বুঝলাম কিন্তু আমি যে ওকে টাকা দিইনি। যখের ধনের ভাগ আমি পাব তো নীলু?
নীলু গম্ভীর হয়ে একটু ভেবে বলল, খবুড়োকে জিগ্যেস করব। যদি বলে, তুইও পাবি-তাহলে পাবি। জানিস তো, যখের ধন সকলের সয় না। যাকগে– আর কথাটথা নয়। চুপচাপ বসে পড়ি আয়। ফলটা কখন পড়বে কে জানে!
আমরা আর কথা না বলে গাছের গুঁড়ির কাছে চুপচাপ বসে পড়লুম।…
দুজনে বসে আছি তো আছি-ফল পড়ার নাম নেই। ভুলো আপন মনে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে। কখনও গাছের দিকে তাকিয়ে লেজ নেড়ে যেন ডাকিনীটাকেই ধমক দিচ্ছে।
কিন্তু ফল পড়ছে কোথায়? দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। তখনও ফল পড়ল । বটগাছে রাজ্যের পাখি এসে ততক্ষণে জড়ো হয়েছে। তারা জোর চেঁচামেচি শুরু করেছে। ভুলো এইতে আরও খেপে গেছে। চোখ গেল গাছের গুঁড়ির ওপরে একটা মোটা ডালের দিকে।
যা দেখলুম, আমার চুল ভয়ে খাড়া হয়ে গেল। ওরে বাবা! ও কে? নিশ্চয় ডাকিনীতলার সেই বুড়ো যখটা চুপচাপ বসে আছে। পিটপিট করে আমাদের দেখছে। চেঁচিয়ে উঠলুম, নীলুরে!
নীলুও দেখতে পেয়েছিল। তার মুখে কথা নেই।
ভুলো কিন্তু ভয় পায়নি। সে এবার বিরাট গর্জন করে গাছের গুঁড়ি বেয়ে ওঠার ভঙ্গিতে লম্ফঝম্ফ শুরু করল। নখের আঁচড়ে গুঁড়িতে দাগ পড়তে থাকল। সাদা আঠা দুধের মতো বেরিয়ে এল। তারপরই ওপর থেকে আওয়াজ হল—উঁ-উঁ-প!
অমনি আমি দৌড়তে থাকলুম। সোজা নাক বরাবর দৌড়লুম। কতবার আছাড় খেলুম, কত জায়গায় ছিঁড়ে গেল। তারপর দেখলুম, ভুলোও আমার সঙ্গে চলে এসেছে। পেছন থেকে নীলুর চেঁচানি শুনলুম,–বিজু! বিজু! পালাসনে।
ঘুরে দেখি, সে দৌড়ে আসছে। তখন সাহস করে দাঁড়ালুম। কাছে এসে নীলু বলল–তুই বড্ড ভীতু! ওটা হনুমান।
— অ্যাঁ! ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলুম ওর দিকে।
নীলু বলল, ধুর বোকা। হনুমান দেখিসনি কখনও? হনুমান দেখেই ভয় পেয়ে গেলি?
তখন মনে পড়ল, হ্যাঁ হনুমানই উঁ-উঁ-প করে ডাকে বটে। কিন্তু অমন জায়গায় হনুমানকে কি হনুমান বলে মনে হয় কখনও? মনে তখন কিনা সেই বুড়ো যখটার ভাবনা। কাজেই হনুমান দেখেই কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি।
তবে বলা যায় না, বুড়ো যখটা হনুমানের চেহারা নিয়ে আমাদের দেখা দিতেও তো পারে? কথাটা নীলুকে বললে সে তখুনি মেনে নিল। তাও পারে বইকী। ফেরার পথে কানে এল, ডাকিনীতলায় সেই যখ কিংবা হনুমান ব্যাটা যেন আমাদের অমন করে চলে আসায় বেজায় রেগে গেছে। উ-উ-প খাকোর খাক! উপ খ্যাকোর খ্যাক! খুব হাঁকডাক চালিয়ে যাচ্ছে।
নীলু বলল,–চল সন্ধে অব্দি বসে থেকে দেখি ফল পড়ে নাকি। বললুম,–পাগল! তুই যাবি তো যা।
–যখের ধনের ভাগ নিবিনে?
নাঃ! বলে ভুলোকে শিস দিয়ে ডাকলুম।
তিন নম্বর ভূত
ছোটমামার সঙ্গে রাতবিরেতে কোথাও গেলে বরাবর দেখেছি, একটা না একটা গোলমেলে ঘটনা ঘটে। গিয়েছিলাম ঝাঁপুইতলা একাদশ বনাম বাবুইহাটি ইলে টাইগার্সের ফুটবল ম্যাচ দেখতে। কঁপুইতলা বাবুইহাটিকে একখানা গোল দিতেই তুলকালাম চ্যাঁচিমেচি। তারপর কেন কে জানে হাঙ্গামা বেধে গেল। যে যাকে সামনে পাচ্ছে, দুমদাম ঘুসি কিক্ল চড় থাপ্পড় চালাচ্ছে। ছোটমামার দিকে ঘুসি তুলে একটা ষণ্ডামার্কা লোক এগিয়ে আসামাত্র ছোটমামা চেঁচিয়ে উঠলেন,–আমি না! আমি না! ওই লোকটা।
অমনি ঘুসিটা গিয়ে পড়ল অন্য একজনের পিঠে। দুজনে মারামারি বেধে গেল। সেই ফাঁকে ছোটমামা আমার হাত ধরে বললেন,–চলে আয় পুঁটু। তারপর দুজনে দৌড়ে খেলার মাঠ ছাড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে গেলুম।
তখন ছোটমামার সে কী হাসি! বললেন,–কেমন দিয়েছি বল!
খুশি হয়ে বললুম, দারুণ দিয়েছেন ছোটমামা!
–হেডে একটু বুদ্ধি না থাকলে আজকাল বাঁচা যায় না। বুঝলি পুঁটু?
–কেন মারামারি বাধল বলুন তো?
সেটাই তো বুঝতে পারছি না।–বলে ছোটমামা খেলার মাঠের দিকে ঘুরলেন। খি-খি করে হেসে ফের বললেন,–মনে হচ্ছে পুলিশ এসে গেছে। চল, আমরা কেটে পড়ি। পুলিশের ব্যাপারে কিছু বলা যায় না। এদিকে আকাশে মেঘ ঘনিয়েছে। ঝড়বৃষ্টি হলেই কেলেঙ্কারি।
পিচের রাস্তায় পৌঁছেছি, সে সময় আচমকা মেঘ ডাকল। তারপর সূর্য ঢেকে গেল চাপ-চাপ কালো মেঘের তলায়। ছোটমামা বললেন,–এই সেরেছে। সত্যিই কালবোশেখির ঝড়বৃষ্টি আসছে যে! শিগগির চল, কোথাও গিয়ে মাথা বাঁচাই।
রাস্তার ওধারে গাছপালার ভেতরে একটা একতলা দালানবাড়ি দেখা যাচ্ছিল। পলেস্তরা খসে যাওয়া জরাজীর্ণ বাড়ি। কার্নিশে অশথচারা। সেই বাড়ির বাইরের বারান্দায় উঠে গেলাম দুজনে। সেইসময় ঝড়টা এসে পড়ল। আর সঙ্গে চড়বড় করে বৃষ্টিও।
দুজনে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালাম। বারান্দায় বৃষ্টির ছাঁট আর ঝড়ে ভেঁড়া সবুজ পাতার কুচি এসে পড়েছিল। ছোটমামা আপনমনে বললেন,–পুলিশ না এলে আমার ধারণা, মারামারিটা এখনও চলত।
বললুম,–ঝড়বৃষ্টির মধ্যেও?
ছোটমামা আগের মতো বললেন,–কিছু বলা যায় না।
বারান্দাটা পশ্চিমদিকে। তাই বৃষ্টির ছাট আমাদের পা ভিজিয়ে দিচ্ছিল। এদিকে বারবার চোখ ধাঁধানো বিদ্যুৎ আর মেঘের গর্জন। ছোটমামা দরজায় কড়া নাড়লেন এবার। কিছুক্ষণ কড়া নাড়া-ডাকাডাকির পর দরজাটা খুলে গেল। একজন বেঁটেখাটো নাদুসনুদুস ভদ্রলোককে দেখা গেল। তিনি আমাদের দেখে অমায়িক হেসে বললেন, ইস! বড় ভিজেছেন দেখছি। আসুন, আসুন, ভেতরে এসে বসুন।
