ছোটমামা চাপাস্বরে বললেন, ব্যাপারটা ভালো ঠেকছে না, পুঁটু। লোকটার গা বরফের মতো ঠান্ডা!
আঁতকে উঠে বললুম,–চলে আসুন ছোটমামা!
ছোটমামা ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন,–পায়ে ব্যথা হয়ে গেছে রে। বরং এক কাজ করি আয়। ওই বারান্দায় দুজনে শুয়ে পড়ি। ভোরবেলা নিশ্চয় মানুষজনের দেখা পাব। তখন জিগ্যেস করে নেব।
উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে একজন ঘুমন্ত লোক, যার গা নাকি বরফের মতো ঠান্ডা এবং এই বাড়িটাও তার। এখানে ঘুমননা কি ঠিক হবে? কিন্তু ছোটমামা আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন বারান্দায়। তারপর চিত হয়ে শুয়ে পড়লেন। আমারও খুব ঘুম পাচ্ছিল। শুয়ে পড়লুম শানবাঁধানো বারান্দায়। দুজনেই ক্লান্ত।
তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি।
ঘুম ভাঙল ছোটমামার ডাকাডাকিতে। চোখ খুলে উঠে বসলুম। তারপর খুব অবাক হয়ে গেলুম। এ কোথায় শুয়েছিলুম আমরা? ভোরের আলোয় সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। একটা বটগাছের তলায় শুকনো ন্যাড়া মাটিতে মামা-ভাগ্নে খুব ঘুমিয়েছি। কোথাও ঘরবাড়ির চিহ্ন নেই। শুধু জঙ্গল।
ছোটমামা বললেন,–হাঁ করে কী দেখছিস? রাতবিরেতে বেরুলে একটু গণ্ডগোল হয়েই থাকে। চল, বাড়ি ফিরি।
হাঁটতে-হাঁটতে বললুম,–রাস্তা চিনতে পারবেন তো ছোটমামা?
ছোটমামা করুণ হেসে বললেন,–দিনের বেলা আর ভুল হবে না। আমরা কোথায় চলে এসেছিলুম জানিস? কঙ্কালিতলার জঙ্গলে। প্রবলেম হল। রাতবিরেতে কিছু চেনা যায় না। চেনা জায়গাও অচেনা হয়ে যায়।
ঝড়ে-জলে-অন্ধকারে
সেবার ঝাঁপুইহাটি গ্রামে ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি C হয়েছিলুম। উদ্যোক্তা তরুণ সংঘ নামক ক্লাবের ছেলেগুলি খুব ভদ্র। তাই তাদের অনুরোধ অগ্রাহ্য করতে পারিনি। কথামতো তারা গাড়ি এনেছিল। কলকাতা থেকে গাড়িতে চেপে ঝাঁপুইহাটি পৌঁছতে ঘণ্টা তিনেক লেগেছিল। সভা শুরু হওয়ার কথা পাঁচটায়। ঠিক সময়েই পৌঁছেছিলুম।
গ্রামটি বনেদি, তা গাছপালার ফাঁকে অনেক পুরোনো একতলা-দোতলা বাড়ি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। নতুন পাকা বাড়িও কম নেই। তবে রবীন্দ্রজয়ন্তীর আয়োজন যেখানে করা হয়েছে, সেটা গ্রামের শেষ দিকটায় একটা ছোট্ট খেলার মাঠ। মাঠের একপ্রান্তে পুরোনো একটা মন্দির। অন্যপ্রান্তে একটা বিশাল বট গাছ। গ্রামের উৎসব পালা পার্বণ উপলক্ষে এখানে মেলাও বসে। ক্লাবের ছেলেরা আমাকে একথা জানিয়েছিল।
সুন্দর রঙিন প্যান্ডেল। সেখানে টেবিল-চেয়ার পাতা ছিল। পেছনে রবীন্দ্রনাথের একটা বড় ছবি। মাইকে এক যুবক ঘন-ঘন ঘোষণা করছিল,–মাইক টেস্টিং! হ্যালো! ওয়ান…টু…থ্রি! প্যান্ডেলের সামনে নিচে ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরা তুমুল চ্যাঁচিমেচি করছিল। তাদের পেছনে নানা বয়সি লোকের ভিড় জমেছিল। আমাকে প্যান্ডেলের পেছন দিকে চেয়ারে বসিয়ে একটি ছেলে কাচুমাচু মুখে বলেছিল,–চা খান স্যার! একটু দেরি হবে। আমাদের এলাকার জননেতা সবার প্রিয় পন্টুদা এলেই সভা শুরু করব।
একটু পরে মাইক্রোফোনে হিন্দি ফিল্মের গান শুরু হয়ে গেল। আমি তো অবাক। এ কী করছে এরা? অনুষ্ঠানের সভাপতি স্থানীয় স্কুলের হেডমাস্টারমশাই। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে জিভ কেটে বললেন,–দেখছেন কাজ?
বলে তিনি ব্যস্তভাবে একটি ছেলেকে ডাকলেন।–ও অশোক! রবীন্দ্রজয়ন্তীতে এ কী গান বাজছে। রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজাতে বলল।
অশোক ছুটে গেল মাইকওয়ালার কাছে। তারপর ফিরে এসে বলল, মাইকম্যানের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের টেপ নেই স্যার।
হেডমাস্টারমশাই বললেন,–তাহলে থামাতে বলো! ছ্যা-হ্যা! রবীন্দ্রনাথবে অপমান করা হচ্ছে যে!
অশোক আবার ছুটে গেল। নবীন সংঘের ছেলেদের সঙ্গে কথা বলে ফিরে এল। বলল,–স্যার! মাইক বাজানো বন্ধ করলে লোক জমবে না। একটু ওয়েট করুন স্যার! এক্ষুনি পন্টুদা এসে গেলেই ওসব বন্ধ হয়ে যাবে।
অবশ্য মাঝে-মাঝে গান থামিয়ে এক যুবক ঘোষণা করছিল,–বন্ধুগণ! আজ আমাদের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথিরূপে উপস্থিত হয়েছেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক হেরম্বকুমার ইয়ে, মানে–
একটি ছেলে খাপ্পা হয়ে তাকে চাপা গলায় বলে দিল, হেরম্বকুমার ঘাঁটি।
মাইকে কথাটা শোনা গেল। কিন্তু কী আর করা যাবে? আমার নাম হেমন্তকুমার হাটি। আঁপুইহাটিতে এসে হয়ে গেলুম কি না হেরম্বকুমার ঘাঁটি! যাই হোক, আবার হিন্দি গানের গর্জনে সব চাপা পড়ে গেল। কতক্ষণ পরে আলো জ্বলে উঠল প্যান্ডেলে এবং পেছনদিকের তেরপলে ঘেরা জায়গাতে। ঘড়ি দেখলুম। ছটা বেজে গেছে।
ছটা পনেরো মিনিটে হঠাং মাইক্রোফোনের গান থেমে গেল। সেই যুবকটি ঘোষণা করল,-বন্ধুগণ! আমাদের এরিয়ার বিশিষ্ট জননেতা শ্রীপণ–পণ-পঞ্চানন ঢোল মহাশয় আমাদের সবার প্রিয় নেতা পন্টুদা এইমাত্র এসে উপস্থিত হয়েছেন। এখনই সভা শুরু হবে। মাননীয় প্রধান অতিথি সুসাহিত্যিক হেরম্বকুমার ঘাঁ-ঘা– ঘাঁটি মহাশয় এবং এই সভার সভাপতি হেডমাস্টার মহাশয় শ্রীঅহিভূষণ চ-চ-চট্টো সরি–চক্রবর্তীকে প্যান্ডেলে আসার জন্য অনুরোধ করছি।
যাই হোক, প্যান্ডেলে তো গিয়ে বসলুম। প্রথমে আমন্ত্রিত অতিথিবর্গকে মাল্যদান ঘোষণা করলে যুবকটিকে সরিয়ে আরেক যুবক ঘোঘাষণা করল, সবার আগে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে মাল্যদান করবেন আমাদের সবার প্রিয় পন্টুদা!
