ভালুক যদি জব্দ হয়, ভুলোর পাল্লায় পড়ে ডাকিনীও নিশ্চয় জব্দ হবে। অতএব তখুনি মাঠের দিকে চলতে থাকলুম। ভুলো আমার সঙ্গে চলল, কখনও পিছনে, কখনও এপাশে-ওপাশে সে ছুটোছুটি করে এগোচ্ছিল। এদিকে সারাক্ষণ আমার চোখ রয়েছে, নীলুর দিকে। একটু পরেই দেখলুম, নীলু বটতলায় পৌঁছে গেল। কিন্তু তারপর ছায়ার আড়ালে তাকে এতদূর থেকে আর দেখা যাচ্ছিল না। আমার মাথায় তখন অনেক ভাবনা জেগেছে। এভাবে নীলু ওখানে গেল কেন? ডাকিনীটা কি গাঁয়ে এসে ওকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিজের ডেরায় মারতে নিয়ে গেল? সর্বনাশ তাহলে তো ওকে বাঁচাতেই হবে।
ভুলো যখন সঙ্গে আছে তখন আমার ভয় নেই। আমি জোরে হাঁটতে থাকলুম। নির্ঘাৎ বোকা নীলু ডাকিনীর পাল্লায় পড়ে গেছে।
বটতলার কাছাকাছি যেতে না যেতে ভুলো লেজ তুলে আকাশের দিকে মুখ উঁচু করে হঠাৎ লম্বা একটানা ঘেউ-উ ঝাড়ল। এইতে আমার বুক একটু কেঁপে উঠল। মামার কাছে শুনেছি, জীবজন্তুরা ভূতপ্রেত ডাকিনী সবাইকে দেখতে পায়। তার মানে, আমরা যাদের দেখি না, ওরা তাদের দিব্যি দেখতে পায়। এমনকি দেখেছি, পাঁচিলের ওপাশে অচেনা মানুষ এলে ভুলো তাও টের পায় এবং বেজায় হাঁকডাক শুরু করে। রাতের আঁধারেও তো ভুলো দেখতে পায়–অথচ আমাদের আলো চাই-ই।
কাজেই ভুলো নিশ্চয় একটা কিছু অদ্ভুত ব্যাপার দেখতে পাচ্ছে। ভয়ে-ভয়ে বললুম, ভুলোয় কিছু দেখতে পাচ্ছিস নাকি?
ভুলো আমার দিকে ঘুরে লেজ নেড়ে কুকুরের ভাষায় বলল,–হুঁউ। তারপর সে আচমকা বটতলার দিকে দৌড়াতে থাকল। দেখাদেখি, আমিও সঙ্গ নিলুম। তারপর বটতলার কাছে গিয়ে হাঁপাতে-হাঁপাতে ডাকলুম, নীলু! নীলু!
বটতলায় কখনও ওর আগে যাইনি। কী প্রকাণ্ড গাছ! চারপাশে অনেক ঝুরি নেমেছে। গুঁড়িটাও পেল্লায় মোটা। শেকড়-বাকড় ছড়ানো রয়েছে অগুনতি। শনশন করে বাতাস বইছে। বটের পাতা কঁপছে। ভুলো মাটি খুঁকে ঘুরঘুর করছিল। নীলুর কোনও সাড়া পেলুম না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ মনে হল বাতাসের সুরে কে যেন গান গেয়ে কিছু বলছে। গা শিউরে উঠল। আবার ডাকলুম, নীলু! নীলু! কিন্তু কোনও সাড়া পেলুম না।
এই সময় ভুলো মুখ তুলে আবার একখানা লম্বা ঘেউ-উ ঝাড়ল। তারপর দৌড়ে গাছের ওপাশে চলে গেল। তখন আমিও গেলুম।
গিয়ে যা দেখলুম, থ বনে দাঁড়াতে হল। এক বুড়ো বসে রয়েছে। তার পাশেই একটা ময়লা কাপড়ের পুঁটলি। একটা লাঠি। তার সামনে মাটিতে বসে আছে নীলু। বুড়ো লোকটা চোখ বুজে যেন ধ্যান করছে। তার গায়ে একটা তালিমারা ফতুয়া– খুব নোংরা সেটা। মাথায় একটা পাগড়ি। তার কানে বড় বড় তামার আংটি ঝুলছে। গলায় একটা মস্ত চাদির চাকতি আছে।
এইবার মনে পড়ে গেল–আরে! এ তো সেই ম্যাজিসিয়ান! সেদিন আমাদের পাড়ায় ম্যাজিক দেখাচ্ছিল। আমি আরও অবাক হয়ে গেলুম।
নীলু এতক্ষণ আমাকে দেখেও যেন দেখছিল না। আমার চোখে চোখ পড়তেই সে ঠোঁটে আঙুল রেখে আমাকে চুপ করতে ইশারা করল। তারপর চোখ নাচিয়ে তেমনি ইশারায় ম্যাজিসিয়ানকে দেখিয়ে তার পাশে বসতে বলল।
নীলুর পাশে গিয়ে বসে পড়লাম। ভুলো এসে আমার পাশে একটুখানি দাঁড়িয়ে থেকে আবার কোথায় চলে গেল।
একটু পড়ে বুড়ো ম্যাজিসিয়ান চোখ খুলল। বিড়বিড় করে কী অস্পষ্ট মন্ত্র পড়ল যেন। তারপর একটু ঝুঁকে নীলু ও আমার ওপর তিনবার ফুঁ দিন। ভয়ে বুক কাপল। এমন কেন করল ও?
তারপর লোকটা একটু হেসে মিঠে গলায় বলল,-এ ছেলেটি কে বাবা?
নীলু বলল, আমাদের পাড়ায় থাকে। বিজু, তোর নাম বল। ম্যা
জিসিয়ান হাত তুলে বলল–থাক-থাক। বিজু তো? ব্যস, ওতেই হবে।
নীলু বলল,–বিজু, তোকে কিন্তু দুটো টাকা দিতে হবে। আমিও দিয়েছি।
বললুম,–দেব। কিন্তু এখন যে নেই রে!
ম্যাজিসিয়ান বলল,–আচ্ছা, আচ্ছা এবার শোন বাবা, আমি যা করার সব করে দিয়েছি। এখন তোমাদের কী করতে হবে, বলছি। আমি চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে এই গাছ থেকে একটা লাল টুকটুকে ফল পড়বে। সেই ফলটি দুজনে ভাগ করে খাবে। খেলেই তোমাদের চোখ খুলে যাবে। তখন দেখবে, আমার মতো একজন বুড়ো মানুষ এই গাছের গোড়ায় মাটি ঠেলে বেরোচ্ছে। তাকে তোমরা দুজনে টেনে তুলবে। এতে সে খুশি হবে তোমাদের ওপর। তখন বলবে-কী চাই? তোমরা বলবে তুমি যদি যখ হও, তাহলে তোমার টাকাগুলো দাও। অনেক টাকা, বাবা! শুধু টাকা নয়–কত সোনাদানা পেয়ে যাবে।
নীলু ঘাড় নাড়ল। ম্যাজিসিয়ান বলল,-তাহলে আমি চলি। কেমন?
নীলুর দেখাদেখি আমিও ঘাড় নাড়লুম। সে পুঁটলিটা কাঁধে নিয়ে ছড়ি হাতে উঠল। তারপর আচমকা হনহন করে প্রায় দৌড়তে শুরু করল। এইতে ভুলো কেন যে খেপে গেল কে জানে, দেখলুম ভুলে চেঁচাতে-চেঁচাতে তার পেছন-পেছন দৌড়াচ্ছে। আমার ভয় হল, ম্যাজিসিয়ান রেগে যায় যদি! ভুলোকে সে নির্ঘাৎ মন্ত্রের জোরে মেরে ফেলবে। আমি চেঁচিয়ে ডাকতে থাকলুম,–ভুলো! ভূলো! ফিরে আয়!
আমার ডাক শুনে ভুলো থমকে দাঁড়াল। আর এগোল না। কিন্তু ফিরেও এল না। ওখানে দাঁড়িয়ে ম্যাজিসিয়ানের উদ্দেশে রাগ দেখাতে থাকল।
নীলু চোখ নাচিয়ে বলল,-তুই কী করে জানলি রে?
বললুম,–তোকে আসতে দেখলুম যে। কিন্তু ম্যাজিসিয়ানকে কোথায় পেলি?
নীলু বলল, আজ সক্কাল বেলা রাস্তায় দেখা হয়েছিল। ও বলল, দুটো টাকা দিলে যখের ধন পাইয়ে দেবে। ঠাকুমার ঝাপি থেকে মেরে দিলুম দুটো টাকা! ওকে দিলুম। ও বলল,–ঠিক দুপুরবেলা ডাকিনীতলায় চলে এসো। এবার বুঝলি তো?
