ডন কঁদো কাঁদো মুখে বলল,–মামা শিশির ছিপি খুলেছিল।
মোনা বলল,-ছোটবাবু! কাজটা ঠিক করেননি। খোকাবাবুকে যে ভূতটা বেচেছিলুম, সে খুব ঘোডড়ল ভূত। সে কে জানেন! পাঁচু। সেই পাঁচু-চোর।
পাঁচু নামে একটা চোর ছিল আমার ছেলেবেলায়। পাকা সিঁদেলচোর। কত বাঘা বাঘা দাবোগাবাবুকে সে নাকাল করে ছাড়ত। বুড়ো হয়ে সে মারা পড়েছিল অসুখ-বিসুখে। যাই হোক ডনের সামনে মোনার সঙ্গে ভূত নিয়ে তর্ক করা ঠিক নয়। বললুম,–যাই হোক, পাঁচুকে আবার ফাঁদ পেতে ধরে দাও।
ডন বলল,–মোনাদা! পাঁচু কালো বেড়াল সেজে পালিয়ে গেছে।
ভনের ভূত
কালো বেড়াল? –মোনা ভুরু কুঁচকে বলল,-। তাহলে তো বড় কেলেঙ্কারি হল। ঠিক আছে, দেখছি। ইঁদুর ধরে ফাঁদে আটকাতে হবে ওকে। এখন ইঁদুর পাই কোথা দেখি। কই, খোকাবাবু। শিশিটা দাও।
শিশিটা নিয়ে সে জঙ্গলের ভেতরে চলে গেল। গেল তো গেলই। আমরা ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। একসময় হঠাৎ াও শব্দ শুনে দেখি, ঝোঁপের ভেতর থেকে সেই কালো বেড়ালটা মুখ বের করছে। দেখামাত্র ডন তাকে তাড়া করে গেল। তারপর আর তাকে দেখতে পেলুম না। কিছুক্ষণ তাকে ডাকাডাকি করে মন্দিরের পেছনে বটতলায় গিয়ে বসে পড়লুম।
সেই সময় দেখলুম, একটু দূরে বাঁশবনের ভেতর গুঁড়ি মেরে মোনা বাঘের মতো চুপিচুপি হাঁটছে। তারপর সে লাফ দিয়ে যেন কিছু ধরল। তারপর চেঁচিয়ে উঠল,-এবার? এবার বাছাধন যাবে কোথায়? খোকাবাবু! ছোটবাবু! চলে আসুন।
সাড়া দিয়ে বললুম,–এই যে এখানে আছি।
মোনা আমাকে দেখতে পেয়ে অদ্ভুত শব্দে হাসতে-হাসতে চলে এল। ছিপি আঁটা শিশিটা আমাকে দিয়ে বলল,-এবার কিন্তু সাবধান। তা থোকাবাবু কোথায় গেল?
বললুম, কালো বেড়ালটা দেখতে পেয়ে ছুটে গেছে। তুমি খুঁজে দেখো তো ওকে।
মোনা বলল, সর্বনাশ! আপনি খোকাবাবুকে যেতে দিলেন? পেতনিটার পাল্লায় পড়লে বিপদ হবে যে!
সে হন্তদন্ত হয়ে জঙ্গলে গিয়ে ঢুকল। একটু পরে সে ডনকে নিয়ে ফিরে এল। বলল, আর একটু হলেই পেতনি খোকাবাবুকে ধরে ফেলত। পেতনিদের স্বভাব জানেন তো? ছেলেপুলে দেখলেই কুড়মুড় করে মুন্ডু চিবিয়ে খায়। আপনারা শিগগির চলে যান। আর একটা কথা, পাঁচুকে তেরাত্তির উপোস করিয়ে রাখবেন।
ডন এসেই আমার হাত থেকে শিশিটা ছিনিয়ে নিল।… ব্যাপারটা এখানেই শেষ হলে ভালো হতো। কিন্তু তা হল না।
রাত্তিরে ডন আমার কাছে শোয়! শিশিটা বালিশের পাশে রেখে সে ঘুমোচ্ছিল। আমি ঘুমুতে পারছিলুম না। সেই বেড়ালটার কথা ভাবছিলুম। আরও ভাবছিলুম পাঁচু চোরের কথা। পাঁচুকে একটু-একটু মনে পড়ে! লম্বা সিঁড়িঙে চেহারার লোক ছিল সে। মাথার চুল খুঁটিয়ে ছাঁটা। কেউ যাতে চুল ধরে তাকে বেকায়দায় না ফেলে, সেইজন্য ওইরকম করে চুল ছাঁটত। শুনেছি, দুদে দারোগা বন্ধুবিহারী ধাড়া তাকে শায়েস্তা করেছিলেন। কিন্তু কথাটা হল, পাঁচু মরে কালো বেড়াল সেজে বেড়ায় কেন?
হুঁ, ওই যে কথায় বলে-স্বভাব যায় না মলে। মরার পরেও পাঁচু বেড়াল সেজে দুধ-মাছ-মাংস চুরি করে বেড়াচ্ছে না তো? তবে তার আগে দেখা দরকার, সত্যি ডনের শিশি থেকে কালো বেড়াল বেরোয় কি না। রাত্তিরটা ছিল জ্যোৎস্নার। জানলার বাইরে ঝকঝকে জ্যোৎস্নায় চুপিচুপি বালিশের পাশ থেকে শিশিটা নিয়ে ছিপি খুলে দিলুম।
অমনি দেখলুম, ফের একটা কালো বেড়াল জানালা গলিয়ে পালিয়ে গেল। এবার আমার শরীর শিউরে উঠল। তক্ষুণি ছিপি এঁটে শিশিটা যথাস্থানে রেখে জানালায় উঁকি দিলুম। বেড়ালটা পাঁচিলে বসে নীল জ্বলজ্বলে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তক্ষুণি জানলা থেকে সরে এসে শুয়ে পড়লুম। নাহ! সত্যি তাহলে ভূত আছে।
সকালে উঠে শুনি, রান্নাঘরে চোর ঢুকেছিল। সকালের চায়ের দুধ রাখা ছিল। এক ফোঁটা নেই। নটার আগে গয়লা দুধ দিতে আসে না। জামাইবাবু–ডনের বাবা খুব বকাবকি করলেন দিদিকে। দিদি নাকি রান্নাঘরের দরজা-জানালা আটকাতে ভুলে গিয়েছিল। শুধু দুধ নয়, ফ্রিজ থেকে মাছ-মাংস সব নিপাত্ত হয়ে গেছে।
ডন ছোটছেলে। সে এ নিয়ে মাথা ঘামাল না। কারণ শিশির ভেতর বন্দি পাঁচুকে তেরাত্তির উপোস রাখতে হবে। কাজেই সে ছিপি খোলেনি। সে তো জানে না, আমি ছিপি খুলে এই কেলেঙ্কারিটি বাধিয়েছি। ডন ভেবেছে পাঁচু শিশির ভেতর রয়ে গেছে।
চুপিচুপি মোনার ডেরায় চলে গেলুম।
মোনা আজ তার ডেরাতে বসে চোখ বুজে তপজপ করছিল। ডেরা মানে মন্দিরের লাগোয়া একটা পুরোনো জরাজীর্ণ একতলা ঘর। জপ শেষ হলে সে চোখ খুলে আমাকে দেখে বলল,-পাঁচু পালায়নি তো ছোটবাবু?
হ্যাঁ। পালিয়েছে। আসলে আমারই বোকামি। মোনা, ডন এখনও জানে না আমি ফের ছিপি খুলেছিলুম।–বলে যা ঘটেছে, তার মোটামুটি একটা বিবরণ দিলুম।
মোনা গুম হয়ে গেল। একটু পরে বলল, ঠিক আছে। তিনটে টাকা ছাড়ুন ছোটবাবু। আমি পেতনিটাকে শিশিতে ভরেছি। আপনি বরং এই শিশিটা আপনার ভাগনেবাবাজির শিশির সঙ্গে পাল্টে ফেলুন। খালি শিশিটা আমাকে ফেরত দিন। আর হ্যাঁ, পেত্নি কিন্তু দুধ-মাছ-মাংস খায় না। একটু শুকনো গোবর আর হাড়গোড় এর খাদ্য।
তিনটে টাকা গচ্চা গেল। কী আর করা যাবে? বাড়ি ফিরে এক সুযোগে ডনের শিশিটা নিয়ে এই শিশিটা রেখে দিলুম ডনের পড়ার টেবিলে। ডন তখন স্কুলে।
