কথাবার্তা শুনে ততক্ষণে প্রচণ্ড আতঙ্কে আমার বৃষ্টিভেজা শরীর অবশ হয়ে গেছে। এরা কারা? তাছাড়া এখনই যে-কোনও সময়ে শ্মশানের চিতা থেকে আধপোেড়া একটা মড়া এসে পড়বে! আমি দেয়াল ঘেঁষে একটু-একটু করে দরজার দিকে সরে যাচ্ছিলুম।
পাঁচু বলল,–এই লোকটা কে খুড়োমশাই?
খুডোমশাই বলল, কলকাতার এক লেখক। বলে কিনা ভূতের গল্প লেখে। চোরের গল্প লেখে। হেরম্ববাবু! এই দেখুন একজন চোর। এর নাম পাঁচু-চোর। খুব বিখ্যাত চোর ছিল পাঁচু।
বললুম,–ছিল মানে?
–ও পাঁচু! এই বুদ্ধি নিয়ে লেখক হয়েছে। কালজ্ঞান নেই। ছিল যে অতীত কাল, তাও বোঝে না! ছ্যাঁ-ছ্যাঁ!
বাইরে কেউ বলে উঠল, আরে কী আশ্চর্য! বন্ধুড়ো যে! লোকটা তো আমাকে বলল না এই বাড়িতে তুমি আছো?
–কে রে? কিনু নাকি? আয়, আয়। এই পাঁচু! তুই কিনুকে চিনতে পারিসনি? গাধা কোথাকার!
পাঁচু রাগ করে বলল, খুড়োমশাইয়ের সব ভালো। শুধু এই এক দোষ। গাধা বলা! এইজন্য কথায় বলে, স্বভাব যায় না মলে।
দরজা দিয়ে কিনু ঘরে ঢুকে পড়ল। সে বলল,–পাচু আমাকে চিনতে পারবে কী করে? আমিই বা পাঁচুকে চিনতে পারব কী করে? দশ বছর আগে কালুডিহির ঘোঁতনবাবুর ঘরে একসঙ্গে সিঁদ কেটে ছিলুম। তারপর আর দেখাসাক্ষাৎ নেই। ছিলে কোথায় হে পাঁচু?
আমার নাকে এবার সত্যি মড়াপোড়া কটু গন্ধ লাগল। আমি দরজা দিয়ে পালানোর তালে আছি। কিন্তু আধপোড়া কিনুর মড়া যদি আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে?
খুড়োমশাই এই সময় আবার এ্যাক-এ্যাক করে বিদঘুঁটে হেসে বললেন, কী হেরম্ববাবু? লেখক হয়েছেন। ভূতের গল্প লেখেন। চোরের গল্প লেখেন। স্বচক্ষে কখনও ভূত আর চোর–মানে চোর আর ভূত একসঙ্গে দেখেছেন?
বললুম,–মনে হচ্ছে, এবার দেখলুম।
কিনু বলে উঠল, কী সর্বনাশ! বন্ধুখুড়ো করেছ কী? ঘরে লেখক ঢুকিয়ে বসে আছো? তুমি ছিলে তল্লাটের কুঁদে দারোগাবাবু! তোমার দাপটে চোরে-ভূতে আর ভূতে-চোরে একঘাটে জল খেত। ঘরে লেখক ঢোকালে সব ফাস করে লিখে দেবে
যে! লিখবে, পুলিশের দারোগা ছিল যে, সে কিনা চোরে-ভূতে আর ভূতে-চোরে এক করে আড্ডা দিচ্ছে।
বললুম,–বঙ্কুবাবু! আপনিও তাহলে অতীত কালে?
খুড়োমশাই সগর্জনে বললেন, আমার নাম বন্ধুবিহারী ধাড়া। আমাকে নিয়ে গল্প লিখলে দুহাতে হাতকড়ি পরাব। সাবধান!
–আজ্ঞে না লিখব না। তবে একটা কথা বুঝতে পারছি না। ওরা দুজনে অতীতকাল। আর আপনিও অতীতকাল। কিন্তু ওরা সিঁদেল চোর। আর আপনি পুলিশের দারোগা। এই চোর-পুলিশ একত্র হয় কী করে, একটু বুঝিয়ে দেবেন? তাছাড়া চোরের খুড়োই বা পুলিশ হয় কী করে?
পাঁচু আর কিনু হি হি হি হি করে হেসে উঠল। বকুখুড়োও খ্যাক খ্যাক করে হাসতে লাগল। তারপর বলল, ওহে লেখক! এটুকুও বোঝো না! তবে এই গানটা শোনো। বলে তিনি বিদঘুঁটে গলায় গান গেয়ে উঠলেন–
–হরি, ওহে দয়াময়!
এ ভব সংসারে চক্ষু মুদিলে
সবই একাকার হয়।।
পাঁচু অরা কিনু ধুয়া ধরল, হরি, ওহে দয়াময়।
এইবার পালানোর সুসময়। তিনজনে মিলে গান ধরেছে অন্ধকারে। আমি সেই সুযোগে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলুম। একটু দূরে টর্চের আলো জ্বলল। তখনও বৃষ্টি ঝরছে। তবে বাতাস কমেছে। ভিজে জবুথবু হয়ে সেই আলো লক্ষ করে ছুটে গেলুম। আমার ওপর টর্চের আলো পড়তেই কেউ বলে উঠল,–এই তো প্রধান অতিথি।
আরেক জন এগিয়ে এসে বলল, আরে! এ কী অবস্থা হয়েছে আপনার? ছিলেন কোথায়?
কাঁপতে কাঁপতে বললুম,–ওই একতলা বাড়িতে।
–কী সর্বনাশ! ওটা তো পোড়োবাড়ি। ওই বাড়িতে নাকি বন্ধুবিহারী ধাড়া নামে পুলিশের এক দারোগা থাকতেন। রিটায়ার করে মারা যান। তাই ওর ছেলেমেয়েরা এখন কলকাতায় আছে। কোনও ইয়ে-টিয়ে দেখেননি তো? মানে ভূ-ভূ
ঝটপট বললুম, না, না। বড্ড শীত করছে।
তারা ছাতার আড়ালে আমাকে নিয়ে চলল, মনে-মনে প্রতিজ্ঞা করলুম, আর কখনও কোথাও কোনও অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে যাব না। রবীন্দ্রনাথের নামে নজরুল, দারোগা আর চোরের নামে ভূ-ভূ–
নাহ। কথাটা বলতে নেই। চেপে যাওয়াই ভালো।…
ডনের ভূত
সেদিন সকালে চোখ বুজে একটা রোমাঞ্চকর গল্পের প্লট ভাবছি এবং টেবিলে কাগজ-কলমও তৈরি, হঠাৎ পিঠে চিমটি কাটল কেউ। উঃ বলে আর্তনাদ করে পিছনে ঘুরে দেখি, ডন দাঁড়িয়ে আছে। মুখে ধূর্ত এবং ক্রুর হাসির ছাপ। খাপ্পা হয়ে বললুম, হতভাগা ছেলে! দিলি তো মুডটা নষ্ট করে?
ডন আমার ভাগনে। মহা ধড়িবাজ বিচ্ছু ছেলে! তার মাথায় একটা কিছু খেয়াল চাপলেই হল। তাই নিয়ে উঠে পড়ে লাগবে।
তা লাগুক আপত্তি নেই। কিন্তু প্রতিটি খেয়ালের সঙ্গে আমাকেও যে জড়াবে, এটাই হল সমস্যা। ওইরকম নিঃশব্দ হাসিটি হেসে সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে দেখে বললুম,–বুঝেছি। টাকা চাই। কিন্তু এবার কী কিনবি? রামুর গাধা, না সোঁদরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার?
ডন ফিক করে হেসে অমায়িক ভদ্রলোক হল। বলল, না মামা! ভূত কিনব।
অবাক হয়ে বললুম, ভূত কিনবি? কোথায় পাবি ভূত? কে বেচবে?
ডন কাছে ঘেঁষে এল। টেবিলের কলমটা খপ করে তুলে নিয়ে বলল,–মোটে তিন টাকা দাম, মামা! যদি এক্ষুনি তিনটে টাকা না দাও, কী হবে বুঝতে পারছ?
বিপদ ঘনিয়েছে দেখে ঝটপট বললুম,–বুঝেছি, বুঝেছি। লক্ষ্মী ছেলের মতো আগে আমার কথার জবাব দে। ঠিক-ঠিক জবাব হলে তিনটে টাকাই পাবি।
