভয় পাবিনে। ভয় পেলেই ওদের সুবিধে, বুঝলি তো? ভূত যদি ভয় দেখায়, তুইও পাল্টা ভয় দেখাবি।
–লোকটা মরে যায়নি তো ছোটমামা?
লোকটা কী বলছিস! ঈশ্বর গোলোকপতি বল–ছোটমামা হাসতে হাসতে বললেন, বাছাধনকে মেঝেয় শুইয়ে দিয়েছি। কত ভূত দেখলুম তো এই বাঁটকুল ভূত। বুঝলি পুঁটু? গোলা-গোব্দা হওয়ার বিপদ এই।
এই সময় বাইরে থেকে আমাদের ওপর টর্চের আলো পড়ল। কেউ বলল, কারা ওখানে?
ছোটমামা সাড়া দিয়ে বললেন, আমরা পাশের গ্রামে থাকি। ফুটবল ম্যাচ দেখতে এসে বিপদে পড়েছি।
টর্চ হাতে এবং ছাতি মাথায় একটা লোক এসে বারান্দায় উঠল। ঠিক গোলোপতির মতোই বেঁটে গাব্দাগোব্দা। সে বলল, এ কি! আমার ঘরের দরজা খুলল কে? তারপর ভেতরে আলো ফেলে খাপ্পা হয়ে গেল। এসব ভাঙচুর করল কে? বলে আমাদের দিকে প্রায়ই তেড়ে এল।
ছোটমামা ঝটপট বললেন, ভাঙচুর করেছেন ঈশ্বর গোলোপতি ঢোল।
–ঈশ্বর গোলোকপতি ঢোল মানে। অত কথা বলছেন তো! আমি গোলোকপতি ঢোল দিব্যি বেঁচেবর্তে আছি। আর আমাকে ভূত করে দিচ্ছেন?
ছোটমামা খুব অবাক হয়ে বললেন, কী আশ্চর্য! তাহলে ওই ভদ্রলোক কে? অবিকল আপনার মতো দেখতে। দরজার খুলে আমাদের ভেতরে ডাকলেন। তারপর
শাট আপ! চালাকি হচ্ছে? বলে সে হেঁড়ে গলায় ডাকতে লাগল, দারোগাবাবু! দারোগাবাবু। চোর! চোর!
পিচের রাস্তার দিক থেকে সাড়া এল, যাচ্ছি-ই-ই! ধরে থাকুন।
ছোটমামা ঝটপট বললেন, চলে আয় পুঁটু! তারপর বারান্দা থেকে লাফ দিলেন। আমিও তাকে অনুসরণ করলুম। বৃষ্টি কমে গেছে। পেছনে চ্যাঁচিমেচি আর টর্চের আলো। জলকাদায় দৌড়ুতে গিয়ে আছাড় খেলুম। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ছোটমামাকে আর দেখতে পেলুম না। ডাকতে থাকলুম, ছোটমামা! ছোটমামা।
