মোনাকে খালি শিশিটা ফেরত দিয়ে এলুম। মোন আমাকে সাবধান করে দিল।
সে-রাত্তিরে আবার আমার মনে হল, সত্যি এই শিশির ভেতর পেতনি আছে কিনা পরীক্ষা করা দরকার। ডন যথারীতি বালিশের পাশে শিশি রেখে ঘুমোচ্ছিল। শিশিটা চুপিচুপি তুলে নিয়ে জানালার গ্রিলের ফাঁকে রেখে ছিপি খুলে দিলাম।
তারপর যা দেখলুম, ভয়ে বুকটা ধড়াস করে উঠল।
জ্যোৎস্নায় একটা সাদা কাপড়পরা মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে।
সাহস করে টর্চ বের করলুম। টর্চ জ্বালাতেই মূর্তিটা আর দেখতে পেলুম না। চুপিচুপি দরজা খুলে বেরিয়ে গিয়ে দেখি, সাদা মূর্তিটা বাগানের একটা আম গাছে উঠে গেল। একটু পরে আম গাছের ডগায় তাকে দেখা গেল। সেখান থেকে উঁচু একটা বাজপড়া ন্যাড়া তাল গাছের মাথায় গিয়ে বসল। তারপর পাচার ডাক শুনলুম ক্রাঁও। ক্রাঁও!
টর্চের আলো ফেললুম। কিন্তু কিছু দেখতে পেলুম না। আমার চোখের ভুল নয় তো? টর্চ নেভালে সাদা কাপড়পরা পেতনিকে দিব্যি দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আলো জ্বালিয়ে পাচ্ছি না। ব্যাপারটা ভালোভাবে পরীক্ষা করা দরকার।
বাজপড়া তালগাছটার কাছে গিয়ে ফের টর্চ জ্বাললুম। কিন্তু জুলল না। সুইচ বিগড়ে গেল নাকি? টর্চ নাড়া দিয়ে এবং ব্যাটারি বের করে আবার ঢুকিয়ে অনেক চেষ্টা করলুম, টর্চ আর জুলল না। পেতনিটা বসে ঠ্যাং দোলাচ্ছে।
একটু পরে শুনি, গুনগুন করে মেয়েলিগলায় গান গাইছে সে।
‘এমন চাঁদের আলো
মরি যদি সে-ও ভালো
সে-মরণ স্বরগ সমান।‘
এবার আর দাঁড়িয়ে থাকার সাহস হল না। চুপিচুপি ঘরের দিকে পা বাড়ালুম তারপর এক কাণ্ড ঘটল। ভীষণ ঠান্ডা কী একটা জিনিস আমার মাথার পেছনে চাটি মারল। মাথা যেন বরফ হয়ে গেল।
তারপর ঘরের দিকে যত এগোচ্ছি, বারবার তত চঁটি খাচ্ছি। টলতে-টলতে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলুম। শুতে যাচ্ছি, হঠাৎ মনে হল মাথায় পেছনদিকে কী একটা আটকে যাচ্ছে। আঁতকে উঠে হাত দিয়ে সেটা ছাড়িয়ে নিলুম। পেতনির হাত ভেবে সেটা মুঠোয় ধরে ঘরের আলো জ্বেলে দিলুম।
কী কাণ্ড! একটা চামচিকে।
চামচিকেটা জানালার বাইরে ছুঁড়ে ফেললুম। কিন্তু এটা না হয় চামচিকে। সাদা কাপড়পড়া মূর্তিটা তো পেত্নি।
নাকি পেতনিটাই চামচিকেটাকে হুকুম দিয়েছে আমার মাথায় চাটি মারতে?
কে জানে বাবা! আর ঝুঁকি নিয়ে কাজ নেই। ডন খালি শিশিতে পাঁচুর ভূত আছে ভেবে কিছুদিন শান্ত থাকবে। খামখেয়ালি ছেলে। তারপর এসব ভুলে যাবে। কাজেই আর এ নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই।…..
যা ভেবেছিলুম হলও তাই। পরদিন বিকেলে ডন এসে আমার পিঠে চিমটি কাটল। বললুম,–আবার কী চাই?
ডন গম্ভীরমুখে বলল,-পাঁচুর ভূতটা গোগোকে বেচে দিলুম।
–ভালো করেছিস।
–মামা, দুটো টাকা দাও।
–আবার কী কিনবি?
ডন ফিক করে হেসে বলল,–ঘুড়ি প্লাস লাটাই প্লাস সুতো। তোমার দুই প্লাস গোগোর তিন। ইজ ইকোয়াল টু পাঁচ।
দুটো টাকা দিলুম। বললুম,–হ্যাঁ ঘুড়ি কেনো। সেটা ভালো। কিন্তু আর যেন ভূত কিনতে যেও না।
ডন গুলতির বেগে উধাও হয়ে গেল।…
ডাকিনীতলার বুড়ো যখ
আমাদের বাড়ির পিছনে একটা বাগান, তারপর ধূ-ধূ মাঠ। মাঠের মধ্যিখানে ছিল একটা বটগাছ। গাঁয়ের লোক বলত ডাকিনীতলা।
ডাকিনীতলা, তার মানে ওই ধূধু তেপান্তরের একলা দাঁড়ানো বটগাছটার দিকে দুপুরবেলা তাকিয়ে থাকতুম যদি ডাকিনীটাকে দেখতে পাওয়া যায়। রোদ্দুর চনমন করত মাঠে। জন নেই, মানুষ নেই। খাঁ-খাঁ চারদিক। কথায় বলে, ঠিকঠাক দুকুর বেলা, ভূতপেরেতে মারে ঢেলা। দুপুরবেলায় ভূতপ্রেত-ডাকিনীরা পাড়াগাঁয়ের গাছগুলিতে ওঁৎ পেতে থাকে কিনা। একলা-দোকলা গাছতলায় যেই গেছ, টুপটাপ ঢিল পড়বে গায়ে। ঢিলও দেখতে পাবে না তুমি, কে ঢিল ছুড়ল তাকেও দেখবে না। কিন্তু ব্যাপারটা সত্যি।
অতদূর থেকে একটা ছোট্ট ছেলেকে ডাকিনীতলার ডাকিনী ঢিল ছুঁড়ে মারবে, সেই গায়ের জোর ডাকিনীটার নিশ্চয় ছিল না। বটতলায় গেলে তো!
কিন্তু ওরা নাকি সবই দেখতে পায়। যতদূরেই থাকো, চোখে পড়বেই। একদিন হয়েছে কী, দুপুরবেলা রোজ যেমন বাগানের ধারে দাঁড়িয়ে দূরে ডাকিনীতলার দিকে তাকিয়ে থাকি–সেইরকম তাকিয়ে আছি, হঠাৎ চোখ পড়ল হাজরা-মশায়ের ছেলে নীলু হাফপেন্টুল পরে খালি গায়ে মাঠের দিকে চলছে। নীলু আমার সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ে। ক্লাসের সবচেয়ে ভীতু ছেলে–আবার তেমনি বেহদ্দ গোবেচারা। তাই তাকে অমন হনহন করে ডাকিনীতলার দিকে যেতে দেখে খুব অবাক হয়ে গেলুম। এই রে! নির্ঘাৎ ও মরবে। যেই যাবে কাছাকাছি ডাকিনীটা ওর গলা মটকে রক্ত চুষে খাবে।
হাঁ করে তাকিয়ে ওর কাণ্ড দেখছি, এমন সময় আমাদের কুকুর ভুলো এসে আমার পা এঁকে লেজ নেড়ে কেঁউ-কেঁউ করে উঠল। ভুলোর মতো তেজি কুকুর গাঁয়ে আর দুটো নেই। ওর গায়ের গন্ধ পেলেই মাঠের শেয়ালগুলো লেজ গুটিয়ে তল্লাট ছেড়ে পালায়। একবার এক ভালুকওলা এসেছে ভালুকের নাচ দেখাতে। ভুলো সেই নাচুনে ভালুকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মেরে ফেলে আর কী! অনেক কষ্টে ছাড়ানো হয়েছিল তাকে। অথচ কুকুর ভালুক দেখলে কী যে ভয় পায়, সবাই জানে।
ভুলোকে দেখে আমার সাহস বেড়ে গেল। ওর গলায় হাত বুলিয়ে বললুম, এই ভুলো! আমার সঙ্গে যাবি?
ভুলো লেজ নেড়ে সায় দিয়ে বলল–হুঁউ।
