পন্টুদা বেঁটে মোটাসোটা মানুষ। গায়ে হাতকাটা ফতুয়া, পরনে ধুতি। রবীন্দ্রনাথের ছবিতে মাল্যদান করেই মাইকের সামনে চলে এলেন। করজোড়ে নমস্কার করে বললেন, বন্ধুগণ! তরুণ সংঘের প্রিয় তরুণদল! প্রধান অতিথি সাহিত্যিক মহাশয়! সভাপতি মহাশয়! এখনই বাবুগঞ্জের একটি অনুষ্ঠানে আমাকে যেতে হবে। তাই দুঃখের সঙ্গে বিদায় নেওয়ার আগে বিশেষ করে তরুণ সংঘের তরুণ দলের উদ্দেশে দুটো কথা বলে নিই। তোমরা তরুণ! তোমরা জাতির ভবিষ্যৎ! তাই তো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তোমাদের জন্য লিখেছেন,
‘ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল
নিম্নে উতলা ধরণীতল অরুণ প্রাতের তরুণ দল
চলরে চলরে চল!’
সর্বনাশ! এ যে রবীন্দ্রনাথের লেখা নয়। এই কবিতা বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল ইসলামের বিখ্যাত মার্চ সঙ্গীত। কেউ এঁকে বাধা দিচ্ছে না কেন?
হেডমাস্টারমশাই আমার দিকে তাকালেন। আমি তার দিকে তাকালাম। তারপর হেডমাস্টারমশাই ফিসফিস করে বললেন,–ওঁকে থামাও। ওঁকে থামাও।
কার সাধ্য পন্টুদাকে থামায়? বেঁটে মানুষ। একহাত মুঠো করে ওপরে তুলে গর্জন করে কবিতা বলছেন, বিশ্বকবি তোমাদের আরও বলেছেন–
‘…নব-নবীনের গাহিয়া গান
সজীব করিব মহাশ্মশান
আমরা দানিব নতুন প্রাণ…’
হ্যাঁ। আমাদের অজ্ঞাতসারে পন্টুদাকে থামানোর আয়োজন চলছিল। বিশ্বকবির জন্মজয়ন্তীতে এই উল্টোপুরাণ সে বরদাস্ত করবে কেন?
আচম্বিতে চোখ ধাঁধানো বিদ্যুৎ ঝিলিক দিল। পরক্ষণে কড়কড়-কড়াৎ করে কানে তালা ধরানো মেঘ ডাকল। তারপরই প্যান্ডেল মচমচ করে উঠল। আবার বিদ্যুতের ঝিলিক। আবার মেঘ গর্জন। তারপর সব আলো নিভে গেল। কারা চেঁচিয়ে উঠল, পটুদাকে টর্চ দেখাও! টর্চ দেখাও!
তাঁকে কারা টর্চের আলো জ্বেলে ধরাধরি করে প্যান্ডেল থেকে নামাচ্ছে দেখলুম। ততক্ষণে এসে পড়েছে সে। তার নাম কিনা কালবোশেখি। প্যান্ডেলের তেরপল আর কাপড়ের সাজ নৌকোর পালের মতো উড়তে থাকল। প্যান্ডেলের বাঁশগুলো মচমচ শব্দে আর্তনাদ করতে লাগল। ওদিকে ছোট ছেলেমেয়েদের চিৎকার, কান্না, বয়স্কদের হট্টগোল–সব মিলিয়ে সে এক বিভীষিকা!
প্যান্ডেল ভেঙে পড়ার ভয়ে লাফ দিয়ে নেমে পড়েছিলুম। সভাপতি হেডমাস্টারমশাইয়ের আর্তনাদ শুনতে পেলুম, অশোক ও অশোক! আমি চাপা পড়ব যে!–
তারপর নিরাপদ দূরত্বে যেই পৌঁছেছি, শুরু হয়ে গেল চড়বড় শব্দে বৃষ্টি। কালবোশেখির ঝড়ের সঙ্গে জোরালো বৃষ্টি এসে প্রলয়কাণ্ড বাধাল।
মাথা বাঁচাতে বিদ্যুতের ঝিলিকে বটগাছটাকে দেখামাত্র ছুটে গেলুম। কিন্তু মুহুর্মুহু মেঘের হাঁকডাক, বিদ্যুতের ছটা আর বৃষ্টির দাপটে সেখানে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে ভরসা পেলুম না। বটগাছটার ডাল ভেঙে পড়তে পারে। বাজ পড়তেও পারে বটগাছের মাথায়। প্রাণভয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় খুঁজছিলুম।
সেই সময় গাছপালার ফাঁকে একটা একতলা বাড়ি বিদ্যুতই দেখিয়ে দিল। ভিজতে ভিজতে এবং ঝড়ের দাপটে কুঁজো হয়ে সেই বাড়ির দিকে ছুটে চললুম।
বাড়িটার সামনে বারান্দা আছে। কিন্তু বৃষ্টির বাঁকা তিরে সেখানে বিদ্ধ হচ্ছি। হঠাৎ দেখলুম, বারান্দার একপাশে একটা খোলা দরজা। মরিয়া হয়ে ঢুকে পড়লুম ঘরে। অমনি কেউ খ্যানখেনে গলায় বলে উঠল,-কে? কে?
বললুম, আজ্ঞে আমি।
–আমি কে? আমি কি মানুষের নাম হয় নাকি?
–আমার নাম হেমন্তকুমার হাটি।
–হাটি? এ পদবি তো আমাদের ঝাঁপুইহাটিতে নেই কারও। বাড়ি কোথায়?
–কলকাতা!
–অ্যাঁ? কলকাতার নোক এখানে কেন?
–আজ্ঞে, আমি এখানে রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠানে এসেছিলুম। আমি একজন লেখক।
–লেখক? কী লেখেন?
অন্ধকারে কে কথা বলছে, তাকে দেখছে পাচ্ছি না। বিরক্ত হয়ে বললুম, গল্প লিখি।
–কীসের গল্প লেখেন, শুনি?
–ভূতের গল্প–
–কী? কী? ভূতের গল্প লেখেন?
একটু হকচকিয়ে গেলুম খ্যানখেনে বিদঘুঁটে গলার ধমকে। বললুম,–চোরের গল্পও লিখি।
–কী? কী? চোরের গল্পও লেখেন?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। মানেসব রকমের গল্পই লিখি।
খ্যাঁক খ্যাঁক করে অদ্ভুত হাসল লোকটা। এই বাড়ির কর্তাই হবে নিশ্চয়। সে কয়েকবার হেসে বলল, তা হেরম্ববাবু
–আজ্ঞে, আমার নাম হেমন্ত।
–এই হল! মাইকে তো অ্যানাউন্স করছিল হেরম্বকুমার–কী যেন? ঘাঁটি! যাকগে। তা ঘাঁটিবাবু, আপনি ভূতের গল্প লেখেন। চোরের গল্প লেখেন। কী করে লেখেন? কখনও ভূত দেখেছেন?
–আজ্ঞে না। ভূতে আমার বিশ্বাস নেই। কল্পনা করে লিখি। যেমন ধরুন চোরের গল্প। আমি নিজে কখনও চুরি করিনি। তবু কল্পনার জোরে চোরের গল্প লিখি।
এই সময় বাইরে থেকে কেউ ঘরে ঢুকল। বিদ্যুতের ঝিলিকে এক নিমেষে আবছা একটা লোককে দেখতে পেলুম মাত্র। সে বলল, খুড়োমশাই! কার সঙ্গে গল্প করছেন?
–কে রে? পাঁচু নাকি? কোথায় ছিলিস এই ঝড়-বাদলায়।
পাচু বলল, শ্মশানতলায় মড়াপোড়ানো দেখছিলুম খুড়োমশাই! ঝড়বৃষ্টিতে লোকগুলো বেচারা আধপোড়া মড়াটাকে ফেলে পালিয়ে গেল। মড়াটা আমাকে দেখতে পেয়ে কাকুতিমিনতি করতে লাগল। একটু কাছে থাকো না দাদা! কথায় বলে, একা
বোকা!
খুড়োমশাই সেই খ্যাক খ্যাক হেসে বলল,–তা তুই তাকে ফেলে চলে এলি যে?
–না, না। পালিয়ে আসা যায়? আধপোড়া মড়া। চিতার কাঠ ভিজে গিয়েছিল? তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসছিলুম। হাঁটতে পারে না। ওই সে আসছে এতক্ষণে।
