–শিগগির বলে মামা! দেরি হলে গোগো ভূতটা কিনে ফেলবে।
–ভূত কার কাছে কিনবি?
–মোনাদার কাছে।
–মোনাদা মানে সেই মোনা-বুজরুক? মোনা ভূত কোথায় পেল?
–ঝিলের ধারে বাঁশের জঙ্গলে ফঁদ পেতে ধরেছে।
–তুই দেখে এলি?
–হুঁ। শিশির ভেতর ভরে রেখেছে। –মোনাদা বলল,–শিশির দাম পঞ্চাশ পয়সা আর ভূতটার দাম দু-টাকা পঞ্চাশ পয়সা। ইজ ইকোয়্যাল টু তিন টাকা।
হাসতে-হাসতে বললাম, বাঃ! অ্যাদ্দিনে অঙ্কে তোর মাথা খুলেছে দেখছি। তো ভূতটা দেখতে কী রকম?
ডন চটে গেল। –ভূত কি চোখে দেখা যায়? কই শিগগির টাকা দাও।–বলে সে কলমটা টেবিলে ঠোকার ভঙ্গি করল।
দামি কলম। তাই বেগতিক দেখে তিনটে টাকা দিলুম। টাকা পেয়ে কলমটা রেখে ডন গুলতির বেগে উধাও হয়ে গেল।
গল্পের মুডটা চটে গেল। মনে-মনে মোনার মুন্ডুপাত করতে থাকলুম। মোনা থাকে ঝিলের ধারে পুরোনো শিবমন্দিরের কাছে।
মোনার মাথায় জটা, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, পরনে একফালি গেরুয়া কাপড়, কপালে লাল তিলক আঁকা। সে নাকি তন্ত্রসাধনা করে। কারও কিছু চুরি গেলে মোনা নাকি মন্ত্রের জোরে চোর ধরিয়ে দেয়। অসুখ-বিসুখের চিকিৎসাও করে। তবে কথাটা হল, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। কাজেই যারা ওকে বিশ্বাস করে, তারা বলে মোনা-ওঝা এবং যারা করে না, তারা বলে মোনা বুজরুক। তবে লোকটাকে যত ভয়ঙ্কর দেখাক, ওপর পার্টির দুটো দাঁত নেই বলে যখনই হাসে, তাকে ভালোমানুষ মনে হয়। কিন্তু মোনা বুজরুক ডনকে ঠকাবে এবং ডন একটা ছোট ছেলে। এতেই মোনার ওপর খাপ্পা হয়েছিলুম। বড়রা বোকামি করে ঠকে। ছোটদের সরলতার সুযোগ নিয়ে ঠকানো ভারি অন্যায়। ভাবলুম, মোনাকে গিয়ে খুব বকে দিয়ে আসি।
কিন্তু ডন তক্ষুনি ফিরে এল। তার হাতে একটা ছোট্ট শিশি। শিশিটা দেখিয়ে সে খুশিখুশি মনে বলল,-গোগো টাকা নিয়ে গিছল মামা! মোনাদা ওকে দিল না। বলল, আগে আমি কিনব বলেছিলুম, তাই আমাকেই সে বেচবে।
সে টেবিলে শিশিটা রাখল। শিশিটার ভেতর কিছু নেই। বললাম,–হ্যাঁরে, এর ভেতর যে ভূত আছে, কী করে বুঝলি?
ডন বলল, আছে মামা! মোনাদা বলল, সন্ধ্যা হলেই দেখতে পাওয়া যাবে।
–ঠিক আছে। তা এই যে তুই ভূত পুষবি, ভূতকে কিছু খেতে দিতে হবে?
–হবে বইকী। ভূতেরা দুধ আর মাছ খায়। তাই খাওয়াব।
–কিন্তু খাওয়াতে গেলে যদি ভূতটা পালিয়ে যায়?
মোনাদা বলল, আবার ফাঁদ পেতে ধরে দেবে।
–ডন চাপা গলায় বলল, আমি একটু দুধ নিয়ে আসি মামা! তুমি যেন ছিপি খুলল না।
ডন দুধ আনতে গেল। আমি সেই সুযোগে শিশির ছিপি খুলে ব্যাপারটা পরীক্ষা করার লোভ সম্বরণ করতে পারলুম না। ছিপিটা খুলতেই বোটকা গন্ধ টের পেলুম। তারপর দেখি, জানলা গলিয়ে একটা বেড়াল লাফ দিয়ে উধাও হয়ে গেল।
ব্যাপারটা এমন আকস্মিক যে, চমকে উঠেছিলুম। কালো বেড়াল তো এঘরে দেখিনি। বাড়িতেও কোনও কালো বেড়াল নেই। ওটা এল কোত্থেকে? কখন এ ঘরে ঢুকল? ছিপি খোলার পরই বা জানালা গলিয়ে পালাল কেন?
হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলুম একেবারে। সেই সময় ডনের আবির্ভাব হল। তার হাতে দুধের বাটি। সে দেখতে পেল আমি ছিপি খুলেছি। অমনি চিকুর ছাড়ল,–মামা! মামা! ছিপি খুললে কেন? তারপরই তার চোখ গেল জানালার ওধারে পাঁচিলের দিকে। পাঁচিলে কালো বেড়ালটা বসে কেমন জুলজুলে চোখে এদিকে তাকিয়ে আছে।
ডন দুধের বাটি রেখে আমার হাত থেকে শিশি আর ছিপি ছিনিয়ে নিয়ে বেরুল। পাঁচিলের কাছে যেতেই বেড়ালটা লাফ দিয়ে ওধারে নামল। ডনকেও বেরিয়েও যেতে দেখলুম।
এবার জানি কী কী ঘটবে। আমার কাগজ ছিঁড়ে কুচিকুচি হবে। কলমটা গুঁড়ো হয়ে যাবে। আমিও প্রচুর চিমটি খাব। ডনের নখ যা ধারালো!
কাগজকমল সামলে রেখে আমিও পালানো ভূতটা ধরার ছল করে বেরিয়ে গেলুম। রাস্তার দাঁড়িয়ে ডন এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। সে কিছু বলার আগেই বললুম,–চল! আবার মোনা বুজরুকের কাছে যাই। সে কাঁদ পেতে পালিয়ে যাওয়া ভূতটাকে ধরুক। টাকা যা লাগে, দেব।
ডন কঁদো কাঁদো মুখে এগোল! খেলার মাঠ পেরিয়ে ঝিল। ঝিলের ধারে শিবমন্দিরের ওখানে ঘন জঙ্গল। সেখানে পৌঁছে ডাকলুম,–মোনা আছে নাকি! ও মোনা!
সাড়া এল জঙ্গলের দিক থেকে,–কে ডাকে গো?
মোনার গলার স্বর কেমন অদ্ভুতুড়ে। বললুম,–শিগগির একবার এসো তো এদিকে। একটা কেলেঙ্কারি হয়ে গেছে।
জঙ্গলের ভেতর থেকে মোনার জবাব এল। আমিও এক কেলেঙ্কারিতে পড়েছি। জায়গা ছেড়ে নড়ি কী করে?
অগত্যা মন্দিরের পেছনে গিয়ে জঙ্গলে ঢুকলুম। বললুম,–তুমি আছোটা কোথায়?
–শ্যাওড়া গাছের ভেতরে।
শ্যাওড়া গাছটা দেখা যাচ্ছিল। সেখানে গিয়ে দেখলুম, মোনা গা-ঢাকা দিয়ে বসে আছে ডালপালার ভেতরে। আমাদের দেখে সে ফিক করে হাসল। ওপর পাটির দুটো দাঁত নেই। তাই তার হাসিটা বেশ অমায়িক দেখাল। বললুম,–ওখানে বসে তুমি কী করছ মোনা?
মোনা বলল,–ফাঁদে একটা পেতনি পড়েছে। শিশিতে ঢোকাতে পারছি না। বলেই সে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল,–এই যা! পালিয়ে গেল।
সে শ্যাওড়া গাছ থেকে নেমে এল। হাতে একই সাইজের একটা শিশি। হাসি চেপে বললুম, ফঁদ থেকে পেতনি পালিয়ে গেল। আর ডনের শিশি থেকে ভূতটা পালিয়ে গেছে। শিগগির একটা জোগাড় করো।
মোনা বলে উঠল,–এঃ হে হে হে! সর্বনাশ! সর্বনাশ! খোকাবাবুকে অমন পইপই করে বলেছিলুম, সাবধান!
